https://www.prothomalony.com/

18398

bangladesh

বাংলাদেশ

রবীন্দ্রনাথ: আপন আলোয় উদ্ভাসিত যার অবয়ব

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:২৩

১০ অক্টোবর ২০২৬ সালের সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালিমা লেপনের প্রতিবাদে 'শতকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ' কর্মসূচি চলছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে—'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে / তবে একলা চলো রে…'। ব্যক্তিগত মতামত হলো, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার প্রতিবাদ করার কোনো প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ স্বপ্রকাশিত তার সৃষ্টিকর্মের মাঝে। তার ঔজ্জ্বল্য রবি বা সূর্যের মতো বাঁধভাঙা। এতই প্রখর তার কিরণ যে তাকে ঢেকে দেওয়ার প্রচেষ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলার মতো, যা ফিরে এসে নিজের মুখ কুৎসিত করে এবং নিজেকে অপমানিত করে। থুতু আকাশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, সূর্যের কাছাকাছি যাওয়া তো অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপন করে জাতির মুখে কালিমা লেপন করা হলো—এ বোধ জন্মাতে পারেনি কালিমা লেপনকারীদের অন্তরে। কী করে বোধ জন্মাবে! আমাদের শিক্ষায় তো বোধ জন্মানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। যে মেয়েটি রবীন্দ্রনাথের মুখাবয়ব কালো রঙ দিয়ে ঢেকে দিতে গিয়েছিল, তার মুখাবয়ব ও দেহভঙ্গি দেখে বড় মায়া লেগেছে। তাকে যখন সাংবাদিকেরা ঘিরে ধরেছেন, মেয়েটি মোবাইল দেখে দেখে উত্তর পড়ে শোনাচ্ছিল।

সে একটি ঘুড়ি। ঘুড়ির নাটাই 'হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোনোখানে'। দেখে দেখে পড়তে পারছিল না। নাটাই যারা ধরে রেখেছিল, তারা কালিমা লেপনের ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছে। মেয়েটি বলছিল, ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রতিবাদের কর্মসূচিতে এসেছে সে। ভারতীয় আধিপত্যবাদকে রুখতে হলে রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপন প্রয়োজন! মুঠোফোনে যে বার্তা সে পেয়েছে, তার বাইরে যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো—ভারতীয় আধিপত্যবাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কী? তোতাপাখির শেখানো বুলিতে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না। মেয়েটি কাতর হয়ে বলেছে, "আপনারা আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না। এরকম ঝামেলা হবে জানলে তো আমি আজ কালিমা-লেপন কর্মসূচিতে আসতামই না।" আহারে! এসব তরুণ-তরুণীকে কী করে রাজনীতির নোংরা খেলার ঘুঁটি বানানো হচ্ছে, সে কথা ভাবলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়।

রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে ভারতীয়, একই অর্থে আমাদের জাতীয় কবি, প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামও ভারতীয়। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান তাকে অনেকটা জোর করে নিয়ে না এলে তিনি ভারতেই থাকতেন। তরুণ-তরুণীদের দোষ দেওয়ার কিছুই নেই। তাদেরকে শৈশব থেকে যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তারা সেই শিক্ষাই আত্মস্থ করেছে। শিক্ষা দিয়েছে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল। যে বুদ্ধিজীবী কোনো প্রমাণ ছাড়া, সূত্র ছাড়া ছড়িয়ে দিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন, তিনি বা তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। এসব দেখে 'মনে হয়', 'ধরে নেওয়া যায়'—রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিলেন।

যিনি এই নোংরা খেলার তত্ত্ব মাঠে ছেড়েছেন, তিনি কিন্তু নীরব। আমাদের নিষ্পাপ সন্তানেরা তার তত্ত্ব বিশ্বাস করে ওই বুদ্ধিজীবী—অর্থাৎ সলিমুল্লাহ খান অ্যান্ড কোং-এর প্রেরণায় তাদের পরিকল্পনায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নৈতিকতাহীন গুজব মাঠে ছাড়া হয়েছে। এই গুজবের পালে হাওয়া দেওয়া হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার মশলা দিয়ে। সেই মেয়েটিকে একজন কন্যার পিতা হিসেবে কী করে কাঠগড়ায় তুলি? পুতুল হয়ে সুতোর টানে সে দর্শকের সামনে নেচেছে। সুতো কাদের হাতে, কারা এসব তরুণকে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে, তাদেরকে কি আমরা চিনি? আমরা খুব ভালো করে চিনি এবং জানি। তাদের টিকিটি ছোঁয়ার সাহস আমাদের নেই। তাই আকাশের ঘুড়ি কিংবা পুতুলনাচের পুতুলকে ধরে আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর—এদের কোনো দেশ নেই। এরা বিশ্বের সম্পদ। বাংলায় শিশুশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। উনিশ শতকের বাংলায় শিশুদের জন্য পড়ালেখা সহজ, আনন্দময় ও উপযোগী করে তুলতে তিনি বিভিন্নমুখী সংস্কার ও অবদান রাখেন। শিশুদের বাংলা ভাষা শেখার জন্য তিনি রচনা করেন ঐতিহাসিক ও বহুল প্রচলিত গ্রন্থ 'বর্ণপরিচয়' (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ)। এর মাধ্যমে বাংলা বর্ণমালাকে সহজ ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে সাজানো হয়। এই যে তরুণ-তরুণীদের পিতা-মাতা, এমনকি তারা নিজেরাও বিদ্যাসাগরের কাছে ঋণী। তাদেরকে কি সেসব কথা জানানো হয়েছে? জানানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে জানানো হয়নি। আমরা নীরবতার সংস্কৃতিকে পছন্দ করি। বড় নিরাপদ রাখে নীরবতা!

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম কি তার নিজের? তার সৃষ্টিকর্ম বিশ্বের সকল মানুষের সম্পদ। কী আশ্চর্য! কালিমা লেপন করল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, আর পরম মমতায় সেই কালিমাকে উঠিয়ে নিয়ে পরিচ্ছন্ন করার কাজ করলেন একজন রিকশাচালক। তাকে অভিনন্দন, কুর্নিশ! তিনি না করলেও রাতের আঁধারে কোনো একজন প্রান্তিক মানুষ ভয়কে জয় করে এ কাজটির পুনরাবৃত্তি করতেন। আমাদের আশপাশে যারা চোখে দেখেন বলে দাবি করেন, তারা কিন্তু চক্ষুষ্মান নন। এই যে রিকশাচালক, তিনি হয়তো রবীন্দ্রনাথ পড়েননি, তোতাপাখির মতো সত্য-মিথ্যা ইতিহাস পাঠ করে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলার যোগ্যতাও তার নেই। তিনি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারেন সত্য ও সুন্দরের সত্তা। তিনি চক্ষুষ্মান, হৃদয়ভরা আলো। হৃদয়ে আলোর প্লাবন এত নির্মল যে তার বোধের গভীরতা বই-পড়া কিংবা একচক্ষুসম্পন্ন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।

রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য, ম্যুরাল বা স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার বা গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কি এই প্রথম ঘটল বাংলাদেশে? বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেল, এই ঘটনা প্রথম নয়। যারা সাহিত্য ও শিল্পকলায় মানবিকতা পছন্দ করেন না, তারা এই চেষ্টা একাধিকবার করেছেন। একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল—২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ম্যুরালে কালো রঙের কালি লেপে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সেই কালি মুছে ফেলে।

কালি মুছে যায়, তবে যারা কালিমা লেপন করে, তাদের অন্তরে কালি সঞ্চিত থাকে। এ কারণে বারবার এসব ঘটনা ঘটতে থাকে। যে দেশে কালিমা লেপনের ঘটনা ঘটে, সেই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে একটি দ্বীপ তৈরি করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য দিয়ে। সেই দ্বীপের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ অনেককেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ যেন শত্রু সৈন্য খতম করা! ভঙ্গুর মনীষীরা আজ দু'বছরের অধিক সময় ধরে আহত হয়ে শুয়ে আছেন সেই দ্বীপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বুদ্ধিজীবীরা নীরবতার সংস্কৃতি ধারণ করেছেন। নীরবতাই যেন হিরণ্ময়!

রবীন্দ্রনাথ দীন-দরিদ্র, প্রাণপ্রাচুর্যহীন, করুণাকাতর কোনো লেখক নন; তিনি বিশ্বকবি। তাই তাকে রক্ষা করার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ এক জন্মে ঋষির মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে অজস্র রত্নভাণ্ডার তার ভাষায় সৃষ্টি করতে সক্ষম—রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম না দেখলে আমাদের বিশ্বাস করা কঠিন হতো। সৃষ্টিকর্মের মান এবং পরিমাণ দিয়ে বিবেচনা করলে তিনি ছিলেন রাজা।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে ও বিশ্বের সকল মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন একাধারে বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক হিসেবে। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার সৃষ্টিসম্ভারের ভেতরে কী আছে? রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারে রয়েছে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন। জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয় তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১ হাজার ৯১৫টি গান, যা যথাক্রমে 'গল্পগুচ্ছ' ও 'গীতবিতান' সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে 'রবীন্দ্র-রচনাবলী' নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে 'চিঠিপত্র' ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এ ছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। কোনো শুভচিন্তার মানুষ তার সৃষ্টিসম্ভারের দিকে তাকিয়ে কি তাঁকে প্রণতি না জানিয়ে পারবেন? জানি না, তবে আমরা পারি!

রবীন্দ্রনাথকে পূজা করার প্রয়োজন নেই, তাকে শ্রদ্ধা করারও প্রয়োজন নেই, এমনকি তাকে রক্ষা করারও দরকার আছে বলে মনে করি না। তবে তাকে অপমান করার অধিকার আমাদের কারও নেই। তাকে অপমান করলে সত্য, সুন্দর ও মহৎ পৃথিবীকে নোংরা করা হয়। আমরা অনেক জঞ্জাল সঞ্চয় করেছি আমাদের ভাগাড়ে, আর কোনো অসুন্দর জঞ্জালের প্রয়োজন নেই।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন