https://www.prothomalony.com/
6764
literature
বৃষ্টি হচ্ছে
দীপঙ্কর গৌতম
বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি
তোমার কথার মতো বৃষ্টি হচ্ছে।
তোমার অসমাপ্ত- অবলা কথাগুলো শহরময় ভাসছে
কেমন আষাঢ়ে বৃষ্টি হচ্ছে- হালট ভিজছে ভিজছে মাঠ
কাক ভেজা ভবনগুলো ভিজছে।
রোদগুলো তোমার কাছে পাঠিয়েছি ইমেল করে-
আগামীকাল পাঠিয়ে দিও।
আমার ছাতা নেই- আর কিছু নেই
সব নিঃস্বতাগুলো বৃষ্টি এলেই মনে হয়।
বৃষ্টি হচ্ছে - চুলগুলো খুলে
খসখসে মেঘলা আকাশে শুকাতে দাও,
জল ভাসা কষ্টগুলো শিউলি ফুলের মতো তুলে নাও
ষোড়শী টোপরে।
রক্তিম অক্ষরের থোকা থোকা বিপ্লব
আশরাফ হাসান
যে যার পথে যাক
ছেড়ে দাও, ছুঁড়ে দাও
আরব্যরজনীর মারিখ খা গ্যাছে।
আবিদার রাক্ষসী গ্যাছে।
কামিল আমিলের আগুনশত্রুরা গ্যাছে।
অদূরে আঁটগিরু জটহিরো কামাইক্ষা যাক।
বালকরহস্য -এক, আকাশ যে বোঝেনি সে-ও যাক।
মধ্যাহ্নদ্রোহ নিয়ে খেলছে দাবাড়ু।
নৈঃশব্দ্যের কোলে বসে আছে শিশু- রাত।
পেছনে রাশরাশ তপ্তবেদনার মতো ধূম্রকেশ
সম্মুখে লেজতুলে বাতাস পোড়াচ্ছে আগ্নেয়গিরি।
আকাশের জানালা যে খুলতে জানেনি, সে চলে যাক।
রক্তিম অক্ষরের থোকা থোকা বিপ্লব যে বোঝেনি
সে-ও যাক।
মধ্যাহ্নদ্রোহ ছড়িয়ে দিচ্ছে অগণন সূর্যপালক।
আজকের গোধূলি
রুদ্র সুশান্ত
গোধূলির প্রান্ত ছুঁয়ে কুচিকুচি হয়ে আছে আকাশে
মাতাল মেঘ,
আজকের সন্ধ্যাকে স্বাগতম জানালো ছুটে চলা
বাতাসের বেগ।
ছাদের কিনারায় শেওলা জমেছে, আমি বসে ঘাঁটছি
কবিতার খাতা
এখন কি লেখা আসে? অদৃশ্যে প্রেমে জমে আছে আমার
বিদীর্ণ মাথা।
তৃতীয় আষাঢ়ে কদমের ঘ্রাণ মুহুমুহু করছে ষোড়সী
প্রেমিকার মতোন
রাজসিন্ধুর রাজনর্তকী কোমর দোলাচ্ছে, সাথে
পল্লীবধূর কথন।
আজকের মেঘমাখা গোধূলি সোনায় মোড়ায়ে
সোহাগ করছে বেশ
গোধূলিকে গিলেছে সন্ধ্যা তবুও দিকজুড়ে রয়ে গেছে
নিদারুণ রেশ।
হাইকু
টি এইচ মাহির
ডাঙ্গায় ফিরি,
ক্লান্ত নিঃশ্বাস শেষে
ঝিমায় তরী।
শেষ কিরণে
ফিরতে হবে তবে,
ধায় চরণে।
একেলা তরী
হাওয়ায় দুলে পাল
উচ্ছল বারি।
দিনের শেষে
ফিরে আসে বিহঙ্গ
আপন দেশে।
শেষ বেলায়
কবিতা লিখি কল্পে
শেষ ভেলায়।
নিষ্কৃতি চাই
স্বপন শর্মা
আয়ুষ্কালের মেয়াদ পূর্ণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে
সেই রেল লাইন, গাছের মগডাল
বাড়ির উন্মুক্ত ছাদ, প্রমত্তা তিস্তাব্যারেজ এবং
লাইলনের দড়ি,
সবাই একবার করে ডেকেছিল আয়ুষ্কালকে-
বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাতে।
যে দিন রেল লাইনের আহ্বানে সাড়া দিলাম
ঘন্টা খানেক পর শুনলাম,
বিরোধীদলীয় অসহযোগ আগামী তিনদিন চলবে।
সেদিন হতে ওই সবে আর আগ্রহ নেই।
এখন চাতকের মত মেঘের মুখাপেক্ষী হয়ে প্রহর গুনছি
কখন আয়ুষ্কালের মেয়াদ পূর্ণ হবে;
কখন নিষ্কৃতি পাবো মোহময় দেহ হতে।
বিনম্র আষাঢ়
এবি ছিদ্দিক
কালের পৃষ্ঠায় অনুক্ষণ বয়ে চলে
ছোপ ছোপ বেদনার উল্লাসী পায়চারি!
তিমির নখের সাঁড়াশি আঁচরে উবে গেছে
পদ্যময় জীবনখাতা!
সেই কবেই তো ঘুমঘোরে উবে গেছে
বিষাদী জীবনের খসড়া!
সফেদ ভাবনারাও ফিরে গেছে বাগধারা জীবনে।
কাঁটাতারের বলয়ে গ্রন্থিত রয়ে গেলো
চেনা করিডোর...তবু কলাবতী সুখতরঙ্গ -
অসীম আকাশে ডানা মেলে লীলায়িত বৃষ্টিফোঁটার
দীপ্ত সোহাগে!
বিষাদবৃক্ষ পাশে -ফোটেছে আজ আহ্লাদী কদম ফুল
সৃজনের উল্লাসে কেঁপে উঠে চিরায়ত ইচ্ছেফুল
তবু হৃদয়ের গিরিখাতে ফোটে থাক একগুচ্ছ কদম।
কবির কখনও মৃত্যু নেই
ইথার আখতারুজ্জামান
নগর নুইয়ে পড়ে বিষণ্ণতায়, উত্তাল নদী
হয়ে যায় শান্ত
টগর থেকে ঝরে পড়ে সব লাল, ভবঘুরে মেঘ
স্থির আকাশে জড় হয়ে উদাস মনে খুঁজে ফেরে;
আপন নিবাস
গোলাপও হারিয়ে ফেলে তার তথাকথিত সুবাস।
অথচ আমি বরাবরই বিশ্বাস করেছি,
কবির কখনও মৃত্যু নেই
সে থেকে যায় অজস্র কোলাহলের মাঝে,
একটা নৈঃশব্দ্য হয়ে,একটা হাহাকার হয়ে।
কিংবা ধরুন, কবি মরে গিয়ে বেঁচে গেছে
সত্যি সত্যি বেঁচে গেছে
টিকে আছে এখনো আপনাদের করুণা হয়ে
কারো কারো আফসোসের সিথানে দুফোঁটা কান্না হয়ে।
শূন্যতা
মুকুল রাজ
প্রিয় স্থাতব্য জ্যোৎস্নায় ভরা নীলিমা,
হৃদয়শোভিত লোচনে দেখি বার বার
তবু যেন স্পৃহা জাগে নিসর্গে যাই, যেথায় ভুমিষ্ঠ হতে
যৌবন করেছি পার
প্রত্যহ যেন ফিরে যাই লালিত্য সেই বসতকারে।
শ্যেনদৃষ্টি নিয়ে সংসর্পে অবলোকন করেছিলাম
তিস্তা তরঙ্গিনীর কলকল ধ্বনি
কত যে দিদৃক্ষা, তাই নিশীথে অশ্রুবারি ঝরে।
শৈশবের কত স্মৃতি হর্ষ-ঈপ্সায় জাগে,
তাই ক্ষণে ক্ষণে মোহিত করে সেই চির-চেনা নিসর্গ।
অবাঞ্ছিত
নুশরাত রুমু
ড্রইংরুমের মেঝেতে আশরাফ সাহেবের লাশ। জানাজার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সোহান দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। কারো কারো প্রশ্নাত্মক চোখে তার দিকে। অপ্রত্যাশিত জন্ম নিয়ে সোহান কখনো নিজের বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারেনি। আজও সে বাবা বলে চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না। ১৭ বছরের ছোট্ট জীবনে সে সবার বিরক্তির কারণ, চোখের কাঁটা।
সোহানের বাবা আশরাফ সাহেবের খুব বেশি বয়স হয়নি। হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা গেলেন। তার ছাত্রজীবন কেটেছে বড়ো বোনের শ্বশুরবাড়িতে। বোনের স্বামীর এক চাচাত বোন ছিল। ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে ওদের সংসারেই থাকত সে। নাম রেবেকা। দেখতে খুব একটা সুন্দরী না হলেও কথা বলত চমৎকার। মাঝে মাঝে আশরাফকে বোকা বানিয়ে খিলখিল করে হাসত। আশরাফ প্রথমে বিরক্ত হলেও ধীরে ধীরে ওর প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে দুজন দুজনের মনকে ভালোবাসার প্রত্যয়ে বেঁধে নেয়। দুজনেই ভেসে বেড়াতে থাকে প্রেমের সাগরে।
একদিন বিকেলবেলা খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ঘটনাচক্রে আশরাফ ও রেবেকা একা ছিল বাড়িতে। প্রকৃতি আর বয়স ওদের চোখে ঘোর লাগিয়ে দিল। আদিম খেলায় মেতে উঠল দুজনে। অসাবধানতা থেকেই গর্ভবতী হয়ে গেল রেবেকা। আশরাফের বোনই ব্যাপারটি প্রথম টের পায়। এ নিয়ে দুই পরিবারে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আশরাফ তার বাবার ভয়ে এক বন্ধুর বাড়িতে পালিয়ে যায়। একসময় রেবেকা আর আশরাফের অনাকাঙ্ক্ষিত ছেলে জন্ম নেয়। একটি শিশু জন্ম নিলে তার কান্নার শব্দে সবার মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু এই শিশুটির জন্মে কেউ খুশি ছিল না। সমাজের মানুষের আনাগোনায় দুই পরিবার বসে মধ্যস্ততায়। আশরাফের বাবা কিছুতেই রেবেকাকে ছেলের বউ করতে রাজি নয়, অনেক বোঝানোর পর শুধু নাতিকে ঘরে আনতে বাধ্য হোন। মা ছাড়া দুধের শিশু লালন পালন করা মোটেই সহজ নয়। তবে আশরাফের মা পরম মমতায় নাতিকে লালন পালনের ভার নেয়। আদর করে ডাকেন সোহান। রগচটা দাদা শিশুটির আকিকা দিতে রাজি হননি, উল্টো তার কান্না শুনলে বিরক্ত হতো। শিশুটিকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি। অবশেষে সুযোগ মিলে যায়।
একদিন ভোরবেলা এক দম্পত্তি আসে তাদের বাড়িতে। সোহানের দাদি তাদের না চিনেই আপ্যায়ন করেন। চা খাওয়ার ফাঁকে সেই মহিলা বললেন, তিনি নিঃসন্তান। ১১ বছর বিয়ে হলো কিন্তু কোনো সন্তান হয়নি। হঠাৎ সোহানের কান্না শুনে মহিলাটি তাকে কোলে নেয়। একটু আদর করতেই সে কান্না থামিয়ে তার দিকে তাকায়। সোহানের দাদা জানায়, ওরা সোহানকে দত্তক নিতে এসেছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সোহানের দাদি। এই খবরে আশরাফ সহ পরিবারের বাকি সবাই খুশি হোন।
ওদিকে ছেলেকে হারিয়ে রেবেকা অন্তর্বেদনায় জ্বলতে থাকে। চাচার পরিবারও সমাজ থেকে একঘরে হবার হুমকি পেয়ে তাকে জায়গা দিল না। অগত্যা রেবেকা শহরে চলে যায়। খুঁজে খুঁজে শেষে গার্মেন্টসে চাকরি পায়। ভালোবাসার মানুষ, সন্তান সব হারিয়ে শূন্যতা নিয়েই তার জীবন চলতে থাকে।
সোহান নতুন পরিবারে নতুন মা বাবা পেয়ে বেশ আনন্দেই ছিল। দত্তক মা তাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। বাড়ির অন্যরা খোঁজ না রাখলেও সোহানের দাদি গোপনে নাতির খবর নিত। আশরাফের, বাবার সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার সাহস ছিল না, তাই খবর নিত না ছেলের। একসময় তার বাবা তাকে কাজের সন্ধানে বিদেশ পাঠিয়ে দেন।
সোহানের কপালে সুখ সইল না। সাত বছর বয়সেই তার নতুন মা ডায়রিয়ায় মারা গেল। কয়েকমাস পরে নতুন বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করল। সেই মহিলা কিছুতেই সোহানকে সন্তান বলে মেনে নিতে পারল না। দুঃখ কষ্টে এগিয়ে যায় সোহানের দিন, মাস, বছর। দাদা মারা যাবার পর মাঝেমাঝে লুকিয়ে সে দাদির কাছে চলে আসত। সেখানেও সমস্যা, আশরাফ ততদিনে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। সেই বউ সোহানকে দেখলেই রেগে যেত। দাদি তাকে খাবার দিতে চাইলেও সে দিত না। এ নিয়ে আশরাফ ছেলের প্রতি কিছুটা সহমর্মীতা দেখাতে চাইলেও বৌয়ের চাপে সম্ভব হয়নি। নানারকম কটু কথা শুনে সোহান কাঁদতো। বাবা তার সাথে কখনো ভালো করে কথা বলে না। ওর কী দোষ সেটাই বুঝতে পারত না সোহান।
একদিন দাদির কাছে সোহান তার দুঃখময় জন্মের ইতিহাস জানতে পারল। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল বাবার ওপর। তারপর থেকে বাবার বাড়ি আসা বন্ধ করে দিল সে। অন্যের বাড়িতে জায়গির থেকে শহরের কলেজে ভর্তি হলো।
তিনমাস পর হঠাৎ খবর পেল ওর বাবা বিদেশে মারা গেছে। আর অভিমান করে থাকতে পারল না। যে বাবা তাকে পৃথিবীতে এনেছে অন্যায়ের পথে, যার কাছে তার মায়ের জায়গা হয়নি, যে কোনদিন তাকে ছেলে হিসাবেও স্বীকৃতি দেয়নি, সেই বাবাকে শেষবার দেখতে ছুটে এলো সোহান।
শুনতে পেল, তার বাবা মৃত্যুর আগে সমস্ত সম্পত্তি উইল করে দিয়ে গেছে স্ত্রীর নামে।
সবাই গাদাগাদি করে মৃত মানুষটার মুখ দেখছে। সোহান সেদিকে গেল না। সদর দরজা পেরিয়ে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেল। অবাঞ্ছিত এই জীবন থেকে দূরে গিয়ে এবার সে তার মাকে খুঁজবে। যতবারই মা বলে কাউকে আঁকড়ে ধরেছে, সে-ই হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। সত্যিকারের মা কেমন হয়, জানা নেই সোহানের। আজ সোহান মা'কে খুঁজে পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন