https://www.prothomalony.com/

7433

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৩ ০৯:২৩

পৃথিবীর দশা
কাজী জহিরুল ইসলাম 

পিচঢালা পথ লাল বাস দেখে দ্রুত
কামোত্তেজক পাখনা ছড়ানো রাতা
বাস এসে থামে রাস্তায় জনশ্রুত
আজ দেখি পথ ধরেছে বাসের হাতা।

পথ হেঁটে যায় পথচারীদের পায়ে
দোকানের সারি ভোক্তার দিকে হাত
শীত চেপে বসে শত জ্যাকেটের গায়ে
ভোরের আলোতে শহরে নেমেছে রাত।

ভোরবেলা লোকে দপ্তরে যেত আগে
অফিসই এখন মানুষের কাছে আসে
অ্যাকোরিয়ামের মাছগুলো ফোঁসে রাগে
আনন্দ-জলে বেড়াল-শিশুরা ভাসে।

বিদ্যুৎ-তারে আজ বসেনি তো কাক
সারি সারি তার কাকেদের পায়ে বসা
বোবা পাথরের রাজপথে হাঁক ডাক
হচ্ছে কী-সব? পৃথিবীর এ-কী দশা!

রেলট্র‍্যাকে দেখি ইঞ্জিন অসহায়
হুঙ্কারে আজ ছাড়ে না আগের ধোঁয়া
বগিরা এখন তাকে টেনে নিয়ে যায়
কী-যে পরাজয় ছিল কত বেপরোয়া!

 

 

 

বছর পেরিয়ে যেতে যেতে
আহসান জামান 


একটা বছর পেরিয়ে যেতে যেতে 
মনে পড়ল কত স্মৃতির টুকিটাকি
অনেক অসমাপ্তের নূঁড়ি এসে 
জমেছে মনে। অনেক আনন্দের
পতঙ্গরা উড়ে গেছে দূরে কোথাও।

একটা বছর পেরিয়ে যেতে যেতে
পিছন ফিরে দেখি কত রোদ্দুর, কত 
বৃষ্টির জল রেখে যাচ্ছি পিছনে। 

একটা বছর পেরিয়ে যেতে যেতে
কী এক মায়া করে কেড়ে নিলো
কত জীবন গেলো ঢলে পড়ল 
মৃত্যুর গহ্বরে, কত শিশুর জন্ম
তারিখ লিখলো আদমশুমারী।

একটা বছর পেরিয়ে যেতে যেতে
কত অপমান জমা হলো নিসঙ্গ
জীবন পাতায়, কতটা বুড়োটে 
জড়িযে ধরলো দেহ জুড়ে, কতশত
অসুখের নাম তালিকা জানা হলো।

একটা বছর পেরিয়ে যেতে যেতে
শৈশবের মতো দূরত্ব বেড়ে গেলো
আমাদের চলাচলে, বৈরাগ্য নোঙ্গর
করছে এখন, নৈঃশব্দ্য করাঘাতে।

 

 

 

তারা ভর্তি একটা জাহাজ 
দেবাশিস সাহা

ঘরময় কী ছন্দে বেজে ওঠো তুমি 
যত দীর্ঘ করি দু'বাহু জড়াতে পারি না কিছুতে

বলতে এসেছিলাম মেঘ ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে
বৃষ্টির ভারী মন খারাপ
চোখে ফুটছে তীব্র পলাশ 
পুরুলিয়ার মাটি যেন পশ্চিমাকাশ 

বলা হয়নি তোমাকে 
আপাতত ফুল লিখছি পাখি লিখছি  
ফুটো জামা ছেড়া জিনস বিরল কেশে 
কিছু কিছু মৃত্যুও লিখছি 
হাবিজাবি প্রলাপ লিখন, কিন্তু যাই বলো 
তুমিই আমার না-নেভা আনন্দের ঠিকানা 

চোখ বুজলে এখনও দেখি তারাভর্তি একটা জাহাজ 
উড়ছে তোমার ঠোঁটে-মাস্তুলে বাঁধা আমারই 
স্যান্ডো গেঞ্জি নীল শার্ট 
লোটাকম্বল গুটিয়ে পা রাখব শেষবার।

 

 

 

শাস্তি
নন্দিনী সেনগুপ্ত

 

হেমন্তের কুয়াশা ঢাকে স্মৃতি, 
বর্ষাকাল দীর্ঘতম ঋতু।  
পঙক্তিগুলো চাবির মত ঘোরে
শিকড়ে তুমি হবে না জেনো থিতু…

শিকড় বলে আসলে কিছু নেই, 
মাটির সাথে সখ্য যদি থাকে।  
হেমন্তের কুয়াশা মোছে ক্ষত
কে বাজায় বীণা পথের বাঁকে?  

কাঁটাতারেই বীণা বাজান তিনি,  
রক্ত ঝরে আঙুল থেকে রোজ।  
তাঁরই নামে ধর্ম শুরু হল
এখন তাঁর কেউ করে না খোঁজ।

এখন তাঁকে সবাই গেছে ভুলে, 
ঈশ্বরের সন্ততির দল
কাঁটাতারেই আসন পেতে তিনি
বীণা বাজান সুরেতে বিহ্বল।  

ঈশ্বরের সন্ততির দল, শিকড়হীন, 
ফেরে না যারা ঘরে 
তাদের ভেবে শাস্তি নেন তিনি
আঙুল থেকে রক্ত পড়ে ঝরে। 

 

 

 

খুব ক্লান্ত
এবি ছিদ্দিক 

 

লিখালিখি করছো মনে হয়...
না- দুঃখকে সাজুগুজু করে বাখরখানি বানাচ্ছি
কষ্টে পেয়েছি তো - খইফোটা হেমন্ত! 

দেখ্যো না কেমন পাগলা হাওয়া বইছে
উত্তরে হিমেল বাতাসে কাঁপছে পুরাতন শরীর
ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে পৌরাণিক ভালোবাসা 
কেবল জেগে থাকে সর্বশানা ঘুমকাতুরে কবি

কে আর ইচ্ছে করে দুঃখ পোষণ করে...বলো!
মেহমুদ কিম্বা মাহমুদা সবাই আয়েশি জীবন চায়
ছিন্ন-ভিন্ন পাণ্ডুলিপি বড়জোর কবির অমূল্য রত্ন

অষ্টাদশীর লম্বা কেশ তো ঐশ্বরিক অনুদান
অহেতুক ভালোবাসায় মহত্ব নেই - খুব ক্লান্ত লাগে!

 

 

 

চলে যাবো 
কুলসুম আক্তার সুমী

 

এই সকালের সোনা রোদ, আঁচল উড়ানো বাতাস 
দুপুরের কর্মক্লান্তি শেষে ধুপছায়া গোধুলি আকাশ
এই সান্ধ্য আঁধারের পর জ্বলজ্বলে তারার প্রদীপ, 
মায়ার আরশিতে সেঁটে রাখা লাল নীল টিপ
ঘুমঘোরে স্বপ্নে বোনা নতুন ফুলের কুঁড়ি
পাটভাঙ্গা শাড়ি আর বেলোয়ারি চুড়ি, 
এইসব অনুভব আর যত পাগলামী-ছেড়েছুঁড়ে 
একদিন ঠিক যাবো থামি। 
এই ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা অচেনা পথের বাঁক, 
দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া অজানা পাখির ঝাঁক
এই শরতে ধুসর হয়ে উঠা গাছেদের পাতা 
গহীনে গুমড়ে উঠা অব্যক্ত, অস্পষ্ট ব্যাকুলতা
এই হেমন্তের পিঠাপুলি সোনা রঙা ধান
বসন্তে ফুলের বাহার, কোকিলের কুহুতান
এইসব প্রেম-মোহ-মায়া পাশে রেখে ঠেলে-
একদিন ঠিক যাবো চলে। 
তার আগে, চোখ রাখতে চাই সব সুন্দরে 
পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ নিতে চাই প্রাণ ভরে। 

 

 

 

ফুল ঝরিয়ে গেল শত শত 
দীলতাজ রহমান

 

(১)

গ্রাম থেকে এক অনাত্মীয় বৃদ্ধলোক এসেই চামেলি খানমকে বলল, তোমার মাইয়ের যে ছেইলেপুইলে অচ্ছে না, চিকিচ্ছা করাও না?

চামেলি খানম বহুদিন আগে দেখা-পরিচিত গ্রাম্য সে বৃদ্ধের আসার কারণ ও কুশলাদি জানতে না চেয়ে বরং বেশ ঝাঁঝালোস্বরে উত্তর দিল-এটা কি প্রশ্ন করার মতো বিষয়? যাদের ছেলেমেয়ে হচ্ছে না তারা কি চিকিৎসা না করিয়ে বসে থাকে?

বৃদ্ধ অবদতি হয়ে বলল, 'হ, তা তো ঠিক। তাঅলি এট্টা পালক নিতি পারো। তারপরও যদি সুন্তানাদি অয়, তাঅলি সিডাসহ দুইডা অবে!’ 

এমন সব তোষামোদির সাথে চামেলির বউবেলার শ্বশুরবাড়ির পুরনো স্মৃতি চারণ করে বৃদ্ধ চামেলির মনে না হলেও, বাড়িতে জায়গা করে নিল একবেলা খাওয়ার।

কিন্তু পুষ্যি নেয়ার বিষয়ে চামেলি বলল, নায়া, মানুষ হওয়ার পর শেষে ওগুলো শেকড় খুঁজতে বেরোয়। যদি শোনে মা-বাবার ঠিক ঠিকানা নেই, বা নিজের সাথে তাদের স্ট্যাটাসের যখন মিল পায় না, পরে বেয়াড়া আচরণ করে। ওতে নাকি অনেক হ্যাপা, ভুক্তভোগীরা বলছে!

-গরীব আত্মীয়গে ভিতর যাগে বেশ কয়ডা অইয়ে গেছে, তাগেরতে চেয়েচিন্তে এট্টা নেও! সে অবস্তায় লিখেপইড়ে নিয়েও অবশ্যি লাভ নাই। কারণ, অত বাধ্যবাদকতা দিলি সেসব শর্ত আবার ভাঙে তাড়াতাড়ি। যাগে কাছতে আনবা, তাগে কবা, আমার আর আমার মেয়ের সম্পিত্তি সব তো ওই পাবে। কিন্তুক তুমরা যুদিন সামনে আসো, তাহলে সে কিছু পাবে না!

-তারপরও যদি কখনো চলে যায়!

-যাক! সম্পিত্তি তো নিতি পারতিছে না! শোনো বউমা, মানুষ যে নিজিগে ছেইলেমেইয়ে পালে, তারাও কি নিজের থাহে? একমাত্রর ছাওয়াল নিজি মানুষ ওয়ার পর সে মা-বাপরে রাইখে শ্বশুরবাড়ি বা অন্যহানে গিয়ে থাহে, তারবেলা?

-যেভাবে বলছেন, পাবোই বা কোথায়!

-যদি বাসনা হরো তো আমি দেখতি পারি! 

তমিজ মোল্লা কবিরাজি করে। তবে সে ঘড়েল টাইপের নয় বলেই শুনেছে চামেলি।

 

(২)

কদিন পর তমিজ মোল্লা আবার এল। কোলে বছর আড়াই এর এক শিশুকন্যা। চামেলি খানম চমকে ওঠেন শিশুটিকে দেখে। ভয় পাওয়া স্বরে বললেন, আমি তো তনিমাকে এ বিষয়ে কিছু বলিনি!

-না বলছ তো কী অইছে? বাচ্চা পালবা তো তুমি! তুমি ওরে তনিমার নামে পালতি থাহো! আমি তো বাড়ি বইসে শুনছি, একটা বাচ্চার জন্যি তুমার মাইয়ের ঘর নড়বড় করতিছে!

-কী কন চাচা, দোষ তো আমার মেয়ের না…!

-শোনো ছাওয়ালগে মা-বাপরে তা বুঝোনু যায় না! কথাডা তারাই রটাচ্ছে। তাগেও তো আমি চিনি! মাইয়ে তুমার এট্টাই। সে মাস্টারি কইরে খায়। তবু তারও তো বয়স অচ্ছে। সংসার যদি না টেকে, সে ক্ষেত্রি একটা বাচ্চার দরকার আরো বেশি!

-আপনি আজ ওকে নিয়ে যান। তনিমার সাথে বোঝাপড়া করে আপনাকে খবর দেব!

-সাধালক্ষ্মী পায়ে ঠেইলো না মা। পরে আর নাও দিতি পারে! আচ্ছা, বিষয়ডা তুমি আমার ওপর ছাড়ো!

-কী করবেন আপনি? মেয়ের ভয়ে ভয়ার্ত চামেলি রেগে বলেন।

চামেলি খানমের রাগী মুখ দেখে লাচার তমিজ মোল্লা শিশুটিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে পঞ্চাশ ছোঁয়া বিধবা চামেলি স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেই নিজের বুকে ফু দেন। ভাবেন, তনিমাকে না বলে ও বাচ্চা রাখলে, পরে যদি সে ওকে না চায়! কোনোদিন তো এসব নিয়ে মা-মেয়ের কথা হয়নি!

তনিমাকে বিয়ে দিয়ে কাছেই রেখেছেন চামেলি। কিছুদিন হল জামাই তার কোম্পানির সাথে চুক্তিতে দুবছরের জন্য কানাডা গেছে চাকরি করতে। চাপা স্বভাবের তনিমা কিছু না বললেও চামেলি বোঝেন, এটাই হয়ত তার দূরে সরার একটা ছুতো। 

বিকেলে তনিমা ফিরে এলে চামেলি তার কাছে পুরো ঘটনাটি বলবেন ভাবছেন। এর ভেতর তমিজ মোল্লা শিশুটিকে নিয়ে আবার হাজির!

এবার মোল্লা চামেলিকে নয়, তনিমাকে বলল, আমার এই মেয়েডারে ক’দিন তুমি রাখো তো বুবু!

তনিমা এই বৃদ্ধকে কখনো দেখেনি, সে তাই অতি আশ্চর্য হয়ে বলল, আমি তো স্কুলে থাকি। আমি ওকে কীভাবে রাখব?

-তুমার অইয়ে তুমার মা রাখপে!

-তাহলে মাকেই দেন! কিন্তু নিয়ে যাবেন কবে?

-যেদিন নিয়ে যাতি কবা, সিদিনই! আমার ফোন নম্বরটা রাহোদিনি!

চামেলি আর মেয়ের কাছে গোমর ভাঙলেন না এবং মনে মনে কবিরাজের বুদ্ধির তারিফ করলেন।

তিনচারদিনেই শিশুটি যেন তনিমার সন্তান হয়ে উঠল। এতে চামেলি বুঝলেন, মেয়ের মনে সন্তানের তৃষ্ণাটা প্রবল হয়ে ছিল। তাই চামেলি সাহস করে মেয়েকে বলল, কবিরাজ ওকে তোমার জন্য এনেছে, কিন্তু ভয়ে বলিনি!

মায়ের কথায় ভর করে তনিমা বলল, তাহলে ওর ঝিনুক নাম বদলে অনিমা রাখলাম। সপ্তাহখানেকের ভেতর তনিমা ওর এক ডাক্তার আত্মীয়কে ধরে নিজের ও স্বামী জোবায়েরের নামে অনিমার বার্থ সার্টিফিকেট ও তৈরি করে ফেলল।

এর কদিন না যেতে আঠারো-ঊনিশের এক মেয়ে একভোরে এসে বলল, আমার ঝিনুকরে ফিরায়ে দ্যান! 

চামেলি খানম ও তার মেয়ে তনিমার বোবা বিস্ময়ের উত্তর জোগাতে ক্লিষ্ট-বিধস্ত মেয়েটি গেটের বাইরে দাঁড়িয়েই বলতে লাগল, কবিরাজ আমারে ভাওতা দিয়া বিয়া করছিল, দুইবিঘা জমি লেইহে দেবে কইয়ে। কিন্তুক দেয় না। তাই তার মাইয়েরে ফেলাইয়া চইলে গেছিলাম। আমি আসার পর কবরেজ কয়, তোরে কিছু দিতি পারলাম না, তোর মাইয়েরে আমি বড়লোক বানাই দিই। কিন্তু পরানপুড়ার জ্বালায় আর থাকতি পালাম না! শেষে পুলিসির ভয় দিহালি কবরাজ আমারে এই বাড়ি দেহাই দেল! 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন