https://www.prothomalony.com/

7274

literature

সাহিত্য

সুব্রত কুমার দাসের সাক্ষাৎকার প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা শেখানোর উপায় অনুসন্ধান

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ১০:১২

[লেখক, গবেষক, সমালোচক, উপস্থাপক এবং সংগঠক সুব্রত কুমার দাস। মাতৃভূমি থেকে প্রবাসে, স্বদেশ থেকে পরবাসে, বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে কানাডার টরন্টোতে। অভিবাসী জীবনে তিনি পার করেছেন দশ বছর। এ বছর তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ "উৎস থেকে পরবাস" প্রকাশিত হয়েছে। এতে রয়েছে নানান অজানা অধ্যায়।  শৈশবস্মৃতি রোমন্থন করা থেকে শুরু করে কর্মজীবন, সাহিত্যের জগতে প্রবেশ, কানাডায় আগমণ, কিছু হৃদয়বান মানুষের সংস্পর্শ, কানাডার সাহিত্যজগতে প্রবেশ, সে-জগতে দার্ঢ্যের সাথে  বিচরণ, ধীরে ধীরে কাজের বিপুল প্রসার ও বৃদ্ধি। কুড়ি বছর ধরে পরিচালনা করে চলেছেন বাংলা উপন্যাস নিয়ে নিজের ওয়েবসাইট (bdnovels.org)। কানাডার সাহিত্য নিয়ে বাংলা ভাষায় বই লিখেছেন। টরন্টো ইন্টারন্যাশন্যাল ফেস্টিভ্যাল অব অথরস (টিফা)-তে এ পর্যন্ত তিনবার অংশ নিয়েছেন।

ঊনষাট বছরের পথচলায় যা কিছু পাথেয় রয়েছে তা জানতে আমাদের পক্ষে যুক্ত হয়েছেন কানাডার হ্যালিফ্যাক্স শহরের আরেক তরুণ লেখক অতনু দাশ গুপ্ত।]

অতনু দাশ গুপ্ত:  আমার প্রথম শহর কেপ ব্রেটনের সিডনি, নোভাস্কোশিয়ায়। আটলান্টিক কন্যার আশীর্বাদে পরিপূর্ণ অভূতপূর্ব সব দৃশ্যের অবতারণা ঘটায় এমন একটি জায়গা। কেপ ব্রেটন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কিছু দক্ষিণ ভারতীয় মেয়ে বন্ধুর  সংস্পর্শে  এসেছিলাম। ওদের অধিকাংশই বিবাহিতা এবং লক্ষ করার মত বিষয় এই যে ওদের বাচ্চাদের সাথে ওরা মাতৃভাষায় কথা বলতেন। ইংরেজি ভাষায় নয়! মনে আছে তাদের একজনের একটা ফুটফুটে আদুরে কন্যা ছিল যার সাথে আমি কখনোই কথা বলতে পারিনি কারণ ও ইংরেজি জানতো না। কিন্তু ওর মাতৃভাষা মালায়ালাম জানতো। একই রকমের অভিজ্ঞতা ভারতীয় আরও কিছু পরিবারের ক্ষেত্রেও দেখেছি। এই যে ছোটকাল থেকেই মাতৃভাষায় কথা বলার অভ্যাস যা দুর্ভাগ্যবশত আমি বাঙালি পরিবারগুলোতে দেখিনি।

সিডনিতে আমি তিনটি বাঙালি পরিবারের সংস্পর্শে ছিলাম। সব পরিবারেই বিপরীত ঘটনা অবলোকন করেছি।  ওদের বাচ্চারা বাংলায় খুবই কম কথা বলে।  সিডনির পর হ্যালিফ্যাক্সে এসেও যে পরিবারের সাথে আমার সখ্য হয়েছে সেখানেও একটি ছোট বাচ্চা আছে। ওর সাথে আমি বাংলায় কথা বলতে পারি না। আমি চেষ্টা করে দেখেছি, ও ইংরেজিতে কথা না বললে তেমন একটা সাড়া দেয় না।

টরন্টোতে যখন গেলাম তখনও একই দৃশ্য দেখেছি।  এই যে আমাদের বাঙালি পরিবারগুলোতে বাচ্চাদের মাতৃভাষা বাংলা বলতে না পারা এবং সে কারণে মাতৃভাষার সাথে ছোটবেলা থেকেই একটা অদৃশ্য দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া এ বিষয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

সুব্রত কুমার দাস:  প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমি মনে করি না বাঙালিদের ভাষাপ্রীতি কম। হিন্দিভাষায় কথা বলার ব্যাপারে একটি ভারতীয় পরিবারের যেমন আগ্রহ থাকতে পারে, বা মালায়ালাম ভাষার কথা তুমি বললে, বা তামিল ভাষা শেখানোর প্রতিও সেই ভাষার মানুষদের আগ্রহ থাকতে পারে। একইভাবে আমি মনে করি বাংলা ভাষাভাষী পরিবারে আমরাও চাইবো বাচ্চারা প্রবাসে বড় হোক, বাংলা ভাষায় কথা বলুক। কিন্তু অনেক সময় যেটা ঘটে তা হচ্ছে আমরা পথ নির্ধারণ করতে পারি না। নিয়মিতভাবে ঘরে বাংলা ভাষায় কথা বলার কাজটি আমরা ঘরে করি না। বা কখনও কখনও  ছেলেমেয়েদের সাথেও বলা হয় না অপ্রত্যাশিতভাবেই।  

মনে রাখতে হবে কানাডায় বাচ্চাদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য পারিবারিকভাবে আমাদের কোন উদ্যোগ নেবার প্রয়োজন হয় না। স্কুলে, আশপাশের বন্ধুদের সাথে মিশে, চারপাশের পরিবেশ সবখানেই ইংরেজি ভাষা শেখার উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেখান থেকেই শিশু ইংরেজি শিখবে। অন্যদিকে বাংলা বা মাতৃভাষা শেখানোর জন্য পরিবারের মা-বাবাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। আবার অন্য ঘটনাও ঘটছে। যাদের বাচ্চারা এখানে জন্মেছে বা যারা এদেশে আসার সময় ছেলে-মেয়ে অনেক ছোট ছিল, তারা পরবর্তীকালে আর বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছে না বা বলার চর্চা ধরে রাখতে পারছে না। এটাকে আমার নিজের কাছে কখনও কখনও সমস্যা হিসেবে মনে হয়েছে যা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।

যখন বাচ্চা স্বাভাবিকভাবে মা-বাবার কাছ থেকে মাতৃভাষার পাঠ নিতে পারছে না তখন তাকে আলাদাভাবে তা শেখাতে হবে। এক্ষেত্রে যারা ভাষা শেখানোর দায়িত্ব পালন করবেন, তাদেরকে সঠিক পদ্ধতি বিষয়ে অবহিত থাকতে হবে। আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে কে শেখাচ্ছেন। তিনি যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি না সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যে ভাবে শেখানো হচ্ছে সেটি বৈজ্ঞানিক কি না সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

একটা উদাহরণ দিয়ে বললে বুঝতে সুবিধা হতে পারে। কানাডায় আসার পর আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের অনেককেই ইংরেজি ভাষায় ইএসএল (English as a Second Language) কোর্স করতে হয়। যাদের ইংরেজি ভাষার গাঁথুনি মজবুত নয়, তারা এটি করে থাকেন। সেরকমই আমি মনে করি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বিএসএল (Bengali as a Second Language) এর মত কোন একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নিতে যেতে হবে। সেটি অনেকটা ইএসএল-এর আদলেই হবে। যারা এ বিশেষ কোর্সে অংশগ্রহণ করছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে এটি সম্পন্ন করতে তাদের একটি বিশেষ কোর্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এজন্য তাদেরকে একটি আলাদা পাঠক্রমে অভ্যস্ত হতে হয় এবং তার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশেরও নির্মাণ করা হয়। একই দৃশ্যপটে দেখতে গেলে  যে সকল পরিবারে মাতা-পিতা বাঙালি কিন্তু সন্তানদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য একটি বিশেষ পাঠ্যক্রমও লাগবে এবং একটি বিশেষ পরিবেশেরও প্রয়োজন হবে। তাকে সেই পাঠের বিষয়বস্তু আত্মস্থ করানোর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একজন শিক্ষকের সংস্পর্শে আসতে হবে। যে কোনো সাধারণ শিক্ষক তা করতে পারবেন না যেমন একজন সাধারণ কানাডিয়ান  ইএসএল করাতে পারেন না। এটির জন্য তাকে আলাদা কোর্স সম্পন্ন করতে হবে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে।

একইভাবে বাংলা যারা শেখাবেন তাদেরকে ও একটি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে তারপর শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। যদি তা না করা হয়, তখন গোঁজামিল হবে, এলোমেলো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আমাদের সকলের জানা আছে,  শিক্ষাদানের ব্যাপারটি যখন ত্রুটিপূর্ণ হয়, পূর্বকল্পিত এবং পূর্বচিন্তিত না হয়, তখন ভাষাশিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথার্থতা পায় না, সফলতা আসে না। পরবর্তীকালে আমরা উপলব্ধি করি এটি একটি ব্যর্থ প্রয়াসে পরিণত হয়েছে।

আমি দেখেছি যে, প্রবাসের কমবয়েসী ছেলেমেয়েরা বাংলা শেখানোর বিভিন্ন কার্যক্রমে ভর্তি হয়। কিছুদিন পড়াশোনাও করে। কিন্তু পূর্বপুরুষের ভাষা শেখার যে আগ্রহ তা তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি। কোর্স শেষ করার পর বাংলা ভাষা চর্চার বিষয়টিও ধরে রাখতে পারেনি অধিকাংশ। এর পেছনের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে উপযুক্ত শিক্ষাদান কার্যক্রমের অভাব। এ বিষয়টি আমি বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ঐতিহাসিকভাবে টরন্টো শহরে এর যে ব্যাপকতা সেটি নিরিখে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি এই পরিস্থিতি শুধু টরন্টোর প্রবাসীদের সমস্যা নয়, বা শুধু কানাডার অন্যান্য শহরের সমস্যা নয়। এটি সারা পৃথিবীতে যেখানেই বাঙালি রয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে বাংলা সেখানোর চেষ্টা করে হচ্ছে, সেখানকারই সমস্যা।

আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না এখানেও – এই টরন্টোতেও – চার দশক আগেই বাংলা শেখানোর জন্য স্কুল তৈরি হয়েছিল। এমন মানুষের সন্ধানও আমি পেয়েছি যিনি টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড বা টিডিএসবিতে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। নতুন এই দেশে বাঙালিদের অভিবাসন শুরুর পর থেকেই তো এই প্রয়াস চলেছে। সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু গত চল্লিশ বছর ধরে কাজ হলেও সফলতা আসেনি। কিছু উদ্যোগী মানুষ একসাথে এসেছেন, কাজ করেছেন কিন্তু তারা অনেকাংশেই সফলতার মুখ দেখেননি। এই যে ব্যর্থতা; এখান থেকেই আমাদের শিখতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এটাকেই  আমরা ভবিষ্যতে চলার পাথেয় হিসেবে দেখতে হবে। সেই ব্যর্থতার কারণগুলোকে নতুন প্রকল্পে এড়াতে হবে। তাহলে নিশ্চয়ই আমরা অদূর ভবিষ্যতে সফল হবো।   

কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, অসফলতা থেকে আমরা শিখি না। এর থেকে কিছু শিখি না বলেই এখনো পর্যন্ত বাংলা ভাষার এমন কোনো একটি  স্কুল  বা কোনো একজন শিক্ষককে আমরা দেখি না যিনি কোন বাঙালি পরিবারে – যাদের সন্তানের মাতৃভাষা বাংলা নয় তাদেরকে ভাষা শিক্ষা প্রদানের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে, সঠিক পাঠক্রমে উপস্থাপন করেছেন বা পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে যিনি শিক্ষাদানের দায়িত্বে আছেন তাকেই নিজে উদ্যোগী হয়ে ভাষাশিক্ষার প্রশিক্ষণ নিয়ে আসতে হবে যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাঠদান করা সম্ভব হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে এক্ষেত্রে লন্ডন ইউনিভার্সিটির SOAS (School of Oriental & African Studies) এর কথা বলবো যেখানে বাংলা ভাষা শিক্ষা প্রদানের জন্য Bengali beginner's course রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শিখে আসতে হবে যে একজন অবাঙালিকে বা প্রবাসী বাচ্চাকে কীভাবে বাংলা শেখাতে হবে। অথবা জানতে হবে সেই শিক্ষাদান পদ্ধতি। এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করার পাঠক্রম যা সফলভাবে সম্পন্ন করলেই বাচ্চাদের সঠিকভাবে শিক্ষাদান সম্ভব হবে।  মনে রাখতে হবে, একজনের মাতৃভাষা বাংলা হলেই কাউকে যদি ভাষা শেখানোর দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তিনি সেই গুরুদায়িত্ব কী করে পালন করবেন?

টরেন্টোতে ইএসএল-এর কোর্স যেখান থেকে করা হয় সেখানকার শিক্ষকগণ কিন্তু প্রশিক্ষিত। তারা সেই পাঠক্রম সম্পন্ন করেছেন। আমাদেরও একইভাবে যেটার আমি নামকরণ করেছি বিএসএল (Bengali as a Second Language) সেটার উপর প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এখানে যেহেতু সেটি নাই, তাহলে আমাদেরকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে নিজেকে জানতে হবে। শিক্ষাদাতা হতে হলে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিজেকে এর জন্য উপযুক্ত করতে হবে, তারপর বাচ্চাদের সাথে কাজ করতে যেতে হবে।

একজন মানুষকে তার মাতৃভাষা জানা আছে বলেই অন্যকে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ঠিক না। আর যদি তা করা হয় তাহলে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের বাচ্চাদের মূলত দুটি ক্ষতি করে ফেলবো অজান্তেই – প্রথমত, তাকে সঠিকভাবে মাতৃভাষা শিক্ষাদান করছি না। দ্বিতীয়ত, সেই ভাষার প্রতি তার বিরূপতা তৈরি হচ্ছে।

এমন অনেক মানুষ রয়েছেন মাতৃভাষা বাংলা না হলেও তারা আমাদের মাতৃভাষা শিখেছেন, চর্চা করেছেন, বই লিখেছেন, সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। এটা কী করে সম্ভব হয়েছে? এজন্যই হয়েছে কারণ এ ভাষার প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে তিনি এর সাথে যুক্ত থেকে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা করেছেন, শ্রম দিয়েছেন, অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অধ্যয়ন করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ  আমি আবু সয়ীদ আইয়ুবের নাম বলবো। তাঁর মাতৃভাষা ছিল উর্দু। তিনি প্রথমে উর্দু ভাষায় গীতাঞ্জলি পড়লেন, এরপর ইংরেজিতে পড়লেন। এরপর তার প্রচন্ড ইচ্ছে হল বাংলায় গীতাঞ্জলি পড়ার। তিনি বাংলা ভাষা শিখলেন এবং বাংলায় গীতাঞ্জলি পড়লেন। শুধু পড়লেনই না, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে ক্রমাগত পড়েই চললেন। ক্রমাগত অধ্যয়নের কারণে তিনি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দুই দুইটি পুস্তকের রচয়িতা হলেন যা সকল রবীন্দ্রপ্রেমীর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে আজও সমাদৃত। এই ঘটনার মূল কারণ কিন্তু ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহ, ভালো লাগা।

একইভাবে বলতে গেলে, আমরা যদি সন্তানদের ভুলভাবে ভাষা শিক্ষা দিই, তাহলে শেখার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি না হয়ে বরং অনাগ্রহ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে তার ক্ষতি হবে –

সে হয়তো আর কোনদিনও বাংলা ভাষার কাছে আর ফিরে আসবে না। এবারে আরও অন্যরকম দৃষ্টান্ত দেবো – আমেরিকায় বিখ্যাত একজন লেখক আছেন যার নাম ক্লিনটন বি. সিলি। তার মাতৃভাষা তো ইংরেজি, তবুও তিনি নিজ আগ্রহের কারণে বাংলা শিখেছেন, জীবনানন্দকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ' কাব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।  বাংলাভাষার প্রতি এমন একনিষ্ঠ লেখক, গবেষক ব্রিটেনেও আছেন যার নাম উইলিয়াম রাদিচে। জাপানেও এমন একজন রয়েছেন। তাঁর নাম আজুও আজুমা। তাঁরা প্রত্যেকেই অবাঙালি হয়েও বাংলাভাষার প্রতি দেখিয়েছেন অনন্য আগ্রহ। লিখেছেন বাংলাভাষায় মূল্যবান সব গ্রন্থ।    

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, আমরা যদি এখানকার ছেলেমেয়েদের ভাষা শেখানোর জন্য  সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারি তাহলে একটি বিপ্রতীপ অবস্থার সৃষ্টি হবে। শেখার প্রতি আগ্রহ তো দূরে থাক, ক্রমেই তীব্র অনাগ্রহ তৈরি হবে তাদের মধ্যে। এটাকে রোধ করে তাদের সঠিক পথের দিশা দেখাতে হবে। অগ্রবর্তী প্রজন্মের মানুষ হিসেবে এটা আমাদের অনেক গুরু দায়িত্ব।

অতনু দাশ গুপ্ত:  আমার প্রশ্নের উত্তরে এত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা পেয়ে ভীষণ ভালো লাগছে! আশা করছি আমাদের পাঠকগণ এবং প্রবাসীবৃন্দ সকলেই আপনার অনুধাবিত বিএসএল (Bengali as a Second Language) এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবেন এবং বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন।

এখন জানতে চাইবো, এরা তো একটা মাত্রা অবধি শিখতে পারবে কিন্তু পরবর্তীকালে বাংলাভাষার চর্চা বংশানুক্রমে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য কী করতে হবে?? এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হওয়ার পদ্ধতিটি কেমন হওয়া উচিত ? 

সুব্রত কুমার দাস:  স্বদেশে যেভাবে বাংলা ভাষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যায়, বা এর চর্চা হয়ে থাকে, প্রবাসের প্রেক্ষিতে অবশ্যই তেমনটা হবে না। এর জন্য আমি মনে করি, দুটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে – পরিবারে ভাষার চর্চা রাখতে হবে। মা-বাবাকে সন্তানদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলতে হবে। আমরা যখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে বা কোথাও মিলিত হই, তখন যেন আমরা নিজেদের সন্তানদের সাথে  মাতৃভাষায় যোগাযোগ করি। এভাবে তাদের মধ্যে ভাষাচর্চার একটা ক্ষেত্র তৈরি হবে। আর যারা চর্চার পরেও পারছে না তাদের জন্য বিএসএল বা কোনো কার্যকরী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা করতে হবে। এমন একটি কার্যক্রম যার মধ্য দিয়ে গেলে ওরা ভাষাচর্চার কাজটি আনন্দের সাথে করবে এবং এ চর্চা তাদের মনে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হবে।

অতনু দাশ গুপ্ত: এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে কীভাবে?? পরিবার থেকে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে??

সুব্রত কুমার দাস:  ভাষাচর্চার কাজটি পরিবারের ভেতরে হতে পারে কিন্তু শিক্ষার বিষয়টি অবশ্যই তারা করতে পারবেন না। তখন আমাদের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হবে। এক্ষেত্রে বাঙালি সমাজের একটি ভূমিকা রয়েছে। আমরা যদি এমন প্রশিক্ষিত শিক্ষাদাতা তৈরির জন্য উদ্যোগ নিই বা এর জন্য ব্যবস্থা করে দিই তখন কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন হবে।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে আলোকপাত করতে চাই – ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে এমন একটি পরিস্থিতি আমাদের তৈরি করতে হবে যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মের বাচ্চারা বাংলা ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হয়। সেটা না করে আমরা যদি তাদের শাসন করি বা গীতাঞ্জলির মত গ্রন্থ পড়তে বাধ্য করি তাহলে কোন কাজ হবে না। আমাদের বাঙালিদের সবসময় ঔচিত্যের প্রশ্ন করার প্রবণতা রয়েছে – যেটা বাচ্চাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধাস্বরূপ বলে আমি মনে করি।  তাদের আশেপাশে এমন একটি বলয় তৈরি করতে হবে যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করে, "গীতাঞ্জলি কি আমার পড়া উচিত?  কেন পড়া উচিত?" এটা বাস্তবায়নের জন্য কৌশলগত পন্থা যেমন – আমরা গীতাঞ্জলির একটি ইংরেজি অনুবাদ তাদের কাছে পৌঁছে দিলাম বা এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আমাদের দেশের আরও নানান সব খ্যাতির শিখরে ওঠা সাহিত্যকর্মের ইংরেজি অনুবাদের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আমি যদি কাজী নজরুল ইসলামের অনন্য সব সৃষ্টির সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই বা তাদেরকে জানাতে চাই, বা জীবনানন্দ সাহিত্য জগতের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি – তাহলে তাদের সৃষ্টিকর্মের নানান অনুষঙ্গের ইংরেজি ভাষায় অনূবাদিত বই পড়ার টেবিলে রেখে দিতে হবে বিনা বাক্যব্যয়ে। এমন আরও অসংখ্য অমর সৃষ্টির সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে কোন শব্দ ব ব্যয় না করে। যদি আমরা এভাবে বাংলাভাষার বিশাল যে সাহিত্যভান্ডার, তা ভালো অনুবাদকর্মের মাধ্যমে তাদের সামনে তুলে না ধরি তাহলে বিষয়টা সত্যিই দুরূহ হয়ে পড়বে।

শেখার কাজটা তার নিজের ভেতর থেকে ততদিন পর্যন্ত আসবে না যতদিন সে উপলব্ধি করবে না, "বাহ! এটা তো একটা অসাধারণ বই! আমি এটা পড়বো!" এরপরের ধাপ হচ্ছে তারা বাংলা ভাষাতেও এটি পড়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করা। হয়তো আমরা অদূর ভবিষ্যতে এখনকার প্রজন্মের এমন কাউকে পাবো যিনি গীতাঞ্জলি নিয়ে লিখেছেন অথচ বাংলা জানতেন না!

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন