https://www.prothomalony.com/

5768

literature

সাহিত্য

উত্তরের জনপদ

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৩ ০১:৩৫

এই শহরে লড়াইটা সবার জন্যে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। কারো সাথেই কারোর গল্প দিনশেষে মেলে না। এক টুকরো সুখের আশায় মানুষ আজীবন ছুটে চলে। সম্পর্কের দ্বিখন্ডন যেমন কাউকে সংগ্রামী হতে শেখায়। তেমনি আবার ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্ক কাউকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। কোন মেয়ের স্বামী ছেড়ে গেলে সে হয়ে ওঠে একধারে মা ও বাবা। অন্যথায় কোন মেয়ে আবার জীবন যুদ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে। সংগ্রামের এই শহরে এমন দুটি ঘুরে দাড়ানোর সত্য গল্প নিয়ে “উত্তরের জনপদ”র পাতা আজ সেজেছে। বরাবরের মতো ছদ্ম নাম দেয়া আছে।

ধন্যবাদান্তে — সোহানা নাজনীন / ফরিদা ইয়াসমীন

ঈদের নামাজ

আজ কয়েক বছর ধরেই নীলা এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। ঈদের দিন সকালে ছেলেদুটো মাথা গোজ করে ঘরের কোনায় বসে থাকে। অভিমানে ফোলানো গাল নিয়ে মাথা নীচু করে রাখে, কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে কাঁদো কাঁদো গলায় জবাব দেয়,'মা, আমাদেরকে বাবা কেন মসজিদে নিয়ে যায় না? সবার বাবা আসে, ক্যান্ডি কিনে দেয়, শুধু আমাদের বাবা আসে না। একলা একলা ঈদের নামাজ পড়তে যাব না।'

নীলা তখন বিপদে পড়ে যায়, এইটুকু বাচ্চাদের সে কিভাবে বোঝাবে? মসজিদের সামনে দাড়িয়ে ওরা যখন দেখে অন্য সবার বাবা এসেছে, মুঠোর ভিতর হাত ধরে রেখেছে, তখন আর কোন আনন্দই বাচ্চাগুলোকে আন্দোলিত করতে পারে না। শুধু কি ঈদের দিন সকালে? স্কুলের প্যারেন্টস টিচার মিটিং, মুভি নাইট, ফাদারস ডে, এসব দিনেও ছেলেদুটো মন খারাপ করে থাকে। এই তো সেদিন বড় ছেলে 'স্টুডেন্ট অফ দ্য মান্থ' হল, সন্ধ্যায় স্কুলে এওয়ার্ড আনতে যাবার সময় ছেলের সে কি কান্না। একটাই কথা, 'আমাদের বাবা কেন সাথে থাকেনা?  বাবা কেন অন্য বাসায় থাকে?'

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নীলা খুব বেসামাল হয়ে পড়ে। তার স্বামী যখন তাদের একলা ফেলে রেখে চলে যায় বাচ্চারা তখন বেশ ছোট। নীলা বাচ্চাদের মিথ্যে বলেছিল, বলেছিল যে তাদের বাবা অফিসের কাজে অন্য স্টেটে গিয়েছে। দিন গেলে, মাস গেলে একদিন বাচ্চারা বুঝলো তার বাবা আর ফিরবে না, এখন থেকে দূরের কোন বাসায় থাকবে। ছেলে দুটোর বোবা চোখের চাহনি বুঝে পায় না যে বাবাকে কেন অন্য বাসায় থাকতে হবে। একদিন তারা আবিষ্কার করল তাদের বাবা আসলে বেশী দূরে থাকে না, ৫-৬ বিল্ডিং পাশেই থাকে। প্রায় এক বছর ধরে ডিভোর্স প্রসেস চলার পর বাচ্চারা তাদের বাবা কে আর দেখেনি। আর লোকটাও ছেলেদের কাস্টডি নেয়নি, কোনদিন ভুল করে দেখতেও চায়নি। নীলা কোর্টে যেয়ে কিছুটা চাইল্ড সাপোর্টের টাকা আদায় করেছিল। যদিও চালাক লোকটা সেসময় কাজ ছেড়ে দিয়ে নানান রকম বাহানায় ব্যাস্ত ছিল।

নিউইয়র্কের মতো ব্যায়বহুল শহরে একলা হাতে খরচ চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হত নীলাকে। এর মাঝে ছেলেদের অবুঝ প্রশ্ন, তবুও মাথা ঠান্ডা রাখত নীলা। বুঝতে পেরেছিল যে তাকে বাবা-মা দুই চরিত্রেই সমান দায়িত্বে থাকতে হবে। দেশ থেকে পড়ালেখা শেষ না করে এদেশে এসেছিল নীলা, প্রবাসী পাত্র পেয়ে আর কেও দেরী করতে চায়নি। তাই স্কুলের গন্ডি পার হয়ে কলেজে না ঢুকতেই বিয়ে পাকা হয়েছিল। কিন্তু মেধাবী নীলার তখন আরো পড়বার স্বপ্ন, গুরুজনদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাই বিয়েটা না করতে পারেনি। বান্ধবীরা সব হাসাহাসি করে বলেছিল, 'ভালোই তো হল, তুই বিয়ে করে বিদেশে থাকবি। তোর বর সুন্দর সুন্দর গিফট কিনে দেবে, গাড়ি করে ঘোরাতে নিয়ে যাবে।“ কিন্তু স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার মিল খায়নি  শেষমেশ। বিয়ের পর আমেরিকায় চলে আসল, দুটো বাচ্চা হবার পর পড়ালেখার স্বপ্ন জনালা দিয়ে উধাও। নীলাও পাকা গৃহিণীর মতো ডুব দিল সংসারে, তবুও অশান্তিটা পিছু ছাড়লো না।

নীলা বুঝতে পেরেছিল এদেশে শিক্ষার জোর না থাকলে কাদায় পড়তে হয়। কিছু ভালো মানুষের থেকে বুদ্ধি আর উৎসাহের জোরে জি-ই-ডি পরীক্ষা দিয়ে হাইস্কুল গ্রাজুয়েশন পার করেছিল। তারপর লোন নিয়ে সোজা কলেজে, সাথে বাচ্চাদের সময় দেয়া, সংসারের সব কাজ, সব একলাই সামাল দিত। এখন নীলা স্কুলে শিক্ষকতা করে, সারাদিন বাচ্চাদের সাথে উঠা-বসা করতে হয়। অন্যের বাচ্চাদের সাথে পরিমিত আচরণ করতে করতেই সে হয়ে ওঠে একজন দক্ষ শিশু মনো বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তারপরেও আজ মনে হয় নিজের সন্তানের কিছুই নীলা বুঝে উঠতে পারে নাই। কোথায় যেন একটা ব্যবধান থেকে যাচ্ছে, তাদের বাবার অভাব পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

আজও ঈদের দিন ভোরে নীলার ঘুম ভেঙ্গেছে, আজকেও যদি ঈদের নামাজ নিয়ে ঝামেলা হয় এই দুশ্চিন্তা ছেকে ধরলো তাকে। ছেলেরা ওঠার আগে দুটো পাঞ্জাবী ভাঁজ করে ড্রেসারের উপর রেখে দিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষন কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে উঁকি দিয়ে দেখে দুজনেই ল্যাপটপে গেম খেলায় মত্ত। নীলা ধীর পায়ে ওদের কাছে গেল, হাতদুটো মাথায় আলতো ছোঁয়াল। মোলায়েম সুরে বলল,চলো, আমরা তিনজন মিলে ঈদের নামাজ পড়তে যাই, আজ আমিই তোমাদের বাবা হব।
: মা, নামাজ বাসায় পড়লে হয় না?”
: না বাবুরা, ঈদের নামাজ সবার সাথে জামাতে পড়তে হয়, এটাই তো ঈদের আনন্দ।

এলাকার এলিমেন্টারি স্কুল পার হয়ে একটা মসজিদ, পাশের পার্কের পুরো মাঠ নেয়া হয়েছে আজকের স্পেশ্যাল জমায়েতের জন্যে। রাস্তার মুখে বেরিক্যাড দিয়ে বন্ধ রাখা যাতে করে শুধুমাত্র নামাজীরা ঢুকতে পারে। পাশেই অনেকগুলো আইস্ক্রীমের গাড়ী দাঁড়ানো, বাচ্চাদের জন্যে ফ্রী। অনেকে আবার ক্যান্ডি-বেলুন নিয়ে বসে আছে, হাতে ঈদ শুভেচ্ছার প্ল্যাকার্ড। ছেলেদের নামাজের ব্যাবস্থা হয়েছে মসজিদ বিল্ডিঙয়ের নীচতলায়, আর মেয়েরা সব উপরে। নীলা ছেলেদুটোর হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,যাও তোমরা, মোনাজাত শেষে ঠিক এই চেরী গাছটার নীচে এসে দাঁড়াবে। আমি এখানেই অপেক্ষায় থাকবো, বুঝলে? তারপর আইসক্রিম খাবো।
মাথা নেড়ে ওরা চলে গেল, কিছুক্ষন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে পেভমেন্ট ভিজে আছে। ঝরে যাওয়া ফুলের গোলাপী পাপড়ি ছড়িয়ে আছে ঘাসের উপরে। নীলা ভাবছিলো মনে মনে, একসাথে বাবা এবং মা হয়ে ওঠাটা ভীষণ কঠিন। তবুও তাকে পারতে হবে, অন্তত সন্তানদের হাসি ফোটানোর জন্যে পারতেই হবে।


'পরমার পরম পাওয়া '

পরমার মুখে বিশ্বজয়ীর হাসি। চাঁদের হাসি যেন আজ বাঁধ ভেঙেছে। কয়েক বছর আগের পরমার সাথে আজকের পরমার যেন কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মপ্রত্যয়ী পরমা গভীর আবেগে তার গ্রাজুয়েশন সার্টিফিকেট গ্রহণ করল।

কয়েক বছর আগেও এই পরমার জীবনটা অন্যরকম ছিল। সামনে ছিল এক অন্ধকার অনিশ্চিত পথ। সে অনিশ্চিত পথের শেষ হবে এমন বিজয়ের হাসি দিয়ে তা হয়তো কেউ কল্পনা করেনি। মাত্র ২২ বছর বয়সে পরমা আমেরিকা এসেছিল স্বামীর সাথে। স্বামী বয়সে অপেক্ষকৃত বড়। কিন্তু বিদেশে ছেলে থাকে এটা শুনলে সব বাবা-মার যেরকম সাইকোলজিক্যাল একটা পরিবর্তন আসে পরমার বাবা-মাও এর থেকে ভিন্ন কিছু নয়। পারমা লেখাপড়ায় অনেক ভালো। আমেরিকার কথা শুনে তার মন নেচে উঠলো। ভাবলো আমেরিকায় গিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে ,বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।

যথা সময়ে আমেরিকা চলে আসে পরমা। আমেরিকা আসার পরে খুব খুব তাড়াতাড়িই সে বুঝতে পারে কল্পণা আর বাস্তবতা যেন যোজন যোজন দূরে। স্বামী উচ্চ শিক্ষিত হলেও কাজ করে একটা পিৎজ্জ্বা সপে। সকালে যায় কাজে ফিরে আসে মধ্যরাতে। সামাজিকতা তার ভেতর নেই বললেই চলে। পারমা তার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মেলামেশা করতে চায় কিন্তু বাধ সাধে ওর স্বামী। শুধু তাই না স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোথাও যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফোনে কথা বলার উপরও জারি করে নিষেধ । পরমা কলেজে ভর্তি হতে চায় কিন্তু স্বামীর প্রচন্ড অনীহা তাতে। পরমা অনেকটাই হতাশ হয়ে যায়। কাজ করতে চায়। সেখানেও অনেক রকম নিষেধাজ্ঞা। সব নিষেধাজ্ঞা মেনে পরমা কাজে যায়। ওকে বলা হয় একটা টাকাও তার ইনকাম থেকে খেয়াল খুশি মতো খরচ করতে পারবে না। সবকিছু মেনে পরমা ঘরের কাছেই একটা পার্লারে কাজ করে। শুধু আর্জি জানায় তাকে যেনো একটু কলেজে যেতে দেয়। অনেক বাধা পেরিয়ে পরমা কলেজে ভর্তি হয় কিন্তু কন্টিনিউ করতে পারে না। স্বামীর নিত্যদিনের নানা রকম তালবাহানা ,মানসিক অত্যাচার, শারীরিক অত্যাচার পরমাকে চরম অনিশ্চিত এক জীবনে নিপতিত করে।

২২ বছরের একটা মেয়ের জীবনে বয়স্ক স্বামীর এমন অত্যাচার অসহনীয় হয়ে ওঠে। একটা সময় ভিতর থাকা মনটা বিদ্রোহ করে ওঠে। পরমা পুলিশের কাছে যায়, পরমা ল’ইয়ারের কাছে যায়। সবাই তাকে সাহায্য করে। একপর্যায়ে সাহস সঞ্চয় করে পরমা তার স্বামীকে ডিভোর্স দেয়।

এরপর পরমা আর পিছনে ফিরে তাকায়নি। নিজের শক্তিটুকু হাতে নিয়ে, মনের শক্তিটা বুকে নিয়ে সে কাজ এবং পড়া একসাথে চালিয়ে যায়। অবশেষে সেই সোনার হরিণ পরমার হাতে ধরা দেয়। আজ পরমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে। নিউইয়র্ক এর বুকে এক সাহসী মেয়ের এগিয়ে চলার ইতিহাস রচিত হলো। পরমার পরম সৌন্দর্য আজ চোখে মুখে ঝরছে। গ্রাজুয়েশন এর সার্টিফিকেট হাতে মাথায় গ্রাজুয়েশন টুপি, এ এক অপূর্ব দৃশ্য।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন