https://www.prothomalony.com/
7317
literature
রহস্য দেয়াল
কাজী আতীক
যতোই ঘন হয়ে ঘনিষ্ঠ কাছে আসো,
যতোই ছুঁয়ে থাকো অন্তর, ধমনী সমুদয়,
তবুও- এক অদৃশ্য দেয়াল
স্থাণুর মতো, আড়াআড়ি বসে
বজায় রাখে যোজন দূরত্ব আড়াল!
অথচ এতোটাই কাছাকাছি হয়তো
হাত না বাড়িয়েও স্পর্শ পাওয়া যায়,
স্পষ্ট শুনা যায় অস্থির হৃদয় স্পন্দন,
যার শাব্দিক অনুবাদ বিহ্বল অনুরাগ।
এক জটিল সমীকরণ,
যেমন সাগর অতল
কিংবা মহাকাশ অন্তরীক্ষে কৃষ্ণবিবর,
যতো বেশি জানা যায়
বেড়ে যায় বহুগুণ আরো অজানা রহস্য।
ঊষর মরুভূমির গল্প
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ছেড়ে চলে যাবার জন্যে চোখে একফোঁটাও জল নেই
কিন্তু বইয়ের পাতার অক্ষরগুলি এমনভাবে
এলোমেলো করে রাখা রয়েছে যেন
কষ্টের গলা থেকে যা-কিছু বেরিয়ে এসেছে
তার বেশিরভাগই সাদা পাতা না পেয়ে
এখানে ওখানে উড়ে বেড়াচ্ছে
অথচ সকাল দুপুর বিকেল সবটুকুই কান্নার
চোখ মুছে যতবার আকাশের দিকে তাকাই
বৃষ্টির মতো গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ছে
শীতের দেশে ভেসে যাচ্ছে যাবতীয় পাখি
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে অগণন শিশু
কান্নাকে ঢেকে রাখার যাবতীয় চেষ্টা
কোথাও কোনো জায়গা না পেয়ে
সাদা পাতার শেষপ্রান্তে এমনভাবে ঝুলে আছে যেন
কান্নার না প্রকাশ আসলে এমনই এক ম্যাজিক
বরফে ডুবে যাবার আগের মুহূর্তে
আমাদের কোনো বন্ধু না থাকলেও
হাসতে হাসতে বলে যাওয়া যায় ঊষর মরুভূমির গল্প।
মুণ্ডু
নিলয় গোস্বামী
দানব দেখেছ প্রিয়?
মুণ্ডু খেয়ে যার তৃপ্তি আসে!
অনুভবের সংহার ছেয়ে গ্যাছে হৃদয়ের অবলা প্রকোষ্ঠ।
একবার হাতের তালুর মতো চেয়ে দেখো,
সীমানা ভাঙতে যাওয়া বিষাক্ত প্রবচন ফণার
থাবার মতন, আঘাতের মাতন ছড়ায় বুকে।
রাত ফিরে আসে ভুলে।
নির্জনতার মন্থর প্রলাপ নাভিতে
অমৃত ধারণ করে বসে আছে আজ...
প্রহর তুলোর মহলের কাছে জমিয়ে রেখেছে
শপথের ভার।
হাওয়া ভীষণ চালাক, বিচক্ষণ গতিতে প্রবেশ করছে
মেঘের পাঁজরে।
আঘাত একটা কৌশল, না জানলে ভরসা ভাঙা
ভীষণ দুষ্কর হয়ে পড়ে।
ক্ষমতা যখন রাষ্ট্রীয় সীমানা
শেখ জলিল
কে যে কখন দখলে নেয় কার ধন
বোঝা মুশকিল এই স্বার্থপর দুনিয়ায়!
ক্ষমতা যখন রাষ্ট্রীয় সীমানা টানা
আর ধন তার পাহারা দেয় সামন্ত সেনা
থাকে না কোনো ধর্ম, মানবতার লেশমাত্র
রাজনীতিই আসল লক্ষ্য উম্মার খোলস!
কে বলে মুসলিম, কে বলে ভাই
দেখো স্বার্থে চলছে পুরো দুনিয়াটাই!
বাঁচতে চাইলে তাই লড়ো
লড়তে চাইলে অস্ত্র ধরো-
তোমার সাহসের চেয়ে বড় কিছু সহায় নাই
বুকের রক্ত বিনা যায় কি কেনা অস্তিত্বের যশ?
কুহকিনী
শঙ্খশুভ্র পাত্র
ওই যে জাগালে হেসে, ঢেউ হয়ে অস্থির তুমুল
চোখে-চোখে ছুঁয়ে দিলে দুরু-দুরু কবিতা আমার৷
সেই শুরু ভালোবাসা, মনে-মনে পলাশ-শিমুল,
বসন্ত রঙিন-কুহু- সুরে যেন ধ্রুপদ-ধামার...
তোমাকে বলিতে চাই নিরিবিলি— কাছে এলে দীপ
প্রজ্বলিত শিখাটির পানে চেয়ে খুশি সেই প্রাণ,
নিবিড় তমসা ভেদে— আমি সে অভেদ, সদাশিব
মাথায় রেখেছি চাঁদ, আশীবিষ, সে তোমার দান৷
আমাকে লেখাও জাদু, দূরতর দ্বীপ-দারুচিনি৷
তোমাকে চেনার ছলে নদ-নদী, মরভূ, সাগর
একাকার করে দিতে ইচ্ছে হয়— তুমি কুহকিনী,
কী তুক শিখেছ? সুখ, সেজে ওঠে সনেটের ঘর৷
সে-গৃহে একাকী আমি— একতারা, আউলবাউল
ওই যে জাগালে হেসে, ঢেউ হয়ে অস্থির, তুমুল...
সন্দেহ
রাবাত রেজা নূর
সমুদ্রে নৌকা ছিল না। আমরা তীরে বসে ছিলাম।
কে যেন সমুদ্রের পানির উপর দিয়ে হেঁটে আসছিল।
আমরা চিৎকার করলাম, কে তুমি? তিনি বললেন,
তোমাদের প্রভু।
আমরা বিশ্বাস করলাম না।
তিনি আবার বললেন, তবে চোখ বন্ধ কর এবং
এসো আমার দিকে।
কেউ সাড়া দিল না।
আমি চোখ বন্ধ করে এগিয়ে গেলাম।
জলের উপর হাঁটছি।
হঠাৎ ডুবে যেতে শুরু করলাম; চিৎকার করে উঠলাম
–প্রভু আমি ডুবে যাচ্ছি।
তিনি এসে আমার হাত ধরে টেনে তুললেন এবং
বললেন–হে অল্পবিশ্বাসী, সন্দেহ করলে কেন?
দহতরণী
সুমন শামসুদ্দিন
উদাত্ত আকাশে স্থির তাকিয়ে থাকি নিঝুমরাতে,
স্থৈতিক কষ্ট নিগূঢ়গৃহে বসে নীরবে হাসে!
পেঁজাতুলোর মতো বিচলিত নীরদ গগনপাতে;
রাগাশ্রয়ী ধ্বনি গীতিহীন গহিনে দুচোখে ভাসে!
অতল হিমেল প্রাণে সুপ্ত ছিল এক দুঃখনদী,
জীবন অভিঘাতে অহোরাত্রি কাঁদে দারুণ ক্লেশে!
দুরূহ প্রেমবীণা রহস্যচক্রে অন্ধপদী,
অহর্নিশি আমি তলিয়ে যেতে থাকি বিষম শ্লেষে!
স্মৃতিপ্রতিবিম্বে অনুচিন্তাগুলো অসবর্ণ,
প্রকট অবহেলা বর্ণহীন করে চিত্তাকাশ;
মহানিশা দেহের অষ্টাঙ্গচুমে মৃতপর্ণ,
প্রেমহীন সত্তা চিত্রপটে আঁকা মধ্যাকাশ!
প্রাণবন্তরসে অধ্যুষিত ছিলো উপজীবিকা,
পড়ন্তবেলাতে স্মৃতির দর্পণে ভাসে নিয়তি;
তারুণ্যতাড়নে মুহুর্মুহু ভুলে ভাঙে বীথিকা,
নিমীলিত অদূরে ক্ষীণালোকে হারায় বঁধুপ্রিয়তি!
আজ বিষণ্ণতা একান্ত আপন মনহরণী!
বিধুরবসতির নিরন্তরপথে দহতরণী!
মনের দূরত্ব
আবদুল লতিফ
পাঁজরে পাঁজর ঘষাঘষি
ছুঁয়ে যায় অধরে অধর
উষ্ণতা বাড়ে গহীনে
বাড়ে হৃদপিণ্ডের নাচন
আপাদমস্তক মিশে দুটি দেহ
ঋণাত্মক দুরত্বে আসে
আংশিক শরীর
শরীরী সুখের ক্লাইম্যাক্স
পেরিয়ে ভাসে রাগ রসে
তবুও যোজন যোজন দূরত্বে
থাকে কভু দুটি মন
অপূর্ণই রয়ে যায় হৃদয়
ছোঁয়ার বাসনা।
আমার কফিননামা-১
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
পরিশেষে আমার কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিলাম, আমি নিজেই! আমার জন্য এটাই অনিবার্য ছিল। চূড়ান্ত বিচারে নিজেকে আর রক্ষা করা গেল না। অবশ্য এ সময়, হৃদয়ে রক্তপাত হচ্ছে জেনেও তা আমলে আনছি না। আমার মন, আমার বিবেক এবং আমার হৃদয় জর্জরিত হয়ে একেবারেই মেরামত অযোগ্য হয়ে গিয়েছিলাম। তাই, আমার সাথে নিজের এই সত্ত্বার সাথে বায়বীয় এ দুটো অনুষঙ্গও কফিনবদ্ধ হয়ে গিয়েছে! এখন আর শেষরক্ষা বলে কিছুই নেই।বলা যায়, এবার আমার নির্ঘাত নরকযাত্রা স্থির হয়ে গিয়েছে। এই আমি, বিলক্ষণ অনেক নিচেই নেমে এসেছি। আমার সামনে একপ্রস্থ ঘনায়মান অন্ধকার। শুধুই অন্ধকার। তাই এই রুদ্ধ উপত্যকায় পা ফেলে এগিয়ে যেতেই হবে।
এ সময় আমি নিশ্চিত হয়েছি, ইতোমধ্যেই স্থুল থেকে এক সূক্ষ্ম জগতে পদার্পণ করেছি। এখন আর পিছন ফিরে তাকাবার উপায়ও নেই। আর, তাকিয়েই কী হবে? প্রকৃত প্রস্তাবে কিছুই না। এ জগতের সকলেই ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছে, শেষ পরিণতিতে মানুষটা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। তাদের যত ঘৃণা, যত অপবাদ আর যত ধিক্কার বর্ষিত হচ্ছে আমার কফিনের উপর। আমার এই ‘কফিন’ বলতে, এখন বাতাশবিহিন এবং নিষ্প্রাণ বন্ধ একটা প্রকোষ্ঠ। এর নেই কোন পরিসর। নেই আমার দেহের উপর সূচালো আলো বা ক্ষীণ অক্সিজেন প্রবেশ করার ন্যূনতম সম্ভাবনা।
এ সময় আমি, চোখে নাকে মুখে আঙুল নেড়ে আমি নিজের বর্তমান অবস্থান পরখ করি। হ্যাঁ। এই চোখ, এই নাক, এই মুখ তো আমার নিজেরই! অন্য আর কারও নয়! এক্ষণে আমি নিশ্চিত হলাম। হ্যাঁ। এই লাশ আমার নিজেরই। চারপাশে আমার, যত কীট-পতঙ্গের অবাধ আগমন শুরু হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যেই। সোল্লাসে তারা সকলেই আমাকে ঘিরে ফেলেছে। আর সময়ক্ষেপণ নয়। অনতিবিলম্বেই সর্বভুক তারা অসুরের মত কিলবিল করে আমার আট কুঠুরি নয় দরজা দিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে। বাস্তবিকই দেখতে পাচ্ছি, বিশাল প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে তাদের উদ্ভ্রান্ত মিছিলে। তার প্রতিধ্বনিও শুনতে পাচ্ছি। হ্যাঁ। এবং তারপর? তারপর কী হবে? যা হবে, তা সহজেই আন্দাজ করতে পারছি ঠিকই। তখন তারা আর অধিক প্রবেশদ্বারের অপেক্ষা বা খোঁজ করবে না। তারা আমার দেহের প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে নির্ঘাত ঢুকে পড়বে অন্দরে। নারকীয় আক্রোশ নিয়ে সমূহ কোষচক্রে হানা দিয়ে, সমূলে খুবলে খাবে আমাকে। তাদের গ্রাসের আয়ত্বে, আমার কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখবে না। এমন কি আমার অতীত সুদ্ধ খেয়ে নেবে। তারা আমার সব এমন করে খাবে, তাতে আমার নাম নিশানা, চৌদ্দপুরুষের ঐতিহ্য কিছুই থাকবে না আর এই জগতগ্রন্থের পৃষ্ঠায়।
তাই, পুনশ্চই আমাকে বলতে হচ্ছে একই কথা, এই আমার কফিনের কথা। চূড়ান্ত সত্য এই যে, এখন আমি কফিনবন্দি হয়ে আছি, একেবারেই যাবজ্জীবনের জন্য। আমরণের কথা বললাম না। মরণ মানে, নিশ্চল সার্বভৌমে অনুভববিহীন এবং স্বপ্নহিন হয়ে থাকা। আমি জানি, মরণের পরও আমি তা হব না। আমার পারলৌকিক সংশ্লেষণের স্থিতিতে, প্রতিটি মুহূর্তেই আমি অনুভব, উপলব্ধি করবো আমার ইহজনমের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
এখন, বাস্তবিকই শোচনীয় এক জগতের অলিন্দে ঢুকে পড়েছি। দ্বিতীয় আর কোন পথ নেই। দেখতে পাচ্ছি, আমার মানবীয়সত্ত্বার অধোগতি শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন মুখোমুখি হতে হবে অন্য এক পরাবাস্তবতার! এই অলৌকিক স্থিতির বাস্তব অভিজ্ঞতা কোন জীবিত মানুষের নেই। থাকার কথা নয়। কিন্তু আমার আছে। এবং হচ্ছে। আমার রূপান্তরমুখি কফিনবন্দিত্বের উপাত্ত বর্ণনা ঠিক এমনই। এই সময় এতকিছু উপস্থাপন করতে হচ্ছে আমাকে, সকল জীবিত মানুষদের উদ্দেশ্যে। আমার বিগতজীবনে ছিল বিস্তর বর্ণের ছটা। বর্ণনার ঘনঘটা। কিন্তু, হঠাৎ করেই কী ভাবে কী হয়ে গেল! আমি অবশ্যাম্ভাবী পরাবাস্তবের খাদে পা রেখে নিমেষেই নিজেকে একেবারে ধ্বংসের গহিনে অবলীলায় ছেড়ে দিয়েছি। এক উন্মুখ তাণ্ডবের মুখে আমাকে সমর্পণ করেছি কোন দিগ্বিদিক চিন্তা না করেই। আর চিন্তা করার সেই সময় ও সুযোগ কি পেয়েছি এই আমি? না। পাইনি!
আমার এই ভয়ানক ও বিভীষিকাময় সুড়ঙ্গের অলিন্দ দর্শন অপূর্ব! অভাবনীয়! এই আরেক মহাজাগতিক অনিবার্য চিত্র! এই মহাসত্যের কথকতা আমার মননে গেঁথে রাখছি। এবং সামনের গহীনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি দ্রুত!
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন