https://www.prothomalony.com/

6592

bangladesh

বাংলাদেশ

সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন এবং সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য পরিষদের আলোচনা সভা

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৮:২৩

২৪ সেপ্টেম্বর রোববার ম্যানহাটানের নিউ ইয়র্ক হিলটন মিলেনিয়াম ইউ. এন. প্লাজা হোটেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কর্মকর্তাদের সোয়া ঘন্টা স্থায়ী এক সভায় সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন এবং সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের ব্যাপারে মত বিনিময় হয়। উক্ত সভায় সংগঠনের তিন সভাপতি অধ্যাপক নবেন্দু দত্ত, ড. টমাস দুলু রায় ও রণবীর বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক ড. দ্বিজেন ভট্টাচার্য্য এবং উপদেষ্টা ড. দিলীপ নাথ ছাড়াও যোগ দেন জগন্নাথ হল এ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শ্যামল চক্রবর্তী এবং ইন্টারন্যাশন্যাল মতুয়া মিশন অফ নিউইয়র্কের সভাপতি ও জগন্নাথ হল এ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুশীল সিনহা।  

পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করে সভায় অংশ গ্রহনকারী নেতৃবৃন্দ এক একে পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলেন যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা’ ২০১৯শে সংসদের প্রথম অধিবেশনে পুরণ করা হলে ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রপন্থীরা আমাদের ভাই-বোনদের উপর ২০২০শে মুরাদ নগরে কিংবা ২০২১ সালের শারদোৎসবে নারকীয় তা্ণ্ডব চালানোর দু:সাহস তো করতই না, এত দিনে হয়তো সম্পূর্ণভাবে বন্ধই হয়ে যেত সংখ্যালঘু নির্যাতন, যেমন বন্ধ হয়ে গেছে এ্যাসিড সন্ত্রাস। প্রতিশ্রুতি প্রদানের পাঁচ বছর পরও বিলটি পাশ না করা এবং ২০১১ সালে কয়েক হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতককে সনাক্ত করে জজ্ সাহাবুদ্দীন কমিশন যে তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছিল তাদের বিচারকার্য এখনও শুরু না করায় গভীর হতাশা ও বিষ্ময় প্রকাশ করে নেতৃবৃন্দ বলেন যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেতার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রধর্ম আইন পাশ করা সহ ধর্মীয় মৌলবাদীদের সকল দাবিদাওয়াই মেনে নিয়েছে এবং সেটা করা হয়েছে সেকুলার ডেমোক্র্যাসি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম-নাগরিক অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে’ দাবি করা হয় “বাংলাদেশে কোন সংখ্যালঘু নেই, সকলেরই সেখানে সমান অধিকার রয়েছে,” কিন্ত বাস্তবতা তো এর ঠিক বিপরীত –একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেয়া হয়েছে, বিচার করা হচ্ছে না সংখ্যালঘু নির্যাতকেদের, দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ গড়া হচ্ছে কিন্ত মন্দির/গীর্জা গড়া হয়নি একটিও, ইসলামী ফাউন্ডেশন রয়েছে কিন্ত হিন্দু, বৌদ্ধ খৃষ্টানদের ফাউন্ডেশন হয়নি এখনও। সংখ্যালঘু নাগরিকদের প্রতি সরকারের এই বৈষম্যমূলক আচরণে উৎসাহীত হয়ে এবং সংখ্যালঘু নির্যাতকদের কোন বিচার না হওয়ায় প্রশ্রয় পেয়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা সংখ্যালঘুদের ভূসম্পত্তি ও বাড়িঘর দখল করে নিযে, দেবালয়-দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস করে দিয়ে, উচ্ছেদ, ধর্ষন, বিভিন্নভাবে ধর্মান্তরিত করা সহ বর্বর অত্যাচার করে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করছে সংখ্যালঘু নাগরিকদের। আপনার চোখের সামনে, দেশের মোট জনসংখ্যায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২০% (১৯৭০) থেকে নেমে ৯.১%-এ (২০২২) পৌঁছেছে; আর, আগামী পচিশ বছরে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। তাঁরা মন্ত্রীকে বলেন যে, এই নির্মম পরিণতি ঠেকানো সরকারের দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য, বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা যখন ক্ষমতায় আসীন।

ইতিমধ্যেই যে দেশে দুর্গা প্রতীমা ধ্বংস করা শুরু করেছে সেটা উল্লেখ করে তাঁরা শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী হয়তো আবারও ২০২১ সালের মত পুজোয়ও হিন্দু সম্পদায়ের ওপর আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বলে তাঁরা মন্ত্রীকে এ’ ব্যাপারে ২০২২ সালের মত সরকারকে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহন করতে অনুরোধ জানান। তাঁরা বলেন, এই দায়িত্ব শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়, এ’টা পুলিশ, র‌্যাব, বি.জি.বি. ও সেনাবাহিনী, যারা জাতিসংঘ কর্তৃক নিয়েজিত হয়ে বিদেশে মানুষের নিরাপত্তা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের সকলের।

নেতৃবৃন্দ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, এই সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ একটি কঠোর সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন অবিলম্বে পাশ করে এর প্রয়োগ শুরু করা। বিচার এবং কঠোর শাস্তির ভয় থাকলে, সরকার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার নীতি অবলম্বন করলে এই মানবতা বিরোধী অশুভ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে দাবি করে, নেতৃবৃন্দ সংসদে সরকারী দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরীষ্ঠতার সদ্ব্যবহার করে বর্তমান সংসদের এই শেষ অধিবেশনেই সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনটি পাশ করে দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান।  

নেতৃবৃন্দ মন্ত্রীকে বলেন যে, দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করার ক্ষমতা সম্পন্ন যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা এ্যাক্টের খসড়া বিলটি তাঁরা ওয়াশিংটনস্থ রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের মাধ্যেমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন, সেটিকে পূর্ণাঙ্গরূপে পাশ করতে হবে, অর্থাৎ তা’তে নিম্নলিখিত আইন/ধারাসমূহ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে:

(১)সংখ্যালঘু নাগরিকদের “সংখ্যালঘু” বলে স্বীকৃতি প্রদান, যা সকল দেশেই রয়েছে;

(২)একটি হেইট স্পীচ্ ও হেইট ক্রাইম আইন, যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মত সরকার-বাদী-মোকদ্দমার মাধ্যমে বিচার বিভাগের একটি বিশেষ ডিভিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রন/তত্বাবধানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্ত, মামলা দায়ের, বিচার ও শাস্তি প্রদানের নিশচয়তা;

(৩)সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের জন্য প্রতি জেলায়  একটি করে দ্রুত-বিচারের ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত প্রতিষ্ঠা করা;

(৪)একটি জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা;

(৫)একটি সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করা;

(৬)বাতিলকৃত অর্পিত সম্পত্তি আইনে অধিগৃহীত সকল সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান;

(৭) সংসদে অন্তত: ২০% আসনে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রদানের বিধান;

(৮) জজ্ সাহাবুদ্দীন কমিশন কর্তৃক চিহ্ণিত ও বিচারের জন্য সুপারিশকৃত হাজার হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার কার্য্য অবিলম্বে শুরু করার নির্দেশ;

(৯)একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন পূর্বক ২০০৬ থেকে এ’পর্যন্ত সংঘটিত সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপরাধীদে র তালিকা করে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ ;

(১০) সাম্প্রদায়িক  নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্তদের যথেষ্ট পরিমান ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের পুনর্বাসন এবং শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ;

(১১)প্রতিটি জেলায় অন্তত: একটি করে মেগা/মডেল মন্দির নির্মান করার নির্দেশ;

(১২)ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আদলে আলাদা আলাদা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ফাউণ্ডেশেন গঠন করার নির্দেশ:

(১৩) দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ আইন করা;

(১৪)পার্বত্য ভূমি কমিশনের দ্রুত, যথাযথ বাস্তবায়ন;

(১৫) সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসমূহের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা; এবং

(১৬)১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুজ্জীবিত করা।


পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নেতৃবৃন্দ বলেন যে, এ’সব দাবি নতুন কিছুই নয় -- পাশের দেশ ভারতে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার্থে শুধু জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন নয়, একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও আছে; আর, যুক্তরাষ্ট্রে, হেইট ক্রাইম ও স্পীচ আইন রয়েছে, যার ফলে এখানে কেউ বর্ণবাদী বা ধর্মীয় সন্ত্রাসের শিকার হলে বিচার বিভাগ সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, সরকার-বাদী-মোকদ্দমার মাধ্যমে অপরাধীকে ফেডারেল-অপরাধে ত্বরিৎ বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করে।

নেতৃবৃন্দ মন্ত্রীকে বলেন যে, সংসদের অক্টোবর অধিবেশনে একটি সংখ্যালঘু কমিশন বিল পাশ করা হবে বলে আশ্বাস দিযে ঢাকায় গণ-অনশন রত সংখ্যালঘু নেতৃবৃন্দকে অনশন প্রত্যাহার করানো ব্যাপারটাকে তাঁরা এক নিষ্ঠুর পরিহাস বলে উল্লেখ করেন, কারণ জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন শুধু নির্যাতনের কাহিনী লিপিবদ্ধ করতে পারবে, যা মিডিয়া, বিশেষ করে সোসাল মিডিয়াও করে; এই কমিশন না পারবে ত্বরিৎ গতিতে ঘটনার তদন্ত করে, আসামীকে গ্রেফতার করার জন্য র‌্যাবকে নিয়োগ করাতে, না পারবে দুর্বল নির্যাতিত সংখ্যালঘু নাগরিকদের পক্ষে নিজে বাদী হয়ে মামলাও রুজু করে, দ্রতগতিতে বিচার ও রায় প্রদানের ক্ষমতা সম্পন্ন আদালতে অপরাধীর বিচার ও শাস্তি বিধানের নিশচয়তা দিতে। কাজেই ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিশ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যালঘু সুরক্ষা এ্যাক্ট বিল পাশ না করে শুধ এর একটি ধারা বা উপ-আইন অর্থাৎ সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা আদৌ কিছু না করার শামিল -- এ’টা ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী সংখ্যালঘু নির্যাতকেদের আবারও নিশ্চিতভাবে ইঙ্গিত দেবে যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপরাধে কারও বিচার/শাস্তি হবে না।  

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সকলের বক্তব্য শুনে তাঁদের বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত বলে স্বীকার করেন এ’ ব্যাপারে যথাসাধ্য সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রতি দেন।  

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন