https://www.prothomalony.com/
18484
new-york
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি। একসময় এ সংগঠন ছিল প্রবাসীদের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক মর্যাদা ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরা, বিপদে প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানো এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল সংগঠনটিকে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে কি না, সে প্রশ্ন আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও সাংগঠনিক অনিয়মের অভিযোগ, মামলা এবং নির্বাচন স্থগিত হওয়ার ঘটনা সংগঠনটির নেতৃত্ব ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একটি প্রবাসী সংগঠনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া আদালত পর্যন্ত গড়ালে তা শুধু একটি কমিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয় থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা, সদস্যদের আস্থা এবং বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ সোসাইটির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ, একটি সংগঠনের শক্তি তার কার্যালয়, সম্পদ কিংবা পদ-পদবিতে নয়; তার শক্তি সদস্যদের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে বড় নাম ও দীর্ঘ ইতিহাসও প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে পারে না।
যেকোনো গণতান্ত্রিক সংগঠনে নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে। প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ থাকবে, কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তিও উঠতে পারে। এসব অস্বাভাবিক নয়। বরং স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতবিরোধই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে।
কিন্তু মতবিরোধের নিষ্পত্তি যখন বারবার মামলা-মোকদ্দমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থায় কোথাও দুর্বলতা রয়েছে। সদস্যদের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না, নির্বাচনী বিধিমালা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি।
সর্বশেষ নির্বাচনের আগে সাংগঠনিক অনিয়মের অভিযোগে মামলা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার ঘটনাও এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে, নির্বাচন স্থগিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র বোঝা সম্ভব।
তবু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়: একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নির্বাচন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা কি সংগঠনের নিজস্ব বিধিবিধান ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়? কেন সদস্যদের আস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে?
মামলা করা প্রত্যেক সদস্যের আইনগত অধিকার। কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়াও অন্যায় নয়। কিন্তু বারবার আইনি বিরোধে জড়িয়ে পড়া যদি সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে নেতৃত্বকে নিজেদের দায়িত্ব ও সাংগঠনিক সংস্কৃতি নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে।
প্রবাসে বাংলাদেশ সোসাইটির পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বহু মানুষ সংগঠনটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেছেন। কিন্তু সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে সংগঠনটির কার্যক্রম, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিয়ে হতাশা তৈরি হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা কম নয়। অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা, ভাষাগত বাধা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, প্রবীণদের একাকিত্ব, নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মানুষ কেবল নির্বাচন ও নেতৃত্বের খবর শুনতে চান না। তাঁরা জানতে চান, সংগঠনটি তাঁদের জন্য কী করছে, তাঁদের অর্থ ও সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তাঁদের মতামতের মূল্য কতটা দেওয়া হচ্ছে।
সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন ঘিরে বিরোধ যদি জনপরিসরে প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে মূল সামাজিক উদ্দেশ্যগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণ সদস্যদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সংগঠনটি জনকল্যাণের চেয়ে পদ-পদবি নিয়ে ব্যস্ত। এই ধারণা সত্য হোক বা ভুল, নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে তা দূর করা।
বিশ্বাস এক দিনে নষ্ট হয় না, আবার এক দিনেই ফিরেও আসে না। ধারাবাহিক জবাবদিহি, দৃশ্যমান জনকল্যাণমূলক কাজ এবং নিরপেক্ষ সাংগঠনিক আচরণের মধ্য দিয়েই তা পুনর্গঠন করতে হয়। প্রবাসী সংগঠনগুলোর নির্বাচনে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য কী—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব কি সংগঠনকে আরও কার্যকর করতে চান, নাকি নেতৃত্বের পদটিই হয়ে উঠেছে মূল আকর্ষণ?
যাঁরা নির্বাচনে অংশ নেন, তাঁদের সবার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়। অনেকেই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু নির্বাচনী বিরোধ যখন সংগঠনের কার্যক্রমকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়, তখন ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার দায় সবার ওপরই বর্তায়।
কোনো পক্ষের অভিযোগকে উপেক্ষা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অনিয়মের জন্য দায়ী করাও গ্রহণযোগ্য নয়। নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। আবার অভিযোগের নামে নির্বাচনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখার পরিস্থিতিও কাম্য নয়। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্পষ্ট নিয়ম এবং সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাই কাউকে ব্যক্তিগতভাবে জয়ী বা পরাজিত করার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা তার বিশ্বাসযোগ্যতার অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ সোসাইটির মতো সদস্যনির্ভর সংগঠনের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়, সম্পদের ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে সদস্যদের জানার সুযোগ থাকা উচিত। নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা, সদস্যদের কাছে হিসাব উপস্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নথি সংরক্ষণ—এসব কোনো বিশেষ পক্ষের দাবি নয়; এগুলো সুশাসনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
যদি কোনো সদস্য আর্থিক বা সাংগঠনিক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন, তাহলে সেই অভিযোগের উত্তর তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেওয়া উচিত। অভিযোগকারীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা না করে তাঁর বক্তব্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একইভাবে, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও ন্যায্য অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা থাকলে গুজব ও সন্দেহের সুযোগ কমে। আর স্বচ্ছতা না থাকলে ছোট প্রশ্নও বড় বিরোধে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী সংকটের সমাধানের পাশাপাশি সংগঠনের প্রতি সদস্যদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, আদালতের নির্দেশনা ও সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে। নির্বাচন স্থগিতের কারণ, অভিযোগ নিষ্পত্তির পদ্ধতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সদস্যদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রার্থীদের মধ্যে মতবিনিময়, অভিযোগ পর্যালোচনা এবং বিধিমালার নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সংগঠনের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। সদস্যরা যেন নিয়মিতভাবে জানতে পারেন তাঁদের সংগঠন কী করছে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং কীভাবে সম্পদ পরিচালিত হচ্ছে।
চতুর্থত, নির্বাচনের বাইরেও সংগঠনকে সক্রিয় থাকতে হবে। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, প্রবীণদের সহায়তা এবং প্রবাসীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে সংগঠনের পদ সাময়িক, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য দীর্ঘস্থায়ী। আজ যাঁরা নেতৃত্বে আছেন, কাল তাঁরা থাকবেন না। কিন্তু তাঁদের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সম্মান অর্জন করবে, নাকি বিতর্কের মধ্যে আটকে থাকবে, তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত উদ্যোগ, তাঁদের অংশগ্রহণ ও তাঁদের প্রত্যাশার প্রতিষ্ঠান। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও সদস্যদের। বারবার মামলা, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের চিত্র যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সংগঠনটির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আস্থা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সংকট মানেই শেষ নয়। আত্মসমালোচনা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান আবারও তার মর্যাদা ফিরে পেতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্ব ও সদস্যদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তাঁরা কি বিরোধের বৃত্তেই ঘুরতে থাকবেন, নাকি প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেবেন? প্রবাসী বাংলাদেশিরা এমন একটি সংগঠন চান, যেখানে নির্বাচন হবে গণতান্ত্রিক, হিসাব থাকবে স্বচ্ছ, নেতৃত্ব থাকবে জবাবদিহির মধ্যে এবং সাধারণ সদস্যদের মতামত পাবে যথাযথ গুরুত্ব। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ সোসাইটি চান, যার পরিচয় আদালতের মামলা কিংবা নির্বাচনী বিরোধ দিয়ে নয়, বরং প্রবাসীদের কল্যাণে তার অবদান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখন সময় এসেছে পদ-পদবির রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার। কারণ, বাংলাদেশ সোসাইটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে ক্ষতি শুধু একটি সংগঠনের হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থাও। ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললে চলবে না। বর্তমানের সংকটের দায় স্বীকার করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ সোসাইটির সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন