https://www.prothomalony.com/

18123

north-america

উত্তর আমেরিকা

ট্রাম্প প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের হাতে পাঁচ হাজার ডলার করে তুলে দেবেন,যদি....

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৩০

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়নি। বুধবার রাতে টেক্সাসের ডালাস শহরে রিপাবলিকান দলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো একটি পূর্ণাঙ্গ মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলন। সেই মঞ্চেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক প্রতিশ্রুতি দিলেন, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আমেরিকান এয়ারলাইন্স সেন্টারে, যেখানে সাধারণত এনবিএ দল ডালাস ম্যাভেরিক্সের খেলা বসে, সেখানে একুশ হাজার দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টা সাতচল্লিশ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে ট্রাম্প বললেন, রিপাবলিকানরা যদি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তিনি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের হাতে পাঁচ হাজার ডলার করে তুলে দেবেন।

নিজের এই প্রস্তাবকে তিনি তুলনা করলেন একটি লাভজনক কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের সঙ্গে। অর্থনীতির “অভাবনীয় সাফল্যের” দোহাই দিয়ে তিনি বললেন, এই অর্থ হবে আমেরিকান জনগণের প্রাপ্য এক ধরনের লভ্যাংশ। প্রশ্ন হলো, চল্লিশ ট্রিলিয়ন ডলারের যে জাতীয় ঋণের বোঝা ইতিমধ্যে আমেরিকার কাঁধে চেপে বসেছে, তার সঙ্গে আরও এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি যোগ করে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে বিতর্কের মীমাংসা এখনও হয়নি। ইতিহাস অবশ্য সাক্ষী, এর আগেও ট্রাম্প যখন করোনাকালীন প্রণোদনা হিসেবে দুই হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন তৎকালীন সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেল মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় তা কমিয়ে ছয়শ ডলারে নামিয়ে এনেছিলেন। পরে জো বাইডেনের আমলে বাড়তি চোদ্দশ ডলার যুক্ত হলে সমালোচকরা তাকেই দুষেছিলেন সেই মুদ্রাস্ফীতির জন্য। যা ২০২২ সালের জুনে বার্ষিক হিসেবে ৯ দশমিক ১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। শুল্ক আয় ও সরকারি ব্যয় সংকোচন থেকে অর্থ জোগাড় করে লভ্যাংশ দেওয়ার এমন প্রতিশ্রুতি অতীতেও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তার বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।

ভাষণে ট্রাম্প নিজেকে যেন ভোটের মাঠে না থেকেও ভোটের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড় করালেন। তিনি শ্রোতাদের অনুরোধ করলেন, তারা যেন কল্পনা করেন যে তিনিই এবারের ব্যালটে আছেন, যাতে তার “অসমাপ্ত কাজ” শেষ করার সুযোগ মেলে। উগ্র বামপন্থী সাম্যবাদ আর তার জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা টেনে দিলেন তিনি। সীমান্ত নিরাপত্তা, কর ছাড়, সুরক্ষা আর সমৃদ্ধি, এসবই হারানোর ভয় দেখিয়ে তিনি বললেন, রিপাবলিকানরা হারলে দেশ পরের এক দশক কেবল আবার পায়ের তলায় মাটি খুঁজতেই ব্যয় করবে।

ইরান যুদ্ধ নিয়েও কথা বললেন প্রেসিডেন্ট। মুদ্রাস্ফীতি আর জ্বালানি তেলের চড়া দামের জন্য এই দীর্ঘায়িত সংঘাতকে দায়ী করে তিনি অভিযোগ করলেন, তেহরান আসলে চায় রিপাবলিকানরা হেরে যাক। যাতে দুর্বল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে দর কষাকষি করে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাওয়া সহজ হয়। নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং তেলের দাম হুড়মুড়িয়ে নামবে। এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করলেন তিনি, যদিও এমন প্রতিশ্রুতি অতীতেও একাধিকবার শোনা গেছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি আক্রমণেও ছাড় দেননি ট্রাম্প। টেক্সাসের জেমস তালারিকো, মিশিগানের আবদুল এল-সাইয়্যেদ এবং নর্থ ক্যারোলাইনার রয় কুপার, নাম ধরে ধরে তাদের সমালোচনা করলেন। কুপারকে তুলনা করলেন আশির দশকের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মাইকেল ডুকাকিসের সঙ্গে। অভিযোগ করলেন যে তার আমলে এক অভ্যাসগত অপরাধীকে মুক্ত রাখার কারণেই গণপরিবহনে ইরিনা জারুৎস্কা নামের এক নারী খুন হয়েছিলেন। তালারিকোর নিরামিষভোজন প্রচার শিবিরের নাম নিয়ে হাস্যরস করতেও ছাড়লেন না তিনি। আর এল-সাইয়্যেদের বিরুদ্ধে তার পারিবারিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে বেশ কড়া ভাষায় অভিযোগ ছুড়লেন, যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই হয়নি।

সম্মেলনের সবচেয়ে চমকপ্রদ মুহূর্তগুলোর একটি এলো পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যানের এক ভিডিও বার্তা থেকে। ডেমোক্র্যাট এই সেনেটর সমাজতন্ত্র আর “আমেরিকাবিরোধী জীবনধারার” বিরুদ্ধে কথা বলে সহকর্মী রিপাবলিকান সিনেটর ডেভ ম্যাককরমিকের প্রশংসা করলেন, যা নিয়ে জল্পনা আরও উস্কে দিল যে তিনি দল বদলের পথে হাঁটছেন কিনা। এর পাশাপাশি বিশাল পর্দায় দেখানো হলো ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্যকারী হাসান পিকারের অন্তর্বাসে তোলা এক সেলফি, যা নিয়ে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে। ছবির স্পর্শকাতর অংশ ঝাপসা করে দেখানো হলেও তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সম্মেলনের প্রথম দিকে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও নবজাতকদের জন্য “ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট” প্রকল্প নিয়ে। মেডিকেয়ার ও মেডিকেড বিভাগের প্রধান ডক্টর মেহমেত ওজ কথা বলেন ওষুধের দাম কমানোর প্রচেষ্টা নিয়ে, আর ওজন কমানোর ওষুধের সম্প্রসারিত কাভারেজের প্রসঙ্গে রসিকতা করে বললেন উপস্থিতদের শারীরিক গড়নের কথা। সম্মেলনে উঠে এলেন নতুন প্রজন্মের কিছু রিপাবলিকান মুখও, টেক্সাসের দে লা ক্রুজ ভাইবোন থেকে শুরু করে সাবেক এনএফএল খেলোয়াড় জে ফিলি এবং মিশিগানের সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাইক বুশার। ইউএফসি যোদ্ধা জাস্টিন গেথিয়ে ও বো নিকালের উপস্থিতিও রাজনৈতিক সম্মেলনকে অনেকটা বিনোদনমুখী চেহারা দিয়েছে, যা আধুনিক আমেরিকান রাজনীতির এক বৈশিষ্ট্যই বটে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সম্মেলনের রাতেই যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চলছিল নতুন এনএফএল মৌসুমের উদ্বোধনী ম্যাচ। নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস বনাম সিয়াটল সিহকস, সুপার বোলের পুনরাবৃত্তি হিসেবে যা ছিল সবার নজরে। রাজনীতি আর ক্রীড়া, দুই আয়োজনই যেন একে অপরের দর্শক কাড়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল সেই রাতে।

আগামী তিন নভেম্বরের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তার প্রথম মেয়াদে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে একচল্লিশটি আসন হারিয়েছিল। সেই স্মৃতি এড়াতেই মাত্র দুই মাস আগে এই ব্যতিক্রমী সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে জানিয়ে রেখেছে, ক্ষমতায় ফিরলে তারা ট্রাম্পের কর্মসূচি রুখে দেবে। এমনকি অভিশংসনের পথেও হাঁটতে পারে। হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে সমর্থনে যে ভাঙন দেখা দিচ্ছে বলে জরিপ বলছে, তা সামলাতেই এবার রিপাবলিকানদের এই বাড়তি তৎপরতা। পাঁচ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে অভিবাসন নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান পর্যন্ত।

 ডালাসের এই রাত ছিল আমেরিকান রাজনীতির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। প্রতিশ্রুতি আর প্রচার, রসিকতা আর আক্রমণ, বিনোদন আর উদ্বেগ, সব একসঙ্গে মিলেমিশে। পাঁচ হাজার ডলারের সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা নির্ভর করছে নভেম্বরের ব্যালট বাক্সের ফলাফলের ওপর। ততদিন পর্যন্ত এটি থেকে যাচ্ছে নিছক এক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন