https://www.prothomalony.com/

18091

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য 

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:০১

কবির চল্লিশ পেরোনোর পর

অমিতাভ সরকার 
এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ

পরিশ্রম, চাওয়া-পাওয়া, মন- আবারও তাই

আগে অনেকেই ছিল

এখন গ্রহণ লাগলে হাত ধরার মতোও কেউ নেই 

একটা বয়সের পর আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না 

পুরোনো ব্যথা, প্রেম, ভুল- ভাবতে বিকেল শেষ হয়ে 

সন্ধ্যে নেমে আসে

চুপ থাকা কষ্টকর

আবার চিৎকার করলেও... 

কী কর্তব্য সেটাই যেখানে প্রশ্ন- সেখানে রোগ বাড়বে 

ছাড়া কমবে না। 

শ্রাবণ, তুমি এবং নিঃসীম সৌন্দর্য 

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

তোমাকে এক চোখে দেখি,

আরেক চোখে পাঠ করি

শ্রাবণ দিনের মেঘ...

ঘটা করে মেঘের আয়োজন করবে আকাশ,

আর বৃষ্টির আনন্দ নেবে না মাটি—

এমনটা কি মেনে নেওয়া যায়?

অবশ্য তোমার পছন্দের ফুল কদম,

আর কদম ফুলের পছন্দ বৃষ্টিস্নাত বিকেল;

অথচ কী অদ্ভুতভাবে পাহাড়ি ঢালে ঝরনা নামে,

সমতলে নেচে ওঠে সবুজের হৃৎপিণ্ড!

তোমাকে এক চোখে দেখি,

আরেক চোখে পাঠ করি

শ্রাবণের খোলা বুক—নিঃসীম সৌন্দর্য...

 

নিষিদ্ধ জার্নাল

অলোক আচার্য

আমার বুকের পাঁজর ভেঙে

প্রতিদিন নিষিদ্ধ হয় এক একটি শব্দ,

শহরের উন্মুক্ত বাতাসে ওড়ে দ্বিখণ্ডিত আয়ু।

অলিগলিতে পড়ে থাকে কত শত নিষিদ্ধ যন্ত্রণা,

ময়লার ভাগাড়ে কখনো কখনো পাওয়া যায় 

বেশ্যার শাপ;

কবিতার খাতায় জমা হতে থাকে অসংখ্য দীর্ঘশ্বাস!

ধবধবে সাদা পালকে ঢাকা জ্যোৎস্নারাত—নিষিদ্ধ 

নগরীর জার্নাল,

ঘরপালানো কিশোরের আনাগোনা বাড়ে পার্কের বেঞ্চিতে;

বুকে সব নিষিদ্ধ মুহূর্তের স্মৃতি জমা হয়ে সারিবদ্ধ দাঁড়ায়।

 

সম্পর্ক

অনিক খুরশীদ

চৈত্র এবার কাঠফাটা হলো না,

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো—

কারো কোনো পানির পিপাসা পেল না।

গভীর রাত হলেও তবু আমি অপেক্ষায় থাকি,

কেউ একজন বলুক—আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।

গাঢ় কাজল হয়ে থাকতে পারিনি কারো চোখে,

হতে পারিনি কারো ভালোবাসায় নির্ভরতার হাত।

আমাকে দেখে যে মেয়েটা মুচকি হাসি লুকায়,

সেই আবার ভালোবেসে আমাকে গোপন করে তার হৃদয়ঘরে।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের সুতো জোড়া লাগাতে লাগাতে—

যে মেয়েটা গভীর রাত জেগে থাকে,

আমি হয়তো জড়িয়ে আছি তার ঝাপসা চোখের জলে।

 

ভালোবাসার বংশীনগর

সাজ্জাদুর রহমান 

একটা প্রশ্নবোধক বুড়ো আঙুল

খুব জ্বালাচ্ছে,

ছুরির মতো অদৃশ্য কাটাকুটি চলছে অন্তহীন।

পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ—

প্রতিপক্ষ, প্রতিপক্ষ—ছিঁড়ে দেয় নিস্তব্ধতার সমীকরণ!

জলোচ্ছ্বাসে ছেয়ে যায় শরীরের ঘুপচি গলি,

অন্তহীন ভালোবাসার বংশীনগর।

চাপ চাপ রক্তের ভেতর দলা দলা প্রশ্ন,

উত্তর খুঁজে খুঁজে বিস্ময়চিহ্নে হতবাক!
 

চোখের গভীরতা কত?

হাসান মাহমুদ

দুই চোখে নোনা জলের দুটি সমুদ্র,

অতল জল—ঢেউহীন গহনে;

উথলে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায়,

হাজার বছরের কান্না জমা এখানে।

ভাষাহীন চোখ, তবু কত কথা বলে!

কত না-বলা কথা লুকায় আঁখিতে,

কত জল, কত ছল—

কত কী জমে থাকে চোখের মণিতে!

প্রেয়সীর চোখের গভীরতা মেপে দেখো,

নয়নের কাজলে নামে রাতের অন্ধকার;

চোখের পাতায় এক মায়াবী নেশা,

দৃষ্টির গভীরে সৃষ্টির রহস্য অপার।

কত স্মৃতি—কত কালের সাক্ষী হয়ে,

কত সুখ-দুঃখ নীরবে করে ভিড়;

কত স্বপ্ন হারিয়ে যায়—

এই ছোট্ট কোটর কতটা গভীর?

 

আসমুদ্রহিমাচল

আ ই না ল  হ ক 

যদি দেখি দূরত্ব ভালোবাসা কমিয়েছে, তবে কি ধরে নিতে পারি না—আসলে ভালোই বাসোনি? মানুষ অভিনয়ে সেরা; নানান বাহানায় অজুহাতের লম্বা ফিরিস্তি দাঁড় করায়, ইনিয়ে-বিনিয়ে নিজের পক্ষে মিথ্যের বেসাতি সাজায়।

ভালোবাসাকে সীমানায় আটকে রাখা যায়, বলো? তার স্বতন্ত্র পরিস্ফুটনে উদ্ভাসিত হয় নদী, মাঠ, ফসল, কৃষাণির উঠান; তার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে আসমুদ্রহিমাচল। এমনকি কাঁটাতারের সীমানাপ্রাচীরও সে টপকে যায় অনায়াসে। কেবল তোমার বেলায় যত সীমাবদ্ধতা!
 

তুমি এবং প্রেম 

দীপংকর কুমার চৌধুরী 

তুমি কাটা শশীর কান সেলাই করছ—

রাত্রির মাচানে বসে,

সুদূর মেঘপুঞ্জ থেকে হাতে নামিয়ে।

রাঁধুনির বেশভূষায় সৃষ্টি করছ প্রেম—ভোজনপাত্রে,

রূপবতী স্রষ্টা সৃষ্টি সম্ভার—বেড়ে দাও—পাতে,

চুলার ঠোঁটে ধোঁয়া-ওঠা পাতিল থেকে।

তোমার উঠোনে ফুটন্ত ক্ষুদ্র জ্যোতিষ্ক,

তারাও তাকিয়ে আছে হেঁশেলে—

অভুক্ত সন্তানের জঠরদেশে—বেদনার মতন।

তুমি এবং প্রেম—০১ হেঁশেলে নাগরিক—যাকে খুঁজি শতাব্দী ধরে—ঋতুচক্রের আবর্তনে—ভবের দুয়ারে।।

হরিলুট 

শাহীন সুলতানা 

চারপাশে যেন হরিলুট,

লুট হয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা, মায়ামমতা—

আর মনুষ্যত্বের শেষ পারদটুকুও।

আজকের মানুষ যেন শিকড়হীন গাছ,

অকেজো ব্যারোমিটার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সামনে।

দরজার ওপাশে কেবলই ব্যস্ততার কোলাজ,

মানবিকতার ঝুমঝুমিটা অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি।

অমীমাংসিত অঙ্কের মতো সম্পর্কেরা

চাপা পড়ে যায় মিনিটে মিনিটে।

অন্যায় দেখেও মানুষ নির্বিকার—

অনুভূতিহীন কোনো দর্শক যেন;

বিবেক বিলীন হতে হতে কখন যে হয়ে উঠছি 

ঝরে পড়া শুকনো বাঁশপাতা!

 

মাতুলালয়

বশির আহমেদ 

মায়ের হাত ধরে মাতুলালয়ে যেতাম,

নানা-নানি খুব যত্ন করতেন।

বৈশাখী আম, কাঁঠাল আর নারকেলের আবরণ সরিয়ে

বাটিভর্তি দুধের সাথে মিশিয়ে দিতেন নরম শাঁস—

আমি যেন ছিলাম একচিলতে সুখ!

পিতৃগৃহে ফেরার সময় হলে,

মা দাঁড়িয়ে যেতেন বেলী খালার কবরে;

একটি ফুলগাছ দিনরাত, ছায়া হয়ে থাকে।

মায়ের চোখে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বর্ষা।

কিছু মরসুমী শস্য মায়ের হাতে তুলে দেয়,

নানি দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না তাঁর চোখ থেকে

মুছে যায় আমাদের ছায়া।
 

গন্তব্য   

মোঃ রহমত আলী   

পথ বন্ধ হলে নতুন রাস্তা খুলে যায়,

রাস্তা ভুলে গেলে চেনা চোখ খুলে যায়,

চোখ বন্ধ করে চাইলে গন্তব্য দেখা যায়।

ঝড় উঠলে বহু শুকনো পাতা ঝরে যায়,

আশ্রয় ভেবে রাখা আশ্রম ভেঙে যায়,

তুফান থেমে গেলে আসল দরদি চেনা যায়।

সূর্য ডুবে গেলে নিজের ছায়াও হারিয়ে যায়,

আলো খুঁজে পেলে কালবৈশাখী মেঘ কেটে যায়,

সময়ের হাওয়ায় জীবনের দিশাও বদলে যায়।

মুখ খুললে মানুষের মুখোশ খুলে যায়,

চুপ করে থাকলে ভেতরের রূপ দেখা যায়,

মুখ চিনে নিলে তবেই চলার পথ সহজ হয়ে যায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন