https://www.prothomalony.com/

6997

literature

সাহিত্য

বাংলা উপন্যাস-বিষয়ক প্রথম ওয়েবসাইট এবং একজন সুব্রত কুমার দাস

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৩ ০৯:১৮

১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় টরন্টোর ড্যানফোর্থ অ্যাভিন্যুর ‘রেডহট তন্দুরী’ রেস্তোরাঁতে সাদামাটা অথচ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হলো বাংলা উপন্যাস-বিষয়ক প্রথম ওয়েব পোর্টাল বিডি নোভেলস ডট ওআরজি (bdnovels.org) এর বিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানটি। খবরটি অতি বিস্ময়কর ও গর্বের ব্যাপার আমাদের বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য। আর এই আয়োজনের পুরোমাত্রার কৃতিত্ব যাঁর তিনি হলেন বিশিষ্ট কানাডিয়ান বাঙালি লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক ও একনিষ্ঠ বাংলা সাহিত্য সংগঠক সুব্রত কুমার দাস। ঊনত্রিশটি গ্রন্থের একক লেখক সুব্রতদা হলেন এই পোর্টালটির আইডিয়ার ধারক ও প্রবর্তক যা তিনি কুড়ি বছর আগেই সার্থকভাবে সম্পাদন করেন।
আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে যদি দেখি তাহলে ব্যাপারটা এমন যে এই bdnovels.org যাত্রা শুরু করেছিল বাংলার টরোন্টো বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সুব্রত কুমার দাসের হাত ধরেই ২০০৩ সালের ২ অক্টোবর তারিখে। তখন পোর্টালটিতে বাংলা উপন্যাস তথা সাহিত্যের বিষয়বস্তুর উপস্থাপন করা হয়েছিল ইংরেজি ভাষাতে কারণ তখনও ইন্টারনেট খুব একটা সহজলভ্য ও প্রচারমুখর হয়ে ওঠেনি সাধারণ জনগনের মধ্যে। বাংলা ইউনিকোড ব্যবস্থার সহজলভ্য ব্যবহার চালু হয়নি। ফলে এই উদ্যোক্তাকে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল পোর্টালটি চালু করতে।

যতটুকু জানা যায় কিছু ব্যবসাভিত্বিক প্রতিষ্ঠান ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাইবার ক্যাফের বানিজ্যিক ব্যবহার শুরু করে এবং সাধারণ জনগনকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা প্রদানে সমর্থ হয়। তখন মূলত ইমেল ও ব্রাউজার বিশেষে সার্চ ইন্জিন ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। তখনও বাসা বাড়িতে ব্যতিক্রম ছাড়া ইন্টারনেট সার্ভিস চালু হয়নি। কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় ছাত্রদের কম্পিউটার বিষয়ে জ্ঞান দানের প্রয়োজনে ফ্যাসিলিটির কার্যক্রম চালু করে। ইমেইল ব্যবস্থাও খুবই সীমাবদ্ধ ছিল সাধারণ জনগনের জন্য। তবে শিক্ষক ও ছাত্র পরিসরে কিছু প্রয়োগ ছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে ১৯৯৬ সালে আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার এমফিল স্টূডেন্ট, ডক্টর অজয় কুমার রায়ের সুপারভিশনে মোকারম হোসেন বিল্ডিঙে গড়ে ওঠা সলিড স্টেট ল্যাবে যেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিজ্ঞান লাইব্রেরির সামনে অবস্থিত ছিল এই বিল্ডিংটি। পাশেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কম্পিউটার সাইন্স বিষয়ক বিল্ডিং – কম্পিউটার সেন্টার নামে খ্যাত সেখানকার প্রশিক্ষণের নেতৃত্ব ছিলেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্ররা। নাম বললে অবশ্যই জেরিনা আপা ও জুয়েল ভাই-এর কথা বলতে হবে। আমি এমফিলের ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কম্পিউটার সেন্টারে যেতাম মাইক্রোসপ্ট প্যাকেজ ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্টে ইমেইল কীভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে কোর্স করতে। ভর্তি হয়ে পুরো মাত্রায় সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতে শুরু করি পরে। সেখানে এমএস অপারেটর বারি ভাই-এর মাধ্যমে একটি ইমেইল খুলে বহির্বিশ্বে স্কলারশীপের জন্য যোগাযোগ শুরু করে দেই। কিন্তু সত্যি বলতে আমার মতো অমন সুযোগ বাকি সব ছাত্র পেয়েছিল কি না সন্দেহ আছে। বিশেষ করে কলা বিভাগে যে সব ছাত্র পড়তেন – সেখান থেকে সেন্টারটি যথেষ্ট দূরে ছিল, পায়ে হেঁটে বিশ পঁচিশ মিনিট তো লাগবেই।

এই সময়ের ইন্টারনেটের প্রসঙ্গকথা সু্ব্রতদা খুব সুন্দর করে বলেছেন তাঁর কিছু কিছু সাক্ষাৎকারে। বর্তমানের এই পোর্টালটিতেও তিনি উল্লেখ করেছেন সেসব কথা সবিনয়ের সাথে তাঁর অমায়িক আলোচনায়। সুব্রতদা উল্লেখ করেন যে বাংলা নভেলস-এর ওয়েব পোর্টালটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন করা হয়েছিল ২ অক্টোবর তারিখে ২০০৩ সালে এবং সেই থেকে ইংরেজি ভাষাতেই উপস্থাপিত সাহিত্যতথ্য নিয়ে চলে আসছিল পোর্টালটি। কিন্তু জ্ঞান পিপাসু সুব্রতদার মনে বাংলা ভার্সন কন্ভারশন করার চিন্তা ক্রমেই তীব্রতর হয়। বাংলা ভাষায় বাংলা উপন্যাস পাঠের গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তার ছাত্রের সাথে টিম গঠন করেন এবং টিম ওয়ার্ক করে পোর্টালটিকে ২০০৫ সালে বাংলা একাডেমিতে মাতৃভাষা উদযাপনের অংশ হিসেবে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ভার্সনে প্রবর্তনের সুযোগ প্রদানে সক্ষম হন যা বিশ্ব বাংলাভাষা প্রেমী পাঠকের জন্য স্মরণীয় একটা অধ্যায় অর্থাৎ বলা যায় মাইলস্টোন ছিল।

টরন্টোতে বাঙালি অধ্যুসিত এলাকা ড্যানফোর্থে রেডহটের রেস্তোরাঁতে আয়োজিতএই অনুষ্ঠানে সৌভাগ্যবান আমন্ত্রিত ও উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে আমার স্বামী শামিম ও আমিও ছিলাম। সুস্বাদু বাঙালি খাবারের পাশাপাশি পুরো আয়োজনটি আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। সেই সুবাদে একটি চমৎকার অপ্রকাশিত গল্পের ভাগিদার হতে পেরেছিলাম আমরা দুজন।

গল্পটি ছিল স্বয়ং সুব্রত কুমার দাসের স্ত্রী নীলিমা দত্ত বউদির মুখে শোনা। সংক্ষেপে এরকম যে, সু্ব্রতদা ও বউদি কীভাবে একে অন্যকে এই পোর্টাল যাত্রায় সাথী হয়েছিলেন অর্থনেতিকভাবে। বউদিমনি কীভাবে সাড়া দিয়েছিলেন সাহিত্যপ্রেমিক স্বামীর অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে। তার কিছু ব্যক্তিগত ব্যাংকিং ইনভেস্টমেন্ট ম্যাচিউর্ড হওয়ার আগেই ভাঙিয়ে ফেলতে হয়েছিল এই কারণে। খুবই ইমোশনাল একটি ব্যাপার ছিল সেটা তাঁদের জন্য।  কতখানি প্রগাঢ় সাহিত্যপ্রেম আত্মায় ধারণ করলে একজন মানুষ সেভিং ডিপোজিট (ডিপিএস) ব্যবহার করেন সেটা বুঝতে হবে এখানে।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মম কাজী আমাকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন যা খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে ব্রিলিয়ান্ট প্রশ্নের জন্য সুব্রতদা’র এই টিম মেম্বারকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে পোর্টালটিতে নজর বুলিয়েছি এবং যা জেনেছি তার কিছু অংশ শেয়ার করছি এখানে।

https://bdnovels.org একটি secured website যা তার ‘https এর সাথে s লেটারটি বলে দিচ্ছে’। আমার অফিসের কাজের এর মাধ্যমে আমি সেটা নিশ্চিত জানি।
পোর্টালটির প্রথম মেনুতে আছে উদ্যোক্তা সু্ব্রত দার কথা, যোগাযোগের ঠিকানা। দ্বিতীয় মেনুবারে আপনারা ছয়টি বিষয় দেখতে পাবেন ‘নীড়পাতা’ নামক শিরোনামের নিচে। যথাঃ ঔপন্যাসিক, বিবিধ প্রাবন্ধ, সাক্ষাৎকার, ঔপন্যাস নিয়ে আলোচনা, ঔপন্যাস ও পশ্চিম বাংলার ঔপন্যাস।

উপরোক্ত যে কোনো মেনু ক্লিক করলে তা আবার বিস্তারিত জানবার সুযোগ পাবেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার দুটো ভার্সনই আপনাদের জন্য সহজলভ্য ও ক্লিক করলে উন্মুক্ত হবে। এই বিষয়টি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূ্র্ণ মনে হয়েছে যা পাঠককুল উপকৃত ও আগ্রহী হবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
বাংলায় অনেক বিখ্যাত কিছু  ঔপন্যাসিক যেমন সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, সেলিনা হোসেন, ইমদাদুল হক মিলন, নাসরীন জাহান, আল মাহমুদ, আহমেদ ছফা প্রমুখের সাহিত্য-বিষয়ক আলোচনা পড়তে পারবেন।

আমি বলব জোর দিয়ে বন্ধুরা তোমরা সবাই এই bdnovels.org পোর্টালটি দেখো ও জ্ঞানার্জন করো। বাংলাভাষী উপন্যাস তথা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এটি খুবই সুবিধাজনক ও আনন্দদায়ক একটি পড়ার উৎস। তাই এর প্রবর্তক সুব্রতদাকে আমার প্রাণঢালা অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতায় বেঁধে রাখছি এখানে।
ব্যক্তিগতভাবে প্রজ্ঞাবান বাংলা সাহিত্যপ্রেমী, সাপ্তাহিক বাংলামেইল পত্রিকা এবং এনআরবি টেলিভিশনের সাথে যুক্ত সুব্রত কুমার দাসকে টরন্টোতে বসবাসকারী বাঙালি সমাজের মেন্টর বলা যেতে পারে। তিনি কানাডিয়ান সাহিত্য অঙ্গনে নিজেকে যেমন সার্থকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তেমনি পুরো বাঙালি সাহিত্যসমাজকেও আলোকমুখী করার প্রয়াসে সাফল্য অর্জন করেছেন। এই সাহিত্য অগ্রজ আমাদের সবার গর্বের ব্যক্তিত্ব।

সুব্রত কুমার দাসকে আন্তরিক অভিনন্দন। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন