https://www.prothomalony.com/
18408
bangladesh
গভীর, গহিন অরণ্য। সুন্দরী ও গরান গাছের সমারোহ। এই বনই সুন্দরবন। নামটি শুনলেই মানুষের মনে জাগে হাজারো রহস্য, অজস্র কৌতূহল। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীব্যবস্থার বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবন নামের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। সুন্দরী গাছ সাধারণত মিষ্টি পানিতে ভালো জন্মায়। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের অনেক এলাকায় সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমছে। সুন্দরবনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে এবং বাকি ৪০ শতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। এখানকার মানুষের বড় একটি অংশ কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই তাঁদের প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হয়। নিচু ভূমি, নদী-খাল, ঘন বন এবং প্রতিকূল আবহাওয়া তাঁদের জীবনকে করে তুলেছে কঠিন। বিশেষ করে মৌয়ালদের জীবিকা মৌসুমি আবহাওয়ার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। চৈত্র মাসে দক্ষিণা বাতাসের সঙ্গে মৌমাছির আনাগোনা বাড়ে বলে এ সময় মধু সংগ্রহের মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, কখনো অতিবৃষ্টি আবার কখনো অনাবৃষ্টি তাঁদের জীবিকায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে নদী, জল ও প্রকৃতিকে ঘিরে। একসময় মানুষ বন্য প্রাণী ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে গুহায় আশ্রয় নিত। পরে সভ্যতার অগ্রগতিতে গুহাবাসী মানুষ গৃহবাসী হয়েছে। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে, আধুনিক মানুষের সেই ঘরও কি প্রকৃতির বিপর্যয়ের মুখে নিরাপদ? সুন্দরবনের মানুষের জীবন সেই প্রশ্নেরই বাস্তব উদাহরণ। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার প্রভাব তাঁদের বসতি, কৃষি ও জীবিকাকে বারবার বিপন্ন করছে।
পরিবেশ আজ নানা সংকটে আক্রান্ত। মানুষের চাহিদা বেড়েছে, বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ। শিল্পায়ন, বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ছে। এসব গ্যাসের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড অন্যতম। গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপের একটি অংশ আটকে রাখে, যার ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই উষ্ণায়ন জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যে নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা; কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় জনপদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় বন এসব বিপর্যয়ের অভিঘাত কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে পরিবেশের ওপর মানুষের চাপ অব্যাহত থাকলে বনটির নিজস্ব ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়বে।
মানুষের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিনই ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি। এর ফলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়; উদ্ভিদ, প্রাণীসহ সব জীবেরই এখানে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করলেও প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। পরিবেশের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে।
হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, নদীর পানিপ্রবাহে পরিবর্তন, পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম উদ্বেগজনক দিক। হিমবাহ গলার প্রাথমিক পর্যায়ে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের বরফ কমে গেলে অনেক নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রায়। পানির সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
সমুদ্রদূষণও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। জাহাজ থেকে নির্গত তেল, পোড়া তেল ও লুব্রিক্যান্ট, শিল্পবর্জ্য এবং প্লাস্টিক সামুদ্রিক পরিবেশকে দূষিত করছে। এসব দূষণ সামুদ্রিক প্রাণী, মাছ এবং জলজ উদ্ভিদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। নদী ও সমুদ্রের পানিদূষণ শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। তাই পরিবেশ রক্ষায় শুধু বন সংরক্ষণ নয়, নদী-সমুদ্রের দূষণ নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঢাল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এই বন বাতাসের গতি ও ঢেউয়ের শক্তি কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি উপকূলীয় মাটি ধরে রাখে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং কার্বন ধারণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে। অসংখ্য প্রজাতির মাছ, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম।
সুন্দরবন একটি পরিবর্তনশীল বদ্বীপের অংশ। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো পলি বহন করে আনে। কোথাও পলি জমে নতুন চর জেগে ওঠে, আবার কোথাও নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়ে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই বনটির সুরক্ষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সুন্দরবন রক্ষা করা মানে শুধু গাছপালা বা বন্য প্রাণী রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা, খাদ্যব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ। বন উজাড় বন্ধ করা, নদী ও সমুদ্রদূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও বননির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
প্রকৃতির ওপর মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্যের ধারণা টেকসই নয়। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই বিপদ ডেকে আনে। সুন্দরবন আমাদের সেই সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলার এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করা তাই শুধু পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলের মানুষ সুরক্ষা পাবে, জীববৈচিত্র্য টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন