https://www.prothomalony.com/

18103

literature

সাহিত্য

উঠোন ভরা রোদ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:১৬

পরপর দুদিন ঝুম বৃষ্টির পরে, মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঝকঝকে জোছনার আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল সোহাগীর, রাত কত হলো, জানা নেই। বাচ্চা মেয়ে দুটো আধপেটা খেয়ে বিভোরে ঘুমোচ্ছে। দরজা খুলে বাইরে আসতেই চোখ পড়ল, বারান্দায় শুয়ে থাকা অভুক্ত কুকুরটার দিকে, ও ভেবেছে হয়তো ওর জন্য খাবার নিয়ে আসছে।

সোহাগী কুকুরটাকে বলল: কী রে, তুইও ঘুমাস নাই! খালি পেটে ঘুম আসে না, তাই না? আমিও তোর মতোই, কিছুই খাই নাই। যা, শুয়ে থাক...

কুকুরটা হয়তো বুঝতে পারল, লেজ নাড়াতে নাড়াতে আর শুকনো জিভ বের করে চুকচুক করে নিজের গাল চেটে আবার শুয়ে পড়ল।

শুধু আজ নয়, মাঝেমধ্যেই মাঝরাতে সোহাগীর ঘুম ভেঙে যায়, আর এই মাটির বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলে, নিজেই প্রশ্ন করে আবার নিজেই তার উত্তর সাজায়, কিন্তু কিছুতেই সমাধান মিলতে চায় না। বুক ভেঙে অঝোরে কাঁদে। আকাশ-বাতাস, চাঁদ-তারা আর এই কুকুরটা ওর ব্যথার সঙ্গী হয়, কিন্তু কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে না। সোহাগী নিজের আঁচল দিয়ে চোখ-মুখ মুছে আবার ঘরে গিয়ে মেয়ে দুটোকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে। সে তো একা নয়, এই দুটো অবুঝ বাচ্চার কথা ভেবে তো সোহাগীকে শক্ত থাকতে হয়।

তবুও রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ, মাঝে মাঝে নিজেকে প্রবোধ দিতে পারে না, মনে হয় বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে এক্ষুনি। বোবা চিৎকারে কষ্টেরা ঝরে পড়ে—

: কী দোষ করছিলাম আমি! আমি তো তোমারে ভালোবাইসা আজীবনের তরে নিজেরে সঁপে দিছিলাম তোমার কাছে। কত স্বপ্ন নিয়া সোনার সংসার বাঁধছিলাম, সন্তানের জন্ম দিছিলাম। তুমিও তো আমারে কত ভালোবাসতে বারেক আলী, অথচ নিজের ঘর নিজেই এইভাবে ভাঙলে!

আমি তো ভালোবাসার লাটাই হাতে রাইখা, বিশ্বাসের সুতা দিয়া ঘুড়ির মতো তোমারে ছাইড়া দিছিলাম ঐ সুদূর আকাশে, আর তুমি কোন দিন আমার সেই বিশ্বাসের সুতা অবিশ্বাসের কাঁচি দিয়া কাইটা ফেলাইলা, আমি বুঝবারও পারলাম না।

আগে যদি জানতাম বারেক আলী, তুমি আমারে এতো পর কইরা দিবা, তাইলে আমি তোমারে নিয়া সুখের ঘর বাঁধতাম না। বাপ-মায়ের একমাত্র মাইয়া আমি, গরিব হইলেও তো কত আদরের ছিলাম, সেই আদরেই থাকতাম সারাজীবন।

আজ বাপ-মা কেউই নাই, আছে খালি তাদের রাইখা যাওয়া এই বাড়িডা, আর শক্তপোক্ত এই ঘরডা। তা না হইলে, তুমি ছাইড়া দেওয়ার পর তোমার মাইয়া দুইডারে নিয়া কোন সাঁতারে পইড়া যাইতাম, কোন জায়গায় গিয়া মাথা গুঁজতাম!

আমি তো সারাজীবন শুধু তোমার ভালো চাইছি। তুমি বেদানারে নিয়া ভালো থাইকো, সুখে থাইকো।

ফজরের নামাজ পড়ে, বিছানায় বসে তসবি গুনতে গুনতে চোখ লেগে গিয়েছিল। বাইরে মর্জিনার মায়ের ডাক শোনা গেল। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে বাইরে এলো সোহাগী। মর্জিনার মায়ের বাজখাঁই কণ্ঠস্বর আর সারাক্ষণ মুখভর্তি পান খেয়ে, তামাকপাতা-জর্দা দাঁতে ঘষতে ঘষতে কথা বলার ধরনে অনেকেই মনে করবে, উনি বড়ই জল্লাদ টাইপের মহিলা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে, উনার মনটা খুব নরম এবং মানুষটা খুব ভালো। সে হলো মাটি কাটা মহিলা দলের সর্দারনি।

ঘরে অসুস্থ স্বামী, আর সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য তাকে বাইরে কাজে নামতে হয়েছে। প্রথম প্রথম তারও খুব খারাপ লাগত, মানুষ অন্য নজরে তাকাত। পরিস্থিতি মানুষকে বদলে যেতে বাধ্য করে। পৃথিবীটা হলো “শক্তের ভক্ত, নরমের যম”—তাই ওভাবে কথা বলাটাও উনার অভ্যেস হয়ে গেছে, তা না হলে তো আর মানুষ খাটানো যায় না, নিজেও চলা যায় না।

সোহাগীকেও সে শক্ত হতে শিখিয়েছে, আপদে-বিপদে পাশে থাকে। এত বড় বিপদে সে যদি সোহাগীকে মাটি কাটার কাজ না দিত, তাহলে তো এই তিনটে প্রাণী না খেয়ে বেঘোরে মারা পড়ত।

মর্জিনার মায়ের হাতে বেশ বড় এক বাটি গরম খিচুড়ি। সে বাটিটা সোহাগীর হাতে দিয়ে, নিজের হাতের তালু থেকে আরেক হাতের আঙুল দিয়ে তামাকপাতার গুঁড়ো দাঁতে ঘষতে ঘষতে বলল: ম্যানেজার আইছিলো, বৃষ্টির জন্যি মাটি ভিজা আর নরম আছে। আজ আর মাটি কাটা যাবিন্না। কাল যাওয়া লাগবি (পিক ফেলে)—এ সাপ্তার বিলডাও কালই দিবিনি।

সোহাগী শুধু 'আচ্ছা' বলে ঘাড় নাড়ল।

মেয়ে দুটোকে নিয়ে খিচুড়ি খেল। বাটির মধ্যে একমুঠো রেখে বেশি করে পানি ঢেলে, কুকুরের সামনে গামলায় ঢেলে দিল। প্রভুভক্ত কুকুরটা এতেই খুব খুশি, খপর খপর করে খেতে লাগল।

ওপাড়ার হামেলা রাস্তা থেকে চেঁচিয়ে সোহাগীকে ডেকে বলল: ঐ সোহাগী, সাধু খাঁ তোরে দেহা করবির কইছে...!

বড় বাড়ি, পাকা দালান ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সোহাগী ডাকল: চাচী—ও চাচী, বাড়িতে আছেন—!

গলা খাঁকারি দিতে দিতে ভেতর থেকে সাধু খাঁ বের হলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল: তোমার চাচী তো বাপের বাড়িতে গেছে, ভিতরে আইসো—বসো—

সোহাগী: (চারদিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত বোধে আমতা আমতা করে) না চাচা, ঐ হামেলা কইল আপনে আমারে দেহা করবির কইছেন—তাই—।

সাধু খাঁ তার চশমা মুছে ঠিক করে চোখে দিল। সোহাগীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালে, সোহাগী দু-পা পিছিয়ে দাঁড়াল।

সাধু খাঁ: হুম, তোমার সাথে মেলাদিন দেহা-সাক্ষাৎ অয় না, তাই ডাকছিলাম। তা কিরহম ভাবে চলতিছেও—তাই—

সোহাগী একটু ভ্রু কুঁচকে আসল ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল, তবু বলল: কিরহম আর—আল্লায় যেমন চালায়, তেমনই চলি—

সাধু খাঁ: হ—কী আর করবে, তোমার কষ্টের কথা কানে আসে, শুনে বড়ই খারাপ লাগল—শুনলাম মাটি কাটার কাম নিছো—?

সোহাগী: হ চাচা, কী আর করব, তিনডি প্যাটের কথা চিন্তা করা তো লাগবি। তা চাচা, হঠাৎ আমার জন্যি আপনের খারাপ লাগবি ক্যা? বিচার-সালিশ বসায়া আপনেরা সমাজপতিরাই তো আমারে ঘরছাড়া করছেন, এহন এই কথা কন কেমনে?

সাধু খাঁ: এরহম করি কইয়ো না সোহাগী, তোমার স্বামীডা যদি খারাপ না অইতো, তাইলে কি—আর—

সোহাগী: (তাকে থামিয়ে দিয়ে) থাক চাচা, সে আমার মাইয়াগো বাপ হইলেও, আমার কাছে একজন পরপুরুষ, তার সম্বন্ধে কিচ্ছু শোনার দরকার আমার নাই। জানেন চাচা, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় বাংলা বইয়ে একটা গল্প পড়ছিলাম। গল্পডার নাম ছিল “উল্টো রাজার দেশে”। সেইখানে ছিল, চোর চুরি করতে যাইয়া গেরস্তর হাতে ধরা পড়ল, অথচ পরে যহন বিচার অইলো, দোষী অইলো গেরস্ত। কেননা—গেরস্ত এতো মজবুত কইরা ঘর বানাইছে, যে চোর বেড়া কাটতে যাইয়া ধরা খাইছে।

তো চাচা, আমার বেলায়ও তো আপনেরা ঐরহম বিচার করলেন। বারেক আলী আমার স্বামী, সে আর বেদানা অবৈধ সম্পর্কে জড়াইলো। যহন সমাজের মানুষের কাছে ধরা পড়ল, তহন আপনেরা বিচার কইরা ঠিক করলেন, বারেক আলীর সাথে বেদানার বিয়া দেওয়া লাগবি। বারেক আলী রাজি অইলো, কিন্তু বেদানা কইল সে সতীনের ঘর করবিনি।

তহন আপনেরা ধরলেন আমারে। সব দোষ আমার, কারণ আমি কেমন মাইয়া মানুষ যে নিজের রূপ-যৌবন দিয়া স্বামীরে ধইরা রাখতে পারি নাই!

(জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে) হায়রে সমাজের নিয়ম! যারা ব্যভিচার করল তাগো কোনো শাস্তি অইলো না, আর আমি নির্দোষ অইয়াও দুইটা বাচ্চাসহ আমার সাজানো সংসার ছাড়তে অইলো... তা চাচা, আপনে আমারে কী জন্যি ডাকছেন—তাতো কইলেন না!

সাধু খাঁ চারদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। তারপর এগিয়ে এসে সোহাগীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, হাতটা পিঠের ওপর দিয়ে নামিয়ে নেওয়ার সময় ওর পেটেও ছোঁয়া দিয়ে দিল। সোহাগীর কাছে খুব বিশ্রী লাগল। মিচকা শয়তানের মতো মুখে দরদ দিয়ে বলল: কী আর করবা, কও! কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। কয়দিন অইলো তোমার চাচী বাড়িতে নাই, তোমার মাইয়াগোর জন্যি পাঁচশ টাকা দিতে চাইছিলাম (পকেট দেখে)—তা এহন তো নাই, তুমি রাইতে একটু আইসো...

সোহাগী সবই বুঝল। সামনে মাটির রান্নাঘর, চুলার পাশে গিয়ে পিঁড়ি টেনে বসে বটিটা দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে খিলখিল করে হাসল। তারপর স্বাভাবিকভাবেই বলল: হ চাচা, বুঝছি। তয় কয়ডা কথা কই। আপনে হইলেন বারেক আলীর আপন চাচা। দুই কলম লেখাপড়া শিইখা, ভাইবোনগোরে ফাঁকি দিয়া সব সম্পত্তি নিজের নামে লেইখা নিয়া আপনে অইছেন বড়লোক, আর সগলেই গরিব। আমি এই বাড়িতে ছয়ডা বছর সংসার করছি। আপনের কীর্তিকাহিনী আমার এই দুই কানে কত কী শুনছি, আর দুই চক্ষে কত কী দেখছি! কানের মধ্যে, চোখের মধ্যে সব হজম কইরা দিছি, কোনোদিন কারো কাছে কিচ্ছু কই নাই। আপনেগোর বিচার-আচার সবকিছুই মাইনা নিয়া সংসার ছাড়ছি। তিনডা প্যাটের খাওয়ার জোগাড় করতে দিনরাত খাটি, মাটি কাটার কাম করি। আপনেরা কত টাকা-পয়সা জাকাত-ফিতরা দ্যান, কোনোদিন আমার খোঁজও নেন না।

মাইয়া অইলেও আমার মাইয়ারা আপনের বংশের রক্ত। আপনে চাইলে এমনিই তাগো হাতে পাঁচশ টাকা দিবার পারেন, অথচ তা না দিয়া আমারে রাইতে আসবের কন! (রেগে ফুঁসে বটিটা হাতে নিয়ে উঠে এসে) বাহ্ রে চাচা, বাহ্! লজ্জা করে না আপনের! আরে—একটা জানোয়ারও তো মা-বোন বাছবিচার করে, আপনে দেহি তার চাইতেও খারাপ!

সাধু খাঁ চোখ রাঙিয়ে সোহাগীকে চড় দিতে এলে, সোহাগী বটি উঁচিয়ে ধরল: খবরদার! একটু আগে বারেক আলীর কথা কইতেছিলেন না? মানুষের কিছু কিছু স্বভাব বংশগতও অয়।

সাধু খাঁ ফুঁসে উঠে বলল: বেশি বাড়াবাড়ি কইরো না সোহাগী! একলা ঘরে থাহো না? ঘরে লোক ঢুকায়া দিয়া কলঙ্ক রটায় দিব, তহন দেইখো... আর মাটি কাটার কাম কীভাবে করো, সেইডাও আমি দেখব।

সোহাগীও চাপা স্বরে শাসাল: ঐ হারামীর বাচ্চা, আমরা এই একই পাড়ায় বাস করি। কিডা ভালো, কিডা মন্দ—এই কথা সগলেই জানে। আমিও মানুষ চিনি। আমার চক্ষে এই সমাজের পেত্তেক দশ জনের মধ্যি তোর মতো শকুন যদি দুইডা থাহে, তো আর আটজনই ভালো মানুষ আছে। আমার বাপ ছিল একজন ঘরামি, ঘর-বেড়া ঠিক করার কাম করত। তার রাইখা যাওয়া ধারালো দাওডা বালিশের নিচে রাইখাই ঘুমাই। আমার ঘরে লোক ঢুকায়া দেহিস, এক কোপে ঘাড় থেইকা মাথা আলাদা কইরা ফেলব! এই দুনিয়াতে সগলেই বেদানা না, আর তোর মতো জানোয়ারও না। মানুষের মতো মানুষ আছে, ভালো মানুষ আছে...

 

বটিটা ছুড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে, এদিকে ঘুরতেই দেখে, ও ঘরের জানালা দিয়ে বেদানা তাকিয়ে আছে। সোহাগীর সমস্ত শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠল। উল্টো পাশে খক করে থুতু ফেলে, চেঁচাতে চেঁচাতে রাস্তায় চলে এলো।

ও বাড়ির সমীর চাচা মাথার টুপি ঠিক করতে করতে বাইরে এসে বলল: কী অইছে রে মা সোহাগী, এতো চেঁচাও ক্যা?

সোহাগী: আমি চেঁচাই না চাচা, আমার তিনডা ক্ষুধার্ত প্যাট চেঁচায়, আমার মনের খেদ চেঁচায়। আমি কাম কইরা ভাত খাই, কাম না থাকলে না খাইয়া থাহি, তাও বদমাইশি আমার রক্তে নাই চাচা। (পাশ দিয়ে সাধু খাঁ চলে যাচ্ছে, আঁচল দিয়ে চোখ মুছে) শোনেন চাচা, আব্বা একটা কথা কইত, “এই সমাজে এক কান কাটা যার, সে কান ঢাইকা চলার জন্যি লম্বা চুল রাহে, আর যার দুই কান কাটা, সে ন্যাড়া মাথায় বুক ফুলায়া চলে।”

সমীর চাচা বুঝলেন: হ—রে মা, সবই তো বুঝি, কিছু কওয়ার নাই। ঐ যে লোকে কয়, “কথা কইবির বলে পারি, মুখ থুয়ে আইছি বাড়ি।”

সোহাগী: হ চাচা, মুখ বাড়ি থুয়ে আসাই ভালো, নইলে মুখ পচে যায়। যান চাচা, আপনে মসজিদে যান।

সন্ধ্যায় আবার বৃষ্টি শুরু হলো। এশার আজান শোনা যাচ্ছে, এমন সময় ঘরের বাইরে সমীর চাচার গলা শোনা গেল। সোহাগী তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে বলল: আরে চাচা, এই বৃষ্টির মধ্যে আপনে—?

সমীর চাচা তার গামছাটা সোহাগীর হাতে দিল। গামছার আঁচলে কিছু চাল বাঁধা।

সোহাগী কৃতজ্ঞতার চোখে বলল: চাচা, আপনেরাও গরিব মানুষ। এই চাল ঘরে থাকলে চাচী আরো একদিন চলবির পারত...

সমীর চাচা: চুপ কর তো মা, তোর চাচীই তো আমারে পাঠাইল। গরিবই তো গরিবের দরদ বোঝে...

কুলের মাঠে বিরাট শামিয়ানা টানানো, স্টেজ বানানো হয়েছে। এত এত লোকের ভিড়। সোহাগী ভালো বোঝে না, তাকে নতুন শাড়ি পরিয়ে বড় বড় লোকেরা সম্মাননা জানাল, রত্নগর্ভা পুরস্কার দিল। আজ সোহাগীর চোখে আনন্দাশ্রু। পরপর দুবছরে তার দুটো মেয়েই পরীক্ষা দিয়ে পাস করে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়েছে।

সোহাগী হাসিভরা মুখে দুঃখের দিনে পাশে থাকা সমীর চাচাকে বলেছিল: ও চাচা, সরকারি চাকরি হতি নাকি মেলা টাকা-পয়সা ঘুষ দেওয়া লাগে, তা আমি তো কারো এক কাপ চাও খাওয়ালাম না।

সমীর চাচা ফোকলা দাঁতে হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া করে বলেছিল: মারে, আল্লাহ তোর ধৈর্য আর কষ্টের ফল নিজেই দেছে।

সোহাগীর গোয়ালে এখন পাঁচটা গরু। একটা দুধেল গাই গরু। আর মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার জন্য একটা ষাঁড় গরু আলাদা রেখেছিল, কিন্তু মেয়েদের বিয়েতে কোনো যৌতুক লাগল না বলে ষাঁড়টা জবাই করে সাধ্যমতো অনুষ্ঠান করল। আজ তার মনের সমস্ত আশা পূর্ণ হয়েছে, তার সারাজীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

মর্জিনার মা এসে বলল: মেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠানে নাকি বারেক আলীও এসেছিল। সবার চোখের অলক্ষ্যে এক কোণায় বসে কটা ডাল-ভাত খেয়ে মুখ লুকিয়ে চলে গেছে। দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিদায় দেখেছে, আর কেঁদেছে।

সোহাগী সেসব কথায় কান দিল না।

আজও মাঝরাতে সোহাগীর ঘুম ভেঙে যায়। তবে আজ আর সে জোছনা রাতে আঁধার দেখতে পায় না, আজ সোহাগী চারদিকে তাকিয়ে আঁধার রাতেও দিনের মতো উঠোনভরা রোদ দেখতে পায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন