https://www.prothomalony.com/

6491

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:৫৭

মুক্তো
কাজী জহিরুল ইসলাম 


এখনও কি আমি হয়ে উঠিনি সফেদ এক মুক্তো? 
ঝিনুকের খোলসের ভেতরে নিজেকে তবে গুটিয়ে নেবার বুঝি হয়েছে সময়।

মাতৃঝিনুকের ওমে নিদ্রার ভেতরে কেটে যাবে কিছুকাল,

সমুদ্র-শৈবালে, অথবা সৈকতে, কোন এক দূর-সমুদ্রের
ঢেউয়ে ভেসে যেতে যেতে নরোম বালুতে, ফেনায়, কঙ্করে বাঁধা পড়ে যাবে, 
থাকবে হয়ত পড়ে মৃত নিস্প্রাণ ঝিনুক-মাতা,
কেউ তুলে নেবে, খুলে নেবে মাতৃক্রোড় থেকে আমাকে সাগ্রহে;

পৃথিবীর কোন এক রূপবতী রমনীর উজ্জ্বল গ্রীবায়, 
দাম্পত্য চিহ্নের সাক্ষী হয়ে 
বসে থাকবো হয়তোবা কারো কম্পিত অনামিকায়,

এ-ও তো জীবন।

অথবা প্রাচীন মুক্তোলোভী ঝিনুক শিকারী এক তুলে নেবে 
ঢেউ থেকে, হাওর, বিল কিংবা লেগুনের নীল জলরাশির গভীর থেকে,
ঘষে ঘষে ওরা আমাকে উজ্জ্বল করে তুলে দেবে
অতিসভ্য এক অলঙ্কার সভাকক্ষে,
বণিকের পছন্দের আকৃতিতে স্থির হয়ে যাবো একদিন,

সেই একই পরিণতি, কামতৃষ্ণ দম্পতির রমনদৃশ্যের
সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা, নারীদের সুবাসিত কন্ঠে দুলে দুলে।

 

 

 

কাব্যজ্ঞানী 
সুমন শামসুদ্দিন


অষ্টঘাটে কষ্ট নিয়ে নষ্টপ্রহর বসে আছে,
ঘাটের কাছে ষাটের যুগের ঠাঁটের কবির দুঃখ যাচে!
বর্তমানের কাব্যযানে পুরষ্কারের ঝোলার গন্ধে,
প্রতিযোগী কবিরা সব সওয়ারী হয় খ্যাতির দ্বন্দ্বে!

ছন্দবিমুখ কাব্যবৃক্ষ লতায়-পাতায় ডালে ডালে,
ব্যাকরণের কার্যধারা ছিল যেন অন্ধকালে!
আধুনিকের অলংকারে চমৎকৃত বইয়ের সারি,
মুখের বুলি আগুন ঝরায় প্রশংসাতে মঞ্চ ভারী!

কি আসে যায় বিদ্যা লাভে কবিরা তো জন্মজ্ঞানী!
মাথায় থাকে মহাকাব্য, সব কবিরাই কাব্যধ্যানী!
কল্পতরুর আকাশ যেন কবির মনেই যাপন করে!
কাব্যভাষার প্রকরণে বৃথাই চর্চা সময় ধরে?

স্তাবকতার বর্ণলেপন কবির খাতার পাতা জুড়ে,
লেখনিটা রক্ত ঝরায় বিবাদ চলে কাব্যপুরে!
 

 

 

ফেরা হবে না 
আবদুল বাতেন
 


পরদেশ পরকীয়া ফেলে, তোমার ফেরা হবে না আর 
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায়, পান্তা ইলিশের অমৃতে 
ফেরা হবে না, কুহুতান কনসার্টে 
ঝরঝর বর্ষার কদম ও কাশফুলের বিশুদ্ধ কবিতায়।

বর্ণিল বার, ক্লাব, থিয়েটারের আবেদন- উজ্জ্বলতা ঠেলে 
কবিগান, যাত্রা পালা, টংগের চায়ের দোকানে  
হবে না, হবে না তোমার ফেরা। 

টসটসে তরুণীদের ক্লিভেজ আর ঊরুর ঝলকানি ফেলে
উতলা আলিঙ্গন, চুরমার করা চুমাচুমিকে সোজাসাপ্টা 
জানিয়ে আলবিদা, শেষমেশ যেতে পারবে না-         
ঘোমটা দেয়া, শ্যামাঙ্গিনী কোন কন্যার কাছে তুমি আর। 

সহজ শব্দটির চেয়ে সহজ করে জেনেছি- 
ডলারের দাপট ছেড়ে ফেরা হবে না তোমার 
টাকা, রুপি কিংবা আর কোন মুদ্রার কাছে। 

ফেরা হবে না, হবে না- প্রভাতফেরির প্রশান্ত ভোরে 
বিজয় দিবসের দিগন্তছোঁয়া গৌরবে 
ফেরা হবেনা, সবুজ পাসপোর্ট হাতে 
প্রিয় মাতৃভূমি- মাতৃক্রোড়ে তোমার আজীবনের জন্য। 

 

 

 

ভেজা আমব্রেলা
মুসান্না হাবিব



ঘোরে আর বেঘোরে
বিকালের রোদ যৌবনবতী হয়ে
ফেরে হৃদয়ের কার্ণিশে।

যশোর রোড থেকে
গিনেসবার্গের ভেজা আমব্রেলা
কুড়িয়ে আনতে গিয়েছিলাম
দমদমের শেষ প্রান্তে।

ফ্রাইংপ্যানে শুকিয়ে যাওয়া
গোধূলির রঙ ফিকে হয়ে উড়ে যায়
এয়ার ইন্ডিয়ার ডানায় ভর করে।

প্রেম তো এক ভার্জিন মোহিত
স্ট্রর চুমুকেই নিমিষে শেষ হয়ে যায়।

 

 

 

যথাবিহিত ভালোবাসা
সাজ্জাদুর রহমান



একটু যথাবিহিত ভালোবাসা পেতে
মৌণ বিছানার পাশে বসে থাকে পীড়িত সময়
হৃৎপিণ্ডের হাঁসফাঁস
আলিঙ্গন করে শিল্পের কারুকাজ ।

দুর্দান্ত দার্শনিক মগজের রেণুগুলো
মরে যায় ভোর অবধি
আরাধ্য জীবনের নদী পেরিয়ে 
ক্লান্তির রহস্য জমে থাকে রজ্জুদেহে।

এই কর্পোরেট জীবন সোঁদা আঁশটে গন্ধে
চতুর মড়কের উনুনে দাহ্য হয়।

ভালোবাসার দূরারোগ্য আসবাব
জ্বলে জ্বলে রূপান্তরিত হয় ফণীমনসায়
অথৈ সমুদ্রে রংচটা ব্রীজের নিচে
হিমাচল দেহটাকে মনে হয় শর্করা তৈজস । 

 

 

 

শুঁড়িখানা সংক্রান্ত
মৃধা আলাউদ্দিন 


১-বিষ প্রয়োজন
শুঁড়িখানার নরম দেহ, কাবাব ভুনা, আদিরসের নিষ্প্রয়োজন
কান্নাভেজা জীবনে আজ আমার দেখি সবার আগে বিষ প্রয়োজন।

২-ব্যর্থ এ জীবন
সন্ধ্যা না ভাই, সমস্ত রাত গেলো আমার শুঁড়িখানায়
ব্যস্ত ছিলাম নগ্ন নারী, নর্তকীদের চুড়ি নাড়ায়।

৩-নেশা
নর্তকীদের নূপুর কিংবা ঢোলের ঢঙে যাচ্ছি নেশায় গড়িয়ে
রাত ফুরায়ে ভোর হয়েছে, কাঁপছি আমি; পড়ছে আলো ছড়িয়ে।

৪-শুঁড়িখানা
এখান থেকে আর যাব না পাখি কিংবা নরম তুলো 
নদীর কাছে
শীৎকার এবং ষড়ৈশ্বর্য; শুঁড়িখানায় জোছনা-তারা 
সবই আছে।

৫-শুঁড়িখানায়
মধ্য রাতে শুঁড়িখানায় এমন করে দিলে যখন হাত ছেড়ে
নীল ব্যথাতে বুকের ভেতর শব্দ হলো যেমন করে কাঠ চেরে…

৬-যৌবন
জীবন কেনো যায় না ধরা, যায় না ধরা; নারীর দেহ নদীরে
আমার কথা বলবো সবই শুঁড়িখানায় খোদারে পাই যদিরে।

 

 

 

ভাগ্যলক্ষ্মী 
এনাম আনন্দ 


যেদিক তাকাই- শুধুই দেখি 
বিদঘুটে অন্ধকার ও প্রেতাত্মাদের অশুভ ছায়া!
পুষ্প-তনুরা অঙ্কুরের অপেক্ষায়
পথপানে চেয়ে- নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দিচ্ছি যুগের পর যুগ।
হয়তবা একদিন- দীপ্তশিখা নিয়ে 
টগবগিয়ে ছুটে আসবে কোনো পথিক, দূর হবে অন্ধকার, 
খুলে যাবে ভাগ্যের দুয়ার।
আলোর তেজস্ক্রিয়তায় দৌঁড়ে পালাবে অশুভ ছায়া।
সে আশায়-
বিপুল মুগ্ধতা নিয়ে সংসার সাজাই, স্বপ্ন দেখি,
দেখি প্রেয়সীনির হাস্যোজ্জ্বল মুখ।
 

 

 

 

সুখের স্বাক্ষর
শাহীনুল ইসলাম



আকাশ ওড়ছিল একটি পাখির ঝাপটানো ডানায়
মাটির বন্দুক ট্রিগার টিপে বেরিয়ে এল মানুষ

পালকের আন্ধারে ঢেকে গেল পৃথিবীময় সমস্ত সুখ
তারপর হতাশার রক্তে রঙিন হল প্রেম
আমরা মানুষের ইবাদত করতে করতে ভুলে গেলাম ঈশ্বর 

যে ঘুমিয়ে ছিল সমুদ্র সুরের উত্তাল ঢেউ ঢেউ গানে
সেও আজ স্বাক্ষর দিচ্ছে একটুকরো সুখের জন্য। 

 

 

 

মণি- মুক্তা
কাজী ইসলাম

লতাকুঞ্জের টানা বারান্দাটায় বসে আছেন আরিফ সাহেব, আঙ্গিনার দিকে মুখ করে। যে সোফাটায় বসে আছেন তিনি, সোফাটায় একসময় বসতেন উনার বাবা। তখন চমৎকার বাগান ছিল লতাকুঞ্জে। লতাপাতায় পত্রে পুষ্পে পল্লবে রঙিন হয়ে থাকতো বাড়িটা। তিনদিকে বাগান, একদিকে বারান্দা।মাঝে নিকানো পরিচ্ছন্ন আঙ্গিনা।

এখন বাগান নেই, আঙ্গিনা আর নিকানো নয়।বাগানে এখন কাঁটা গুল্মের ঝোপঝাড়। কাঁটা লতা উঠবে ঘরের দ্বার গুলায়।  দীর্ঘ একটা শ্বাস পড়ে আরিফ সাহেবের।প্রবাস থেকে ফিরে অনেকটা জোর করেই, অনেকের মতের বিরুদ্ধে ঢাকার বাস ছেড়ে পৈত্রিক বাড়িতে পৈত্রিক ভিটেতে জীবনের শেষের দিনগুলি কাটাতে এসেছেন। যেখানে কাটিয়েছেন শৈশব-কৈশোর যৌবনের সেই সময়টা,  সেই সময়-সেইটাই ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়।অতীতে ডুবে থাকতেই আজকাল ভালোবাসেন তিনি। সামনের দিকে আর তেমন কিছু নেই বলেই বোধহয় অতীতের স্মৃতির ঊজ্জ্বল ছবিগুলোর ওপরেই আলো ফেলে দেখতে থাকেন।

আজ একটা ছবি দেখছেন। তখন বাবা-মা দেশের বাড়ি লতাকুঞ্জে থাকেন। আরিফ সাহেব কর্মসূত্রে ঢাকায়। একদিন হঠাৎ কিসের যেন কিছু বাড়তি ছুটি পেলেন। তখনও প্রায় তরুণ আরিফ সাহেব। হঠাৎ বাবা-মাকে অবাক করা একটা খুশির আনন্দ দিতে ইচ্ছে করলো। স্ত্রী আর দুই বাচ্চা নিয়ে বাবা-মাকে না জানিয়ে বাড়ি চলে এলেন। পৌঁছুতে দুপুর তখন গড়িয়ে যাবার পথে। বাড়ি এসে দেখেন বাবা-মা গেছেন বাবার এক বন্ধুর ছেলের বৌভাতের অনুষ্ঠানে। ঘরগুলো তালাবন্ধ। বাসায় শুধু কাজের মেয়েটা আছে।কি আর করা! আরিফ সাহেব আর তার স্ত্রী বারান্দায় বসলেন। খোলা আঙ্গিনা পেয়ে ছেলে-মেয়ে দুটো শীতুল আর মিতুল তুমুল আনন্দে কলরোল তুলে ছোটাছুটি শুরু করলো।কিছুক্ষণ পর বাবা ফিরলেন একা। মা আরো কিছুক্ষণ বিয়ে বাড়িতে কাটিয়ে আসবেন। আঙ্গিনায় পা দিয়েই বাবা আনন্দে দিশেহারা হয়ে শীতুল, মিতুলকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, "যাই এক্ষুনি ওদের দাদিকে নিয়ে আসি।" 

তখনও দেশে মোবাইল ফোন আসেনি।

পরে মা’র কাছে শুনেছিলাম বাবা ওখানে যেয়ে মা’কে বলেছিলেন,  শিগগিরি চলো, তোমার বাড়ির আঙ্গিনা সোনা-দানা, মণি-মুক্তা, হীরা-জহরতে ভরে গেছে।” 
কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ আরিফ সাহেবকে আবেশ বিহ্বল করে রেখেছিল অনেকক্ষণ।

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না আর! সোনায় ভরা মুক্তায়-মানিক্যে ভরা আঙ্গিনা খালি করে আরিফ সাহেব চলে এসেছেন। শুধুই চলেছেন। যে চলাকে তখন ভাবতেন ভবিষ্যত জীবনের উন্নতির পথের চলা।উন্নতি কি হয়েছে? ছুটতে ছুটতে একসময় দেখেন চলে গেছেন দেশ ছেড়ে।মধ্যাকর্ষণ পেরিয়ে মহাকাশযান যেমন ধায় মহাশূন্য পানে, তেমনি ছুটেছেন তিনি। শীতুল, মিতুল থেকে গেছে বিদেশেই।তিনি জীবনের ধূসর অপরাহ্নের কালে ফিরে এসেছেন।

নরকতুল্য নগরে থাকতে না পেরে ফিরেছেন মফস্বলের পিতৃভিটেয়।সেই আঙ্গিনা এখনও আছে কিন্ত ফুলের বাগান আর নেই।আজ বিষণ্ণ অপরাহ্নকালে মনে পড়লো সে দিনের কথা। আজ কোথায় সেই সব সোনা-দানা-মণি-মুক্তা-হীরে-জহরত!

বাবার সেই কথা, “তোমার আঙ্গিনা সোনা-দানা, মণি-মুক্তা, হীরা-জহরতে ভরে গেছে।”

“জীবনের খাঁটি সোনা-দানা ফেলে ছুটেছিলাম নকলের, ইমিটেশনের পেছনে।”

তাঁর মণি-মানিক্যরা আজ কোন সুদূর বিভুঁয়ে  আলো  ছড়াচ্ছে! দিনের  আলো নিভে আসে, আরিফ সাহেবের আঙিনায় এখন আঁধার নামবে!

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন