https://www.prothomalony.com/
5648
literature
ম্যানহাটন
কাজী জহিরুল ইসলাম
স্ট্রিটগুলো জলে ভাসা কুমিরের দাঁত
এভিনিউগুলো কিছু ভয়াল করাত
শহরটা আঁড়ে-ঠারে ফালি ফালি কাটা
রেল, বাস, মানুষের একসাথে হাঁটা।
পাতালের অজগর হিস করে আসে
প্লাটফর্ম পেয়ে গেলে হঠাৎ সে ভাসে
বক্ষের ঢাকনাটা খুলে দিয়ে ডাকে
মানুষেরা তার বুকে ঢোকে ঝাঁকে ঝাঁকে।
কেউ শাদা কেউ কালো শ্যামলাও আছে
সকলেই পাশাপাশি, বসে কাছে কাছে
কারো নাক বোঁচা কারো খুব বেশি খাড়া
সংসারী, কর্মঠ, কেউ গৃহহারা।
সোনা-রঙ চুল যার নীল দুটি চোখ
বিরক্তি মুখে তার রাজ্যের শোক
উঁচু জাত দৃষ্টিতে, কুঞ্চিত নাক
অন্যরা যেন ঘাস, তৃণ, ছত্রাক।
নানা জাত ধর্ম ও কৃষ্টির বাস
শান্তি ও বিভেদের কত ইতিহাস
এ-শহর প্রতিদিন লিখে রেখে যায়
ভোরে সুখ, দুঃখটা আসে সন্ধ্যায়।
দৃশ্যহীন ফ্রেম ও গান্ধর্ব বিধান
কাকন রেজা
দৃশ্যহীন এক ফ্রেম, একটা রাত
এবং সংঘাত
জেগে থাকে
শরীর রমণের সে বিষ ধরে রাখে।
গান্ধর্ব বিধান, অদৃশ্য কালিতে লিখে
ভালোবাসা প্রেম ছিলো না জৈবিকে
শুধু নেশা ছিলো ঢুলুঢুলু রাতে
দৃশ্যহীন ফ্রেম ধরে রাখে প্রেম, ছবির সাথে সংঘাতে।
জানি সে রাতের স্মৃতি নেই, অন্ধকার বলে
খসেনি সে ভুল তারা, উল্কাপাতও হয়নি কোনো ছলে
খানিক জ্বলেছিলো একটা ফানুস কোনমতে
ফ্রেমটাই দৃশ্যমান, দৃশ্যে সে অদৃশ্য আঁধারের সঙ্গতে।
গান্ধর্ব বিধানে এমনি হয়, শূন্যতা থাকে ফ্রেমে
রমণের স্মৃতি থাকে, বিস্মৃতি জুড়ে থাকে প্রেমে
এবং সংঘাত জেগে থাকে
মগজ বিষের প্রাবল্য সাকুল্যে পুষে রাখে।
জন্মান্তর
অনির্বাণ চৌধুরী
আমি প্রশ্ন করলাম, তুমি উত্তর দিলে
যে উত্তর এলো প্রায়এক মাস দশ দিন পর
এতদিন আমি চুপ করে টেবিলের ওপর মাথা রেখে,
এক মনে ভেবে চলেছিলাম
এরপর তোমার জন্য আর কোন কোন প্রশ্ন যত্ন করে তুলে রাখব?
তবুও সবশেষে উত্তর এলো
প্রশ্নবাণ, স্বীকারোক্তি, সত্যি-মিথ্যে
এসবের অনেক আগেই
তুমুল ঝড়ের মত
প্রায় এক মাস দশ দিন পর।
তুমি যখন অতি সাবধানে বেছে নিলে তোমার পথ,
আমিও চলে গেলাম আরেক পথে।
ছোটো বইমেলা
শাম্ স চৌধুরী রুশো
এই লোকজন
খোশ খোশ মন
খিল খিল খিল
হাসছে,
এই সমাগম
দম দমাদম
সাঁই সাঁই সাঁই
ভাসছে।
কী যে কোলাহল
নাই দোলাচল
হই হই হই
হল্লা,
বলো দেখি ওরে
কই চলো ঘোরে
থপ থপ থপ
চল্লা?
খোঁজো নাকি বই?
সাথে নিয়ে সই
হাতে দেখি এক
ফদ্দ,
যায় বয়ে বেলা
ছোটো বইমেলা
মিলবে গদ্য
পদ্য।
লবণাক্ত পানির জীবন
রহিত ঘোষাল
গায়ে মাটি মুখে এক গাল হাসি
উঠে আসি উঠে আসি
আমরা মাঠ থেকে
নদীঘাট থেকে-অবগাহনে
গ্রীষ্মের বিশৃঙ্খলায় পোনাধরা নৌকায়
হাজার কথার পরেও তার কথা কেউ বলে না।
অনর্গল অন্তমিলে বেলেডাঙ্গার আলু,
ধুমঘাটের পুঁইশাক,অন্ধকার অথৈ পানির ওপারে
অল্প কিছু আলো ভেসে বেড়ায়,
এঁকেবেঁকে সপ্তমীর চাঁদ এক পশলা বৃষ্টির পর
আদিম মরা কটালের স্ফীতি নিয়ে এখন লজ্জারুণ।
অর্জন
লুনা রাহনুমা
আর কিছু না,
শুধু নিরুত্তাপের আঘাতে জর্জরিত হতেই
তোমার কাছে ফিরি।
আর কেউ নয়,
শুধু তুমিই জানো অবহেলায় মুখ ফিরিয়ে থাকতে,
তিরস্কারের তির বুকে বিদ্ধ করতে।
আর কিছু না হোক,
তবু নির্যাতিত মৃত্যুর জন্য একটি বধ্যভূমি আছো তুমি,
আমার এইটুকু অর্জন অক্ষয় থাকুক চিরকাল।
আমরা
অজিত রায় ভজন
একদিন দু'জনে চলে যাই দূরে,
কত পথ পেরিয়ে দূরদেশ ঘুরে।
সবুজের বনে আর নদীর ধারে,
দেই ছুট বালুকায় রূপালী পাড়ে।
হাওয়াতে তোমার চুল উড়ায় নিতো,
নদীজল দুই পা ভিজিয়ে দিতো।
পূর্ণ চাঁদের আলোয় আমরা বসে,
হায় নিশি হতো ভোর হিসেব কষে।
খোলা মাঠ প্রান্তরে আকাশ তলে,
বনফুল মালা দেই তোমার গলে।
কতদিন এমনি কেটে যায় চলে,
স্মৃতি এসে আজ সেই কথা বলে।
শেষমেশ স্মৃতিঘর পাশটাতে এসে,
দুজনেই দাঁড়াই যে একটু হেসে।
উপেক্ষা এবং প্রতীক্ষা
গোলাম রববানী
০১.
তোমরা ছুড়ে দিলে অবহেলার বেগে
লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে ধূলোতে
আদর দিলো ভূমি পরম সযতনে
মনে পড়ে মুখটি ও পাথর একটি
০২.
চোখ বন্ধ রাখি বোধের ঘরবাড়ি দ্রুত ঝরে পড়ে
নামছে কী প্রলয়?
ঘুমিয়ে গেছে কাল মধ্যে ঝরা ফুল
নিরবে তুলে রাখি ধৃতি হবে সাক্ষী
অন্ধ কানামাছি; খেলছো কেন বুঝি-হয়তো ফুলকুঁড়ি
ফুটবে ফুলপরি।
যখন বেলা হবে চৈতালি সূর্যে
পুড়ে যাবে বরফ; নুড়ি মণি হাসবে।
চুরির দায়
সুচন্দ্রা মুখার্জী
সুরমা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাপের বাড়ি গেছে তাই অখিলেশের খাওয়া দাওয়ার বেশ অসুবিধা হচ্ছে। পরিচারিকা মোক্ষদা মাসী একজন রান্নার মেয়ে বহাল করলো।ফুলি গরীব ঘরের মেয়ে; অচিরেই সংসারের হাল ধরলো। হাতের রান্না সুস্বাদু আর মুখরোচক।
অখিলেশ যত না রান্না খেয়ে পরিতৃপ্ত তার চেয়ে বেশি ষোড়শী কন্যার রূপ দেখে মুগ্ধ।
ডাগর পদ্মচোখে মায়া জড়ানো আবেশ; একঢাল মেঘের রাশি চুল; নিটোল স্তন; ঠোঁট দুটো ডালিমের মত টুকটুকে লাল। যন্ত্রণায় দারিদ্র্যর লালিত্য; আর চোখে অদ্ভুত আকুতি।উত্তপ্ত গ্রীবায় টকটকে শিহরণ!
অখিলেশ আকৃষ্ট হলো রাঁধুনীর প্রতি। মোচার ঘণ্ট; লাউ চিংড়ি; শাক শুক্তো রেঁধে বাবুর মন জিতে নিয়েছে।
অখিলেশ অবসর সময় পিয়ানোতে সুর বাজায় তার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে শোনা যায় হাতা-খুন্তির আওয়াজ আর ফুলির হাতের চুড়ির রিনিঝিনি!
কিন্তু সব ভালোর তো একটা মন্দ দিক থাকে। ফুলি রান্নার সময় এটা ওটা সরায় আর ওর চুরি মোক্ষদার তীক্ষ্ণ শকুনির চোখ কে ফাঁকি দিতে পারেনা।তেল, হলুদ, নুন, চিনি, মশলাপাতি সব কৌটো ভরে পাচার করে। অভাবের সংসারে কাজে লাগে চুরি করা খাবার-দাবার। অখিলেশ দেখেও দেখেনা। কেমন যেন উদাসীন থাকে।চুরি এবার মাত্রা ছাড়ায়। অবশ্য টাকাকড়ি বা দামি জিনিসে হাত দেয় না ফুলি।
একদিন অবেলায় অগোছালো রান্নাঘরে আনমনা মন ছুটে যায়। অখিলেশ হাতেনাতে ধরে ফেলে ফুলিকে। খপ করে ওর কচি কোমল হাতটা সজোরে চেপে ধরে।গুরুগম্ভীর স্বরে বলে, তুমি ধরা পড়েছ ফুলি। কী কী চুরি করেছ?
ফুলি কেঁদে আকুল হয়ে বাবুর পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, ক্ষমা করে দিন বাবু। আমাকে বের করে দেবেন না দয়া করে। যা যা চুরি করেছি সব ফিরিয়ে দেব।আমার মাইনে থেকেই কেটে নেবেন টাকা....আর আমি কিচ্ছুটি চুরি করব না।
অখিলেশ সংযম হারিয়ে ফেলে। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে!
তার চেয়ে ও বড় জিনিস চুরি করেছ ফুলি! আমার মন যে চুরি করলে তার কি হবে? তুমি এমন ঘুঘু যে ফাঁদ দেখনি।
নিমেষেই ষোড়শী কন্যার যৌবন চুষে-শুষে তাকে বিবস্ত্র করলো অখিলেশ। চুমুর আগুনে পুড়ে গেল কোমল রাঙা ঠোঁট দুটো।কামুক পুরুষের বাসনার আগুন জ্বালিয়ে দিল ফুলিকে।
অখিলেশ নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। ইচ্ছে করে দুপুরের রোদটা চুরি করে হিজল জারুলের নিচে শান্ত দীঘির কোলে ফুলিকে নিয়ে সময় কাটাতে। দুধেলা জ্যোৎস্নার
আলোয় ফুলির সঙ্গ উপভোগ করতে করতে বাসনার আগুনে পুড়ে যেতে। এ আগুন তো নেভে না। সর্বনাশা আগুন ফুলিকে পোড়ায় শরীরের ভাঁজে ভাঁজে।
ফুলির কুমারীত্ব হরণ করে অখিলেশ বন্য পিশাচের মত হেসে উঠলো। চুরির যোগ্য সাজা হয়েছে।
বর্ষার জলভরা মেঘ যেমন কাঁদায় আর সেই কান্নাজলে বুক ভেসে যায় তেমনি সূর্যর গনগনে আঁচে শরীরটা ঝলসে যায়।
ফুলির জীবনের গল্পটা শেষ অনুচ্ছেদে এসে থমকে গেল। এ কেমন চুরির সাজা! এই দহনের পোড়া গন্ধে জীবনে যে চিতাভস্মের ছাই ওড়ে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন