https://www.prothomalony.com/

6846

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৩ ১১:০৩

প্রাক্তন পৌষ 

মুহম্মদ আল-আমীন 


১. 

ইংরেজি দিনপঞ্জিতে ২০০৭ সাল। রোবায়েত সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। দু'টি প্রকাণ্ড নারকেল গাছ সগৌরবে বেণী করা চঞ্চলা মেয়ের মতন মাথা দোলায়। এরই নিচে আয়তাকার শ্রেণীকক্ষ। ষষ্ঠের পড়ে সপ্তম, সপ্তম পেরিয়ে অষ্টম। তারপর প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। এরপর কার কক্ষ, সে কথা আপাতত অমূলক। 

পৌষের ঠোঁট-ফাটা সকালে সবার আগে শ্রেণীকক্ষে হাজির রোবায়েত। মায়ের হাতে বানানো ভাপা পিঠা খেয়ে এসেছে সে। তাই খানিকটা খোশমেজাজে রোবায়েত। ইংরেজির মাস্টার সাহেব রোল কল করে একে একে পড়া ধরছেন। পড়ার টপিকস- Aim in life, মানে জীবনের লক্ষ্য। যে যার মতন বলছে- ডাক্তার, ব্যাংকার, পুলিশ, শিক্ষক। 

রোবায়েতের সিরিয়াল এখনও বাকি। এরই মাঝে কি মনে করে সে মাস্টার সাহেবের দিকে একটু তাকিয়েছে। অমনি তিনি রোবায়েতের মাথার চুল বামহাতের তালুতে ধরে ডানহাতের লাঠি দিয়ে পুরো শরীরে মিনিট খানেক পেটালেন। পুরো কক্ষ স্তব্ধ। কয়েক জোড়া ভয়ার্ত চোখ চেয়ে আছে রোবায়েত এবং মাস্টারের দিকে। রোবায়েত নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েও পারেনি। শুধু বোকার মতন কাঁদতে পেরেছিল।

মাস্টার সাহেব কিসের রাগটা রোবায়েতের ওপর দেখিয়েছিল, সেটার উত্তর খুঁজে পায় না সে। 

বউয়ের সাথে ঝগড়া করে মন-মতি খারাপ নাকি রোবায়েত বাদে শ্রেণীকক্ষের বাকি বন্ধুরা মহামান্য সেই মাস্টার সাহেবের কাছে প্রাইভেট পড়তো; সেটাই রোবায়েতের অপরাধ? 


২.

ঋতুচক্রে তখন শীতকাল। 

রোবায়েত দশম শ্রেণীর ছাত্র। কয়েকদিন বাদে নির্বাচনী পরীক্ষা। তার মানে পিটি'তে দাঁড়ানো রোবায়েতের জন্য জরুরি নয়। পরীক্ষার ফি জমা করতে অফিসকক্ষের দিকে যাচ্ছিল সে। সেই সময় গণিতের মাস্টার সাহেব স্কুলের মাঠে পিটি'র উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যাদের গায়ে স্কুল ড্রেস নাই, তাদের বেদম পেটাচ্ছেন। সৌভাগ্যবসত রোবায়েত সেদিন স্কুল-ড্রেস পরে আসেনি। ব্যস! গাণিতিক হিসেবে তিনটা লাঠির বাড়ি বসলো রোবায়েতের পিঠে। 


৩.

পৌষের সন্ধ্যায় অফিস শেষে সোডিয়াম বাতির মোলায়েম আলো গায়ে মেখে মেসে ফেরার পথ খোঁজে উন্নয়নকর্মী রোবায়েত। প্রায় একযুগ বাদে আজ হঠাৎ সেই তিক্ত অতীত হানা দিচ্ছে তার মনে। 'অনিয়ম'কে 'নিয়ম' জ্ঞান করা সেই মাস্টার সাহেবরা এখন কেমন আছেন? বেঁচে আছেন?

 

 

টুনির নীল জামদানি 

সোহানা নাজনীন


দুপুর থেকেই অস্থির চেহারা নিয়ে টুনি একটু পর পর বারান্দায় নামছে। গ্রিলের বাইরে হাতের তালু মেলে ধরে হতাশ চেহারায় আবার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। এর কোন মানে হয়! সেই সকাল থেকে বৃষ্টি, থামার নাম গন্ধ নেই। আজও সূর্য ওঠেনি, ধূসর আকাশ ছেয়ে আছে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে। বারোটার দিকে বৃষ্টি একটু কমেছিল কিছুক্ষণের জন্য, কিন্তু আবারো সেই ছ্যাঁচড়া তালে পড়তে শুরু করেছে। মুখটা আমের আটির মতো লম্বা করে টুনি মায়ের কাছে গেল। জিজ্ঞাসা করলো, 'মা, আজ কি তাহলে বড় ফুপুর বাসায় যাওয়া হবে না?' 

অন্য সময় হলে টুনির এই আহাম্মকি প্রশ্নে মা খ্যাক করে উঠতেন। কিন্তু আজ তা করলেন না, দপ করে জ্বলে ওঠা রাগটাকে বাগিয়ে ধরলেন। পাঁচদিন আগেই মেয়েটার পানচিনি হয়ে গেছে, আর কয়দিন পর বিয়ে। মেয়েটা চলে যাবে পরের বাড়ি, তাই খামোখা বকা-ঝকা বন্ধ। মা রয়ে সয়ে  বললেন, 'দেখছোই তো, সারাদিন থেকে একবারের জন্যও বৃষ্টি বন্ধ হয়নি, এরকম চলতে থাকলে হয়তো আজ যাওয়া হবে না।'

উত্তর শুনে প্রায় আঁতকে উঠলো টুনি। জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, 'একটু আগে কিন্তু থেমেছিল, বোধহয় বিকালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন কি আমরা বের হতে পারবো মা?' 

মা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে অন্যদিকে তাকালেন। এই বাইশ বছরের মেয়েকে কে বোঝাবে? যা একবার মাথায় ঢোকে তা আর বের হয় না। জুন মাসের টানা বৃষ্টি, দুদিন ধরে বাইরে যাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে মেয়ের বায়না বড়ফুপুকে দেখতে যাবে। আসলে ওসব কিছু না! নতুন শাড়ি পেয়েছে, আঙ্গুলে নতুন আংটি, তাই মনটা একটু ছটফট করছে। 

ছেলের বাড়ি থেকে আংটি পরিয়ে যাবার পর হঠাৎ করেই টুনির আচরণ বদলে গেছে। কেমন যেন উড়ু উড়ু ভাব, লম্বা দুই বেণী দোলানো, চোখে ভারী কাচের চশমার সেই টুনি আর নেই। শুধু বিয়েটাই বাকি, এরপর বড়দের গ্রুপে ঢোকার অনুমতি পেয়ে যাবে টুনি। কথা আর না বাড়িয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে টুনির মা নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। টুনি উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হেঁটে বেড়ালো। পড়া বইয়ের কিছু পাতা উল্টালো অলসভাবে। আকাশের আঁশটে মেঘের মতোই তার মুখের রং পাল্টে গেছে ইতোমধ্যে। 

দুপুরে ভাত খাবার পর বৃষ্টির ছন্দে একটুখানি চোখ লেগে এসেছিল টুনির মা'র। খসখস শব্দে সেই ঘুম ছুটে গেল, উনি তাকিয়ে দেখলেন টুনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছে। পরনে পানচিনির নীল জামদানি, তার উপরে সবুজ আর সোনালি জরির কল্কে করা ডিজাইন। কোন রকম জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই মেয়েটা শাড়ি পরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি। তারমানে আজ টুনিকে ঠেকানো যাবে না কোনভাবেই। আজ সে বাইরে যাবেই যাবে, টিপ টিপ করে সারাদিন বৃষ্টি পড়লেও যাবে। 

টুনি তার মায়ের সাথে যখন গলির মোড়ে দাঁড়ালো, আশ্চর্যজনক ভাবে তখন বৃষ্টি উধাও। গাব গাছের কচি লাল পাতা চুইয়ে পানি পড়ছে, সাবধানে জামদানি শাড়ির কুঁচি সামলে নিয়ে রিকশায় উঠলো টুনি। অনভ্যাসের কারণে বার বার কাঁধের কাছে হাত রেখে আঁচলটা ঠিক করে নিচ্ছিল।

রিকশা সাত মসজিদ রোড থেকে বায়ে মোড় নিয়ে ধানমন্ডির ভিতরে ঢুকে গেল। এসব রাস্তায় রিকশা আর প্রাইভেট গাড়ি ছাড়া অন্য কিছু চলে না। দুপাশে বড়লোকদের নিকানো পোছানো বাড়িঘর, সামনে ফুলের বাগান, গেটের পাশে মেহগনি গাছের সারি। পাতার আড়ালে উঁকি দিচ্ছে ঝকঝকে একেকটা বাড়ি। কোথাও কোন সুন্দরের ছন্দপতন নেই, অসামঞ্জস্যতা নেই, নেই কোলাহল-ভীড়ভাট্টা। রিকশার উঁচু সিট থেকে ওসব বাসার ভিতর বারান্দা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বারান্দায় বেতের চেয়ার বসানো, কিনারায় ফুলের টব। 

মা তাকালেন টুনির দিকে, অন্যরকম এক টুনি বসে আছে তার পাশে। আজ আর বোধহয় বৃষ্টি নামবে না, আকাশটা একটু ধরেছে। শেষ বিকেলের হলদে চাপা রোদ ছড়ানো চারিদিকে। সেই আলো মেখে বসে আছে টুনি, কানে সবুজ পাথরের ছোট্ট দুল, লম্বা চুলগুলো হাতখোপা করা। হাতের অনামিকায় রুবি বসানো একটা ফুলেল আংটি, এটিই সম্ভবত তার বড়বেলার জীবনের প্রথম সোনার অলংকার। লেখাপড়ার চাপে টুনির কোনদিন সাজগোজ করা হয়ে ওঠেনি, সাজগোজের আয়োজন নেই তার। তবুও আনাড়ি হাতে ঠোটের উপরে হালকা লিপিস্টিক ছড়িয়েছে, চোখে কাজল দিয়েছে। পুকুরের মতো গভীর চোখ মেলে দেখছে শহরের যত ব্যস্ততা। বৃষ্টি শেষে ধুয়ে মুছে যাওয়া এক শহর, এখনও পাতারা একপ্রস্থ ভেজা। যেন কোথাও কেও নেই, একলা টুনি বসে আছে চলন্ত রিকশায়। কনে দেখা আলোয় টুনি এক ফুটন্ত নীল অপরাজিতা।

 

 

শুভময়ী 

নাদিয়া নওশাদ 


রজত আর পারমিতার বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও বিয়ের পর তারা দুজন দুজনকে প্রচন্ড ভালোবাসতে শুরু করে। কলকাতার যাদবপুর এলাকায় নিজেদের আদিবাড়িতে বাবা, মা, রজত ও পারমিতার বসবাস। একই শহরের বারুইপুরে পারমিতার বাবার বাড়ি। পরিবারে মা আর এক ছোট ভাই রয়েছে। রজত একটা স্থানীয় ব্যাংকে ম্যানেজার হিসেবে চাকরিরত। সংসারের যাবতীয় কাজ আর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা-শুশ্রূষা দেখাশোনা করে পারমিতার দিনাতিপাত হয়। বেশ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যের একটি সংসার। 

দেখতে দেখতে কয়েটি বছর কেটে গেল। এরইমধ্যে পারমিতার কোল আলো করে পৃথিবীতে এলো তাদের কন্যা শুভময়ী। দেখতে ভারি মিষ্টি। মায়াভরা দুটো চোখ, নরম তুলতুলে গাল, সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা একটি শিশু শুভময়ী। 

সময়ের সাথে হাসিখুশি শিশুটি যখন সবে কৈশোরে পদার্পণ করলো, হুট করে একদিন তার বাবা মারা গেল। ব্যাংক থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় রজতের মৃত্যু হয়। শুভময়ী তখন রাশমণি মেমোরিয়াল স্কুলে ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। 

সময়টা পারমিতার তখন প্রতিকূলে, রঙিন পৃথিবী ধূসর, অন্ধকারাচ্ছন্ন। নিঃসঙ্গতা, টিকে থাকার লড়াই-সবই প্রয়োজন হয়ে উঠল। এরপর পরিবার চালাতে অনেক কষ্টে একটা স্কুলে চাকরি যোগাড় করে পারমিতা। দিন-রাত স্কুল, সংসার নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম তার। রজতের ইন্সস্যুরেন্সের টাকা, পারমিতার মাইনে আর শ্বশুরের একসময়ের জমানো কিছু টাকায় সংসার চলতে থাকে।

রজতের মৃত্যুর পর তার মা অনেকটা বদলে যায়। পারমিতাকে তার সহ্য হয় না। তার ধারণা, রজতের মৃত্যুর জন্য কোন না কোন ভাবে পারমিতা দায়ী। পারমিতার বাবার বাড়ির কেউ অথবা স্কুলের সহকর্মীদের কেউ দেখা করতে এলে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, 'খুবতো নিজের লোকদের কাজু, কিশমিশ দেয়া বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। যতসব বাড়তি খরচ।' 

এসব শুনে পারমিতার চেয়ে বরং তার মেয়ে শুভময়ী বেশি কষ্ট পায়। সে মায়ের একাকিত্ব, লড়াই অনুভব করে। মায়ের জন্য কিছু করতে চায়। কিন্ত ছোট বলে সেও যে আজ অসহায়, অপারগ।

পারমিতার স্কুলের সহকর্মী সুজয়। ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যে খুব ভালো। পারমিতার ব্যাপারে সবকিছুই জানে। সে পারমিতাকে পছন্দ করে। পারমিতার সম্মতি পেলে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাকে আপন করে নিতে চায়। একসময় সে পারমিতার শ্বশুরবাড়িতে দেখা করতে আসে। পারমিতাকে বিয়ে করার বিষয়টা জানায়। সব শুনে পারমিতা বেশ অবাক হয়। তবে শুভময়ী বেশ খুশি হয়। পারমিতার শাশুড়ি যথারীতি আপত্তি জানিয়ে কটুকথা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু ছোট শুভময়ী মা'কে বোঝায় যে, বাবার মৃত্যুর পর তারও নিজের জীবন উপভোগ করার অধিকার আছে। তাই সে মন্দিরে দাঁড়িয়ে শাস্ত্রমতে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে দেয়। বিয়ের পর পারমিতা শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করতে গেলে তার শাশুড়ি যথেষ্ট অপমান করে। শুভময়ীর ইচ্ছা ছিল মায়ের সাথে চলে যাওয়ার কিন্ত তার ঠাকুমা শুভময়ীকে নিজের কাছে রাখতে চায়। পারমিতা বুকে পাথর চেপে শুভময়ীকে বোঝায়-'ঠাকুমার বয়স হয়েছে! তার কাছে থাকো, ঠাকুমাকে দেখভাল করো।' 

আজ শুভময়ী অষ্টাদশী। এতোগুলো বছরে মায়ের সাথে যদিও ঠিকঠাক দেখা করতে পারেনি। লুকিয়ে মাঝেমাঝে মাকে দেখে আসতো, টুকটাক ফোনালাপ চালিয়ে যেতো। আজ, এখন আর কেউ আইনত পারমিতা ও শুভময়ীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। সুজয়ও শুভময়ীকে খুব স্নেহ করে। এবার খুব ধুমধাম করে সুজয় আর পারমিতা শুভময়ীর জন্মদিন পালন করেছে। সত্যিই মায়ের জীবনের অভিনব আনন্দ ফিরিয়ে দিয়ে শুভময়ী সমাজে এক উজ্জ্বল ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। 

 

 

প্রকৃতি আমার শিক্ষক

এইচ বি রিতা


ফ্লাশিংয়ের পথ আমাকে টেনে নিয়ে যায় ভিন্ন এক প্রকৃতির রূপনগরে। খুঁড়িয়ে চলা পথে পাতার মরমর ধ্বনি, আমার কানে বাজায় কাব্যির সেতারের সুর আর রূপকের উপস্থাপনায় বলে যায় জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা। আমি মুগ্ধ হতে হতে হারিয়ে যাই কখনো প্রাণে কখনো প্রকৃতির বিশুদ্ধ ঘ্রাণে। 

ঋতুর সাথে পাতার ঝরে পড়া, পরিবর্তন, জীবনের প্রতিনিয়ত বহমান জটিল অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। বুঝতে পারি, পাতাদের এই মরমর ধ্বনি আর পরিবর্তন, অস্তিত্বের একটি মৌলিক অংশ। 

দিনশেষে সময়ের দাবীতে সবুজ সতেজ পাতাগুলি যখন শুকিয়ে যায়, উপলদ্ধি করি জাগতিক কত কি নিয়েই না অস্থিরতা বাসা বাঁধে আমার মনের গহীনে। কী হবে এতো অস্থির হয়ে যেখানে জীবন স্থির নয়, ছিল না কোনকালে! বরং আজকের মুহুর্তটুকুই না হয় উপভোগ করি, প্রশংসা করি নিজেরটুকু যা রক্ষিত আছে শুদ্ধতায় বা অশুদ্ধের ঝুঁকিতে!

অদ্ভুত বর্ণনাতীত সুন্দর শরৎঋতুর দিনে, বৃষ্টি আর মেঘের খুনসুটিতে গায়ে মাখি উত্তুরে বাতাস। চোখে পড়ে, বাতাসের ঝাপটায় বারবার স্থানচ্যুত হওয়া পাতাদের। লক্ষ্য করি, দলবদ্ধ পাতা বাহ্যিক শক্তি দ্বারা নিক্ষিপ্ত হয়েও দোলতে থাকে, খাপ খায় নতুন পরিবেশে মনের আয়েশে। এ যে জীবনেরই স্থিতিস্থাপকতা। 

আরো দু'কদম সামনে বাড়তেই প্রকৃতি আরো উন্মুক্ত হয়। দেখি, গাছের ছাউনিতে পাতার সম্মিলিত ঝাঁকুনি, যা আন্তঃসম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ যে বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ।

মহাবিশ্বে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী হলো-চাঁদ। মানুষের প্রতিবেশী যেমন-তাদের ছায়া। গোল থালার মত দেখতে ডিম্বাকার এই চাঁদকে নিয়ে কত কবি রচণা করেছেন প্রেম বিষাদের কবিতা। চাঁদের আলোয় কতজনের মনে এসেছে রোমান্টিকতা, সৃষ্টিশীল অভিনব কিছু। অথচ, চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্যের আলো চাঁদের ওপর পড়ে প্রতিফলিত হয়ে যখন পৃথিবীর দিকে আসে-তখন সেটাকেই আমরা ভাবি চাঁদের আলো। 

ভাবতে তো মানা নেই। সুন্দর স্বচ্ছ ভাবনাগুলি হোক না মিথ্যে বা ধোঁয়াশা, ক্ষতি তো নেই! এই যে চাঁদের গায়ে এত এত খাদ-যাকে কলঙ্ক বলেই জানি, তারপরও চাঁদের আলোয়-ই আমাদের মুগ্ধতা দেয়, প্রেম-বিরহ-শোকে মনকে ভাবায় নানান ভাবে। 

যে মানুষ আমরা চাঁদের কলঙ্ক উপেক্ষা করে আলো আর সৌন্দর্য নিয়ে ভাবি, সে মানুষ-ই কেন ব্যর্থ হই 'মানুষের' মন্দটা রেখে ভালোটা নিয়ে ভাবতে? কারণ-চাঁদ স্থির আর মানুষ অস্থির। চাঁদ বলে না, আলো ছড়ায়। মানুষ বলে আবার ছড়ায়ও-তবে সবটাই যে আলো তা নয়; কালোটাই বেশি। 

বয়স ঠিক কতদূর এগিয়েছে, তা ভাবার কী সময় এসেছে? এখনো বিদেশি সমবয়সী বন্ধুদের বিয়ের দাওয়াত কিংবা বেবিশাওয়ারে যেতে হয়। তবু বেলা তো কম হলো না! এখন না হয় প্রকৃতিকে ভালোবেসে চাঁদের মতো গায়ে কলঙ্ক নিয়েই আলো ছড়াই। হোক না সূর্য থেকে ধার নেয়া, তাতে কি? আলো তো! 

এভাবেই প্রকৃতি হয়ে উঠে আমার শিক্ষক। আর আমি হয়ে উঠি প্রকৃতির পর্যবেক্ষক। প্রকৃতি আমাকে শেখায় অমরত্ব এবং নশ্বরতার পাঠ। প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ট সংস্পর্শ, পৃথিবীর রহস্যের মধ্য দিয়ে যেতে আমার দৃষ্টিকে করে তুলে অনুপ্রবেশকারী।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন