https://www.prothomalony.com/

7446

literature

সাহিত্য

উত্তরের জনপদ

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৩ ০৪:২৪

উত্তর আমেরিকায় চার ঋতু, কারোর সাথে কারোর মিল নেই, তারা প্রকটভাবে আলাদা। বসন্তের শুরুতে গাছগুলো নতুন পত্র-পল্লব-মুকুলে সুশোভিত হলেও তীব্র দাবদাহের শেষে আবারো ঝরিয়ে দেয় সব। এর ভিতরে যে বিচ্ছেদের ছায়া থাকে তা সেই জনপদের মানুষের জীবনেও ছাপ ফেলে। হেমন্তের পাতা ঝরার সাথে অনেকেই সদৃশ খুঁজে পান নিজের একলা জীবনের। হিমেল বাতাসে ঝরা পাতা যেমন গাছ থেকে খসে পড়ে তেমনি করে যেন সন্তানেরা ছেড়ে চলে যায় দূরে। আবার কারো কারোর ভুলের সমাপ্তি ঘটে আচমকাই, প্রিয়জন ফিরে আসে। এই মিলন আর বিরহের সাথে ডুব সাঁতার খেলেই পার হয় উত্তরের জনপদের জীবনযাত্রা। বরাবরের মতো ভিন্ন দুই গল্প রয়েছে এবারের উত্তরের জনপদ পাতায়। চরিত্রগুলো আগের মতোই আড়ালে রাখা হয়েছে। ধন্যবাদান্তে—সোহানা নাজনীন /  ফরিদা ইয়াসমীন।


কালের ক্ষেপণ
সোহানা নাজনীন

আজ আমি আমার মেয়েকে নিয়ে ভীষণ খুশি, ওর সংসারে নিজের মতো ওকে সুখী হতে দেখে মনে হচ্ছে আমার আর কোন দুঃখ নেই-কথাগুলো বলতে বলতে শর্মির চোখ দুটো আনন্দে ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। 

গত সপ্তাহে মলের ভিতর শর্মির সাথে দেখা, অনেক বছর পরে দেখা হলো। এতো গল্প জমা ছিল যে বাধ্য হয়েই ফুড কোর্টে গিয়ে দুটো স্মুদি নিয়ে টেবিলে মুখোমুখি বসতে হলো। শর্মি আগের মতোই আছে, খুব একটা বদলায়নি। শুধু কপালের উপরের চুলগুলো কিছুটা হালকা হয়েছে। এখনো সেই আগের মতো চোখ কুঁচকানো প্রাণখোলা হাসি তার। অথচ শর্মির এই হাসি একদিন দপ করে নিভে গিয়েছিল।

শর্মি এদেশে এসেছিল একুশ বছর বয়সে। দেখতে শুনতে ভালো ছিল, তাই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর পরই আমেরিকায় থাকা পাত্রের সাথে তার পরিবার বিয়ে ঠিক করেছিল। শর্মি তখন এতো কিছু গভীরভাবে ভাবতে শেখেনি। বিয়ে মানেই তার কাছে ছিল আনন্দের জীবন, তাও আবার আমেরিকায় থাকা স্বামী পাবে। যখন তখন স্বামীর কাছ থেকে গিফ্ট মিলবে, মন চাইলে এটা-ওটা আবদারও করা যাবে। 

কিন্তু গোলমালটা বাঁধলো তখনই যখন শর্মি এদেশে এসে দেখল ভিন্ন কিছু। এ দেশ সুন্দর, গোছানো, নিয়মে কড়াকড়ি। কিন্তু পাশাপাশি ভীষণভাবে একাকী, কষ্টেরও। সকালে উঠেই শর্মির স্বামী কাজে বেরিয়ে পড়ার পর একলা ঘরে বাড়ির সবার জন্য মন কেমন করতো তার। এদিকে বাইরে বেজায় ঠাণ্ডা, তুষার জমে আছে রাস্তায়। শর্মি একা কোথাও যেতে পারত না, রাস্তাঘাট তখনও কিচ্ছু চেনে না। একব্লক দূরের গ্রোসারি থেকে কেনাকাটা করে, উইকেন্ডে লন্ড্রি করে আনে। তিনমাস পর সবাই যখন বসন্তের অপেক্ষায় তখন শর্মির শরীর খারাপ হতে শুরু করলো। কিচ্ছু খেতে পারছিল না, বমি আর সবকিছুতেই গন্ধ। প্রেগনেন্সি নিশ্চিতের পর তার স্বামী উঠে পড়ে লাগল এবোরশনের জন্যে। এদিকে শর্মি কিছুতেই রাজি নয় তার প্রথম বাচ্চা সরিয়ে দিতে। আটমাস পর তুমুল বিতর্কের মুখে শর্মি মেয়ের মুখ দেখলো। 

মেযের বয়স যখন দুই, ততদিনে স্বামীর সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। দেশ থেকে বাবা-মা সহ সবাই মানিয়ে নেবার অনুরোধ করেছিল। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি, বিয়েটা টেকেনি কপালে। ডিভোর্সের পর শর্মি দুই বছরের মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়েছিল। আমেরিকান সরকারের থেকে লোন নিয়ে পড়া শুরু করলেও মেয়েকে বড়ো করার ব্যাপারে ভুল ত্রুটির সীমা ছিল না। প্রায়শই সংসার ভাঙ্গার যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়তো বাচ্চা মেয়েটার উপর। দিনের বেলায় ক্লাস আর তিনদিন  বিকাল থেকে রাত অবধি কাজ -এই দুই মিলে শর্মির মাথা ঠাণ্ডা থাকতো না। পড়া শেষে এলিমেন্টারি স্কুলে জয়েন করলো শর্মি, একঘন্টা সাবওয়ে ধরে স্কুলে যাওয়া শুরু হলো। মেয়ের দেখাশোনা করতো বেবিসিটার, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মেয়ের সাথে সখ্যতা করার মতো শক্তি থাকতো না শর্মির।

ভালোই চলছিল এভাবে, কিন্তু একদিন দেখা গেল মেয়েটা কথা শুনছে না। কেমন যেন রগচটা ভাব, উদ্ধত মেজাজ। হাইস্কুলে পড়ার সময় মেয়ের উল্টাপাল্টা পোষাক পরে ঘুরে বেড়ানো দেখে শর্মি সহ্য করতে পারত না। মনের অজান্তে মেয়ের গায়ে হাত তোলত, বকাঝকা-গালিগালাজ চলতো  ক্রমাগত। কলেজে আবেদনের সময় শর্মির মেয়ে ইচ্ছা করেই দূরের স্টেটে এপ্লাই করে, যেন দূরে থেকে মা’কে শাস্তি দিতে চায়। মেয়ের থেকে এমন আঘাতে শর্মি আবারো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। ভাবল, জীবনে যাকেই জড়িয়ে ধরতে চেয়েছি, সে-ই ছেড়ে চলে গেছে। শর্মি ঠিক করল, স্পেশ্যাল চাহিদার বাচ্চাদের সাথে কাজ করবে, ওদেরকে কিছুটা হলেও বোঝার চেষ্টা করবে। স্পেশ্যাল চাহিদাসম্পন্ন বাচ্চাকে বোঝা যদিও কঠিন কাজ, ধৈর্য ধরে ঠাণ্ডা মাথায় তাদেরকে সামলাতে হয়। আর এ কাজটা করতে গিয়েই শর্মি বুঝতে পারে যে, সে নিজের মেয়ের সাথে কোথায় কোথায় ভুলগুলো করেছিল। মেয়েকে তার আরো বেশি সময় দেয়া উচিত ছিল, তাকে বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে স্বামীর থেকে বিচ্ছেদের পর একা সংগ্রামের যন্ত্রণায় নিজের সমস্ত অতৃপ্তি-আক্রোশ ঢেলেছিল সন্তানের প্রতি। হাইস্কুল পড়ুয়া মেয়ে তখন মা’কে কাছে না পেয়ে বিগড়ে গিয়েছিল।

বললাম, এটা কিন্তু তুমি ঠিক করোনি। তোমার ভুলের জন্যই মেয়ে এভাবে দূরে সরে গিয়েছিল।

শর্মি শ্বাস ছেড়ে বলল, হ্যা, এতোগুলো বছর একলা থেকে আমার অনেক শিক্ষা হয়েছে। আমি নিজের ভুলগুলো বুঝতে পেরেছি, তাই একদিন মেয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে সরি বললাম। মেয়ে তখন আটলান্টার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিউইয়র্কে এসে নতুন চাকরি নিল। আমার সাথেই ছিল বছরখানেক, তখন একজনের সাথে রিলেশনশিপ চলছিল। দেখলাম ছেলেটা মন্দ না, আমার মেয়ের মতোই মন মানসিকতা। আমি তো ভাবতেই পারিনি যে আমার মেয়ে কাউকে পছন্দ করবে, ভালোবাসবে। ওদের মত ছিল, ব্যাস! আমিও বিয়ে দিয়ে দিলাম। দুজনে এখন আলাদা এপার্টমেন্টে থাকে। সপ্তাহে আমাকে দেখতে আসে, একসাথে বাইরে ঘুরি, ডিনার করি। মেয়ের হাসব্যান্ড আমাকে মা বলে ডাকে, আমার হাতের রান্নার খুব তারিফ করে। এর বেশি আমি আর কিছু চাই না, ওদের সুখই আমার সুখ।

কথাগুলো বলতে বলতে শর্মির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। অনেকদিন পর শর্মিকে সুখী চেহারা দেখে আমারো ভালো লাগলো। সেই আগের চোখ কুঁচকানো হাসি ফিরে এসেছে। মানুষ বোধহয় এভাবেই হারানো জীবন ফিরে পায়। চলে যাবার আগে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে আরেকটা কথা বলে গেল শর্মি, শোন! মেয়ে কিন্তু আমাকে এখন অনেক শাসন করে। সেদিন কল দিয়ে আমাকে আবারো বিয়ে করার অনুরোধ করেছে। একা একা থাকি এই দেখে ওর নাকি ভালো লাগে না। আমি যদি একজন সঙ্গী খুঁজে নেই তাহলে ও দুশ্চিন্তা করা ছেড়ে দেবে। বাচ্চারাই একদিন কেমন গার্ডিয়ানদের মতো আচরণ করে, তাইনা আপা? বললাম, হ্যাঁ। ঠিক তাই। ওরাই একদিন আমাদের বাবা-মা হয়ে ফিরে আসে। তুমি এখন ভেবে দেখ কি করবে?

শর্মি হাসল কেবল। তারপর দু'জনেই যার যার গন্তব্যে ফিরে গেলাম। 

বিবাহ বিচ্ছেদের নিষ্পাপ ভিক্টিম হচ্ছে তাদের সন্তানেরা। একজন দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ সম্ভব হলেও সন্তানদের সাথে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়। তাই এই সময়গুলোতে সন্তানদের প্রতি খুব বেশি সংবেদনশীল ও যত্নশীল হতে হয়। 

 

 

বনফুল 
ফরিদা ইয়াসমীন

এই জনপদে এখন হিম হিম ঠাণ্ডা এগিয়ে আসছে গুটি গুটি পায়ে। বাতাসে এখন শণশণ শব্দ, গাছগুলো ক্রমশ রঙিন হয়ে উঠছে। রঙিন হতে থাকা পাতাগুলো যখন নেচে নেচে ঝরতে থাকে,তখন গাছের নিচে যেন নানা রঙের গালিচা তৈরি হয়। আর পত্র পল্লবহীন গাছগুলো খয়েরি রং ধারণ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে আরেক ফাল্গুনের অপেক্ষায়। এদেশের প্রকৃতি বড় অদ্ভুত, নিজেকে পাল্টিয়ে নেয় চোখের নিমেষেই। শীতের শেষে যখন সামার শুরু হয় তখন প্রতিটি সেকেন্ডে যেন প্রকৃতির পরিবর্তন চোখে পড়ে।

লুইসা ব্রাউন সত্তরোর্ধ্ব এক সাদা বর্ণের আমেরিকান মহিলা। প্রায় প্রতিদিন ওর সাথে আমার দেখা হয়। কখনো লবিতে বসে থাকে, কখনো পার্কিংয়ে গাড়ির ভেতরে বসে থাকে। উদাস দৃষ্টি বলে দেয় তার চারপাশে কেউ নাই। কখনো হাতে ধরা থাকে কফি কখনো বা বার্গার। দেখা হলে কথা হয়, বেশির ভাগ কথাই হয় অতীতের সুন্দর স্মৃতি নিয়ে। পাতা ঝরার দিনগুলো ওকে বেশি নষ্টালজিয়ায় ফেলে। ও বলে‌, 'দেখো আমরাও তো প্রকৃতির সৃষ্টি। কিন্তু আমাদের জীবন ওয়ান ওয়ে টিকিটের মত। অথচ দেখ ঐ যে গাছপালা গুলো প্রতি বছর ফুলে-ফলে, পত্র -পল্লবে শোভিত হয়। শীত আসলে আবার রুক্ষ বিবর্ণ রূপ ধারণ করে। আবার বসন্তে জেগে ওঠে!' 

লুইসার বয়সী চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি ওর যৌবনের লাবণ্য মাখা মুখশ্রীর। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকি ওর উত্থাল তারুণ্যের দিনগুলো। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া লুইসা শুধু স্মৃতির ঘরে ভ্রমণ করে। সেখানে তার সতত বসন্ত। যৌবনেই স্বামী হারিয়ে একা হয়ে পড়েছিলেন। ছোট ছোট চারটি সন্তান নিয়ে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে সামলে নেয়। চারজন সন্তানকে একা মানুষ করতে গিয়ে বুঝতে পারেননি জীবনের সবুজ পাতারা কখন বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়েছে। যখন বুঝতে পারলো তখন তার চারপাশে কেউই নেই। ছেলে মেয়েরা যার যার বসন্ত উৎসবে মেতে আছে। জীর্ণ পাতার খবর ওরা রাখেনা। শীর্ণ শরীরে লুইসা শুধুই প্রকৃতির পাল্টে যাওয়া দেখে। আর আমি দেখি প্রকৃতির মাঝে এক অনন্য প্রকৃতি কন্যাকে, যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় উপহার দিয়েছে তার সন্তানের জন্য। যে তার বসন্ত উৎসবের সব আয়োজন করে শুধুমাত্র সন্তানের জন্য। তাঁর জীবনের সব রঙিন পাতারা একে একে ঝরে পড়েছে। কিন্তু সন্তানের জন্য আপত্য স্নেহ তাকে বুঝতে দেয়নি কোনো ক্ষয়ে যাওয়া।

আজ নিঃসঙ্গ জীবনের প্রান্তে এসে যখন পিছন ফিরে তাকায় লুইসা‌, তখন হয়তো আবার ফিরে পেতে মন চায় সেই সব সোনালি অতীত। কিন্তু সামনে ঝরে পড়া পাতারা যেন ব্যাঙ্গ করে তাকিয়ে থাকে লুইসার দিকে। লুইসা যেন আজ এক ঝরা বনফুল।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন