https://www.prothomalony.com/

6565

new-york

নিউইয়র্ক

অবিলম্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করার দাবিতে ডিভার্সিটি প্লাজায় ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউ এস এ-এর সমাবেশ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৫:৫৯

২২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউ.এস,এ’র উদ্যোগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক শহরের ডাইভার্সিটি প্লাজায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক জোটের সকল নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করে বাংলাদেশের বিপন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য সকল সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম-অধিকার নিয়ে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি ভজন সরকারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রামদাস ঘরামীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন বাংলাদেশেী সংখ্যালঘু সংগঠনের প্রতিনিধিরাও যোগ দেন।

সভার শুরুতেই সংগঠনের সভাপতি ভজন সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আগমন এবং সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জ্ঞাপন করে বলেন যে, ঠিক এক সপ্তাহ আগে ই্‌উনাইটেড নেশনস সংলগ্ন ডাগ হেমারশোল্ড প্লাজায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে এবং আজকের সমাবেশের দাবি যেমন অভিন্ন তেমনি লক্ষ্যও অভিন্ন, আর সেটা হল, দেশে এই মৃহূর্তে গণঅনশন ও সভাসমাবেশরত আমাদের ভা্ই বোনদের মতই মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ওনাকে বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনটি সংসদের এই শেষ অধিবেশনে পাশ না করলে আবারও ইসলামী মৌলবাদী ও উগ্রপন্থীরা রামু, নাসির নগর, মুরাদনগর, কিংবা কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ের মত নারকীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটাবে। সভাপতি ভজন সরকার ও সাধারণ সম্পাদক রামদাস ঘরামী দুজনেই বলেন যে, এ’ ধরণের বর্বরতা ঠেকানো, এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যা হিসেবে মাননীয়া প্রধানমনন্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য।  

সভায় একরে পর এক বক্তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন সহ বিভিন্ন সেক্টরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভাবনীয় অর্জনের প্রশংশা করেন, তবে সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, দেশে ক্রমবর্ধমান সামপ্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার অসহায় পৌনে দুই কোটি হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা ও সম-অধিকারের ব্যাপারে তিনি রহস্যজনকভাবে উদাসীন – সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষযটা উনি কোন ভাবেই আমলেই নিচ্ছেন না। তাঁরা আরও বলেন যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আওয়ামী লীগের আমলেও হাজার হাজার সংখ্যালঘু নাগরিক অত্যাচারিত হয়ে দেশেত্যাগে বাধ্য হবে সেটা অনভিপ্রেত। 

সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকর্তা বলেন যে, ওয়শিংটনস্থ বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত ইমরান সাহেবের মাধ্যমে গত ১৩ই সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বরাবরে প্রেরিত স্মারকলিপির মাধমে এবং আজকের সমাবশে থেকে জানানো দাবি একটাই: তিনি যেন আর বিলম্ব না করে, পুজোর আগেই, ২০১৮ সালের নির্বচনী ইশতেহারে ওনার স্ব-প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনটি সম্প্রতি সাইবার সিকিউরিটি আইন পাশ করার মতই জরুরী ভিত্তিতে দ্রত গতিতে পাশ করেন।

সভায় যারা বক্তব্য পেশ করেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভজন সরকার, রামদাস ঘরামী, সুশীল সিনহা, ভবতোষ মিত্র, দীনেশ মজুমদার, প্রিয়তোষ দে, জয়দেব গাইন, পরেশ ধর, বিধান পাল, সোমনাথ ঘোষ, সুমিতা বিশ্বাস, অংশুমান শতপথী, শংকর বিশ্বাস, মিন্টু দাস, সনাতন শীল, মোহিত মিত্র, সুমন সূত্রধর, দেবব্রত ঘোষ, দেব ভট্টাচার্য প্রমুখ। 

বক্তারা সকলেই যুগপৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসাও করেন আবার গভীর হতাশা এবং ক্ষোভও প্রকাশ করেন। অত্যন্ত দু:খ করে তাঁরা বলেন যে, দেশে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সকল দাবিই চাওয়া মাত্র মেনে নেওয়া হয়, কিন্ত শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল করার জন্য, কিংবা রমনা কালীবাড়িতে প্রবেশাধিকারে জন্য সংখ্যালঘু হিন্দুদের যুগ যুগ ধরে আন্দেলন করতে হয়েছে; আর এখন, ২০১৮ সালে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করার জন্য ২০২৩ সালেও দেশে সংখ্যালঘুদের মিছিল-সমাবেশ-লমার্চ ও অনশন ধর্মাঘট করে মরনাপন্ন অবস্থায হাসপাতালে যেতে হচ্চে, এখানে আমাদের সমাবেশ করতে হচ্ছে, মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। তাঁরা বলেন যে, এক দিকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম আইন পাশ করে দিয়ে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে, আর অন্য দিকে সংখ্যালঘু নির্যাতকদের কোন দিনই বিচারের আওতায় না এনে তাদের সংখ্যালঘু নির্যাতনে উৎসাহ প্রদান করা হচ্চে।

বক্তারা বলেন, প্রচলিত আইনে সংখ্যালঘু নির্যাতকদের দমন করা সম্ভব নয় উপলব্ধি করেই প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করার প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন। সেটা রক্ষার গঠন করার পরপরই সংসদের প্রথম সেশনে পাশ করে দিলে দেশে ২০২১-এর অক্টেবরের নারকীয় তা্ণ্ডব ঘটত না, কিন্ত তিনি সেটা করেননি, কখন করবেন সে বিষয়ে কোন কথা বলছেননা, যা খুবই দু:জনক এবং রহস্যময়।  

প্রায় সকল বক্তাই বলেন যে, নিরন্তর জমি ও বাড়িঘর দখল, দেবালয়-দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস করা, উচ্ছেদ, ধর্ষন, বিভিন্নভাবে ধর্মান্তরিত করা ইত্যাদি বর্বর অত্যাচারের মুখে বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের ফলে বাংলাদেশ আমলে, আপনার চোখের সামনে, দেশের মোট জনসংখ্যায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব ১৯৭০ সালে প্রায় ২০% থেকে নেমে ২০২২ সালে ৯.১%-এ(শুধু হিন্দু ৭.৯৫%-এ)পৌঁছেছে; এবং, গবেষকদের ভবিষদ্বানী আগামী তিরিশ বছরে বাংলাদেশ হিন্দুশূন্য হবে। দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের এই নিশ্চিত করুণ পরিণতি টেকানো সম্ভব, এবং ঠেকাতেই হবে। তারা বলেন যে, মাঝেমাঝেই মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলে থাকেন যে, “বাংলাদেশে কেউ সংখ্যালঘু নয়, সকলেরই সমান অধিকার রয়েছে,” কিন্ত বাস্তবতা তো এর ঠিক বিপরীত। তাই সত্য স্বীকার করে নিযে, সমস্যার একটি টেকসই সমাধান করাই শ্রেয়:, আর সেটা হল অবিলম্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করা যার অন্তর্ভুক্ত অবশ্যই থাকা চাই: (১)সংখ্যালঘু নাগরিকদের “সংখ্যোলঘু” বলে স্বীকৃতি প্রদান; (২)একটি হেইট স্পীচ্ ও হেইট ক্রাইম আইন, যার অধীনে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের মত সরকার-বাদী-মোকদ্দমার মাধ্যমে বিচার বিভাগের একটি বিশেষ ডিভিশনের তত্বাবধানে সংখ্যালঘু নির্যাতকের বিচার ও শাস্তি প্রদানের বিধান; (৩)সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের জন্য  প্রতি জেলায় একটি করে দ্রুত-বিচারের ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত;  (৪)জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন; (৫)একটি সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়; (৬)বাতিলকৃত অর্পিত সম্পত্তি আইনে অধিগৃহীত সকল সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান;(৭) সংসদে অন্তত: ২০% আসনে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মনোনয়ন দানের বিধান;(৮) জজ্ সাহাবুদ্দীন কমিশন কর্তৃক বিচারের জন্য সুপারিশকৃত হাজার হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করার ব্যবস্থা; (৯)একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন পূর্বক ২০০৬ থেকে এ’পর্যন্ত সংঘটিত সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপরাধীদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে হস্তান্তর করা এবং নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্তদের যথেষ্ট পরিমান ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের পুনর্বাসন এবং শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা; (১০)প্রতিটি জেলায় অন্তত: একটি করে মডেল/মেগা মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা এবং কাজ শুরু করার নির্দেশ; (১১)ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আদলে হিন্দু ফাউণ্ডেশেন গঠন করার জন্য নির্দেশ ও অর্থ বরাদ্দ করা; (১১)দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ আইন; এবং (১২)১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুজ্জিবীত করা।

বক্তারা বলেন যে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কিন্ত নতুন কিছু নয়-অন্যান্য দেশে এ’সব আইন রয়েছে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে আছে হেইট ক্রাইম আইন, ভারতে রয়েছে সংখ্যালঘু কমিশন এবং সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়।  বক্তারা এই মর্মে দৃঢ় আশা ব্যাক্ত করেন যে, তাদের প্রস্তাবগুলোর আশু বাস্তবায়ন হলে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা দেশের সকল প্রগতিশীল মানুষের কাছেই কাম্য।  

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন