https://www.prothomalony.com/
5566
literature
একটি ডাঁশ মাছি এবং আমি
জাকিয়া শিমু
আমি দেশের একটি প্রধান দৈনিকের বার্তা সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলাম লেখক। এমুহূর্তে সরকার-সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারাবাহিক কলাম লিখছি। কিন্তু গতকালের পত্রিকায় যে পর্বটি অবধারিত ছিল তা আজঅবধি শুরুই করতে পারিনি। একটি মাছি ! সামান্য একটি মাছির যন্ত্রণায় আমার কলম চলছে না। ব্যাপারটা হাস্যকর তো বটেই কিন্তু ঘটনা সত্য !
আমি আকাশের গা-ঘেঁষা একুশতলার উপর একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে বাস করি। গত দু’বছর আগে সরকারের বিশেষ প্রীতিভাজন হিসেবে আমি এটি উপঢৌকনস্বরূপ পাই। আমার এলাকাটি সরকারের বিশেষশ্রেনির বাসভূমি বিধায় এখানে মশা মাছি তো দূরে থাক একটা পিঁপড়া খুঁজে পাওয়া মুশকিলের কথা। সেখানে এমন একটা ডাঁশ মাছি কোথা থেকে উদয় হলো ভাবনার বিষয় বটে ! শুধুমাত্র এই একটিই মাছি, তাও ঠিক লিখতে বসলে এসে হাজির হয়। আমি যখন কলামটি নিয়ে লিখতে বসি, মাছি আমার পাওয়ার চশমার ভিতর ঢুকে চোখের উপর বসে থাকে। আমার মনোযোগ কেড়েই ক্ষান্ত হয় না এর যন্ত্রণায় আমি একসময় লেখারটেবিল থেকে লাফিয়ে উঠে চলে আসতে বাধ্য হই। এবং তখন তাকে আর খুঁজে পাই না, সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কী আজব ব্যাপার ! কিন্তু রিপোর্টটি যে করেই হউক আজকে প্রেসে দিতেই হবে।
সরকারের গোয়েন্দা বিভাগসহ অন্যান্য সোর্সের সমস্ত প্রমানাদি আমার কাছে রয়েছে। আমার কাজ- এসব প্রমানিত-সত্যকে পাশকাটিয়ে একটি কপাট-মিথ্যা এবং সর্বাগ্রগণ্য রিপোর্ট দাড় করানো। কলামটি পড়ে যাতে সরকার-সমর্থ জনমত তৈরি হয় এবং আদালতে কেস-টির মোড় ঘুরিয়ে দিতে বিশেষ সুবিধা হয়। আমি অবশ্য একাজে যথেষ্ট পারঙ্গম।
এপর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে বেশকিছু সিরিয়াস ইস্যু নিয়ে আমার লেখালেখি তার যথার্থ প্রমান রেখেছে। এজন্য অবশ্য সরকার থেকে আমি এবং আমার পত্রিকা একটু বেশিই পেয়েছি। আমি দো-কামরার ভাড়া বাসা থেকে একলহমায় এমন বিলাসবহুল অট্টালিকায় উঠে এসেছি। ঝকমকে টয়োটা ক্যামরি আমাকে বাস-রিকশার ঝক্কি-ঝামেলা থেকে সেই কবেই রেহাই দিয়েছে। এসব বিবেচনায় রেখে কলামটি যে আজকের মধ্যে প্রেসে যেতে হবে কিন্তু বাধা একটাই, ওই সেই মাছি!
আমার ধারাবাহিক কলামটি এমুহূর্তে টলায়মান সরকারের জন্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামনে ইলেকশন, এমন একটা অন্তিম-সময়ে এমন উটকো ঝামেলা সরকারের ভাবমূর্তির জন্যে অত্যন্ত বিব্রতকর। ওদিকে এই ইস্যুতে বিরোধীপক্ষ রাস্তায় নেমেছে। দেশের সচেতন সমাজ এবং নারীবাদীরাও তাদের সাথে দেদারসে হাত মিলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমেও গা এলিয়ে বসে নেই, বিষয়টি বেশ গুরুত্ব নিয়ে প্রচার করছে। এবং দেশের সাধারণ জনগণ এমন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রতিদিনের আপডেটে নজর রাখছে।
বিষয়ের মূলহোতা অবশ্য সরকারের বিশেষ তাঁবেদার, মবিন চৌধুরী। মবিন চৌধুরী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সরকারি দলীয় সাংসদ। মবিন চৌধুরীর স্ত্রী তার বাসার অন্তঃসত্ত্বা গৃহপরিচালিকাকে কৌশলে হত্যা করেছেন। আমার কাছে যেসব রিপোর্ট আছে তাতে অবশ্য দায়ী বিশিষ্ট ভদ্রবেশী মবিন চৌধুরী। মেয়েটির সাথে তিনি অনৈতিক কাজ নিয়মিত করতেন যদিও তাদের ড্রাইভারকে ফাঁসানোর প্রমানাদি কোর্টে দাখিল করা হয়েছে। আমার লেখা কলামও ড্রাইভারকে ফাঁসানোর পক্ষেই বলছে !
আমার ধারাবাহিক কলামটি গত দু’দিন প্রকাশ না হতে বিপক্ষদল এটাকে তাদের পক্ষে বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে প্রচার করছে। অবধারিতভাবে সরকারের উঁচুস্তর হতে অনবরত ফোন পেতে থাকি। তারা আমার নীরব অবস্থানে ভিন্নসুত্র খুঁজতে গোয়েন্দা বিভাগের সহযোগিতা নিয়েছে। এবং সে-বিভাগের লোকবল দিবারাত্র আমার বাসার চারিপাশে ঘুরঘুর করছে। চব্বিশঘণ্টার মধ্যে পত্রিকায় কলাম দিতে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর পরিণতি নতুন করে আমার স্মরণে দিয়েছে। অবশ্য আমি তাদের কাছে যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ দেখাতে পারি নাই যদিও এদের নৃশংসতা আমার কাছে অজানিত নয়।
এমন একটা অস্থির পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে আমি লেখাটা শেষ করতে মরিয়া হয়ে ওঠি কিন্তু মাছিটির অত্যাচারে তা সম্ভব হয় না। অপেক্ষা করি। শুশুকের পিঠে ভর করে রাত্রি আসে এবং তা গভীর হয়, নিজেকে গুছিয়ে আনি। ঘর নিছিদ্র করে কাগজপত্র মেলে কলামটি আবার লিখতে বসে যাই। আমার হাতে সময় আছে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা ! যে করেই হউক বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে লেখাটি দাড় করাতেই হবে।
যেই লেখাটি শুরু করেছি, ভনভন আওয়াজে কোথা থেকে উড়ে এসে মাছিটি আমার কপালের ওপর বসল। আমি কঠিনভাবে আমার কপালে হাত দিয়ে আঘাত করে একে পিষে মারতে উদ্ধত হলে তা হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। হাতের কাছে একটি ইলেকট্রিক ব্যাট যোগার করে রেখেছি। সেটা দিয়েও কোনভাবেই একে শায়েস্তা করতে পারি না। এভাবে বেশ কতক্ষণের ছুটোছুটিতে আমি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ি হয়তো মাছিটিও। সেটা একসময় দেয়ালের গায়ে আরাম করে বসে থাকে। আমি এ-সুযোগে মাছিটির ওপর আলগোছে ব্যাটটি রাখতে তা ইলেকটিক শকে মারা পড়ে।
মাছিটি খুন করার সাথে সাথে আমার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়। আমার চোখজোড়া পলাশফুলের মতো লাল টকটকে হয়ে ফুলে ওঠে। একসময় বিছানায় বেহুঁশ হয়ে শুয়ে পড়ি। ব্যথা ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আমি অতিরিক্ত ডোজের ব্যথার ওষুধ খেয়ে তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়ে থাকি। কিন্তু চোখ বন্ধ হতে আমি মাছিটিকে আবার দেখতে পাই। এবার সে আমার মস্তিষ্কের খোঁদলে জায়গা করে নিয়েছে।
মাছিটি আমার চোখের সামনে তেঁতুলবীচির মতো অসম চৌকোণা কতোগুলো চোখ নিয়ে ভনভন আওয়াজে উড়ছে। চোখগুলো অশরীরী, আমাকে ভয়ঙ্কর ভয় ধরিয়ে দেয়। সবপ্নের ভেতর আমি চিৎকার করে লাফিয়ে বিছানায় ওঠে বসি। কিন্তু কিছুতেই মন থেকে সেই বীভৎস চোখগুলোকে সরাতে পারি না। আমি ঘুমের ওষুধ নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি কিন্তু ঘুম হয় না। বুঝতে পারি বদ্ধউন্মাদ হয়ে যাচ্ছি।
এরপর সামান্য হলেও নিজের মধ্যে ফিরতে শুরু করি। মাথাটা বেশ হালকা-বোধ হয়, চিন্তা-চেতন ধীরে হলেও ফিরতে শুরু করে। শরীরজুড়ে ব্যাথার সেই প্রলয়ের নিস্তার মিলেছে তা টের পাই। চুপচাপ বিছানায় বসে আমার সাথে ঘটে যাওয়া পুরো-বিষয়ে নতুন করে চোখ ফিরাই। এবং নিজেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আবিষ্কার করি।
বিছানা ছেড়ে ধীরেপায়ে লেখার টেবিলে এসে বসি। টেবিলে আমার ল্যাপটপের কী-গুলো বুড়িয়ে যাওয়া লাউয়ের বীচির মতো চোখ উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার হাত আলগোছে কিবোর্ড ছুঁয়ে গেলে,দ্রুতলয়ে তা বৈশাখী প্রলয়ের মতো ছুটতে শুরু করে। মনে হয় যেন আমার হাতে অদৃশ্যের কোন শক্তি ভর করেছে। খুব অল্প সময়ে আমি আমার জীবনে প্রথম একটি সত্যকলাম লিখে শেষ করি। পূর্বের কলামগুলোর সমস্ত তথ্যাদি কপাট মিথ্যে ! কীভাবে এবং কাদের প্ররোচনায় সেসব আমি কৌশলে বিশ্বাসযোগ্য করে সাজিয়ে ছিলাম সেসবের বিস্তারিত লিখে আরও একটি কলাম শেষ করি।
ততক্ষণে প্রকৃতিতে ভোরের লঘু-আঁধার কেটে দিবসের অস্পষ্ট আলো ফুটতে শুরু করেছে।
আমি সবেমাত্র লেখা কলাম দু’টো সন্মূখে ভয়ঙ্কর পরিণতি জেনেও তড়িঘড়ি করে আমার পত্রিকাসহ দেশের প্রায় সকল পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিলাম।
লালু
রফিকুল নাজিম
লালু শুয়ে আছে মাটিতে। চারদিকে মানুষের জটলা। সবাই মনোযোগ দিয়ে লালুকে দেখছে। কী নাদুস-নুদুস! ক'মাস আগেও লালু এতোটা স্বাস্থ্যবান ছিল না। লালুকে একনজর দেখতে লোকজন ছুটে আসছে রইছ উদ্দিনের বাড়িতে। কেউ লাইভ করছে। কেউ টিকটক। কোনো কোনো চ্যানেলের সাংবাদিক তো লাইভ সম্প্রচার করছে। লালুর সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। রইছ উদ্দিন সাক্ষাৎকার দিতে দিতে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। শরীর ও মুখ আর চলছে না। ঘরের দাওয়ায় বসে মাটিতে আঁকিবুঁকি করছে রইছ। রইছের বউ গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে আসমানের দিকে। চোখে তার খাঁ খাঁ শূন্যতা
লালুর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আছিয়া। লালুর খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুর সঙ্গী এই আছিয়া। আছিয়াকে দেখলেই লালুর অস্থিরতা বেড়ে যায়। আছিয়া লালুর কাছে আসলে লালু মুখ বাড়িয়ে দেয়। আছিয়ার আদর পেলে সে দু-চোখ বুজে রাখে। আজ থেকে লালুকে আর সে আদর করতে পারবে না। আছিয়া মরার বিলাপ করছে। লালুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আছিয়ার কান্না দেখছে উপস্থিত জনতা। লালুর জন্য আছিয়ার কান্না দেখে কারো কারো চোখে নোনা জলের ঢেউ ওঠছে। আহা রে অবলা প্রাণী! নিজে তো মরলো, রইছকেও মেরে গেল।
আগামী পরশু ঈদ। তিনদিন আগে লালুকে দেখে আরিফ জোয়ার্দারের মনে ধরেছে। তাই সে লালুর দাম নিয়েও খুব একটা দরকষাকষি করেননি। লালুর গায়ের রঙ দারুণ। লাল আর কালোর মিশেল। যেন তেলে মাখা শরীর। হাত দিয়ে ধরতে গেলে হাত পিছলে যায়। সত্তর হাজার টাকায় রফাদফা হয় লালুর। পঞ্চাশ হাজার টাকা রইছের হাতে দিয়ে জোয়ার্দার সাহেব বলেছিলেন, 'রইছ, তোমার বাকি বিশ হাজার টাকা লালুকে নেয়ার দিন পরিশোধ করবো। তবে একটা কথা - 'রইছ, লালুকে তোমার কাছেই রাখতে হবে। আমি ঈদের আগেরদিন বিকেলে এসে নিয়ে যামু। ঠিক আছে?'
রইছ মনে মনে দারুণ খুশি। প্রস্তাবটা শুনে আছিয়া সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। আরো কয়েকদিন সে লালুকে কাছে পাবে। আদর করতে পারবে। দেখভাল করতে পারবে। লালুর গলা জড়িয়ে ধরে থাকতে পারবে। খুশিতে টগবগ করা ঘোড়ার মত আউলা ঝাউলা ওড়ছে আছিয়ার মন। অথচ কিছুক্ষণ আগেও সে লালুর জন্য মরার বিলাপ করছিলো। লালুও এখন হাম্বা হাম্বা ডাকছে। আছিয়াকে মনে হয় কাছে ডাকছে। অথচ কয়েক মুহূর্ত আগেও লালু নির্লিপ্ত মনে দাঁড়িয়ে ছিল জামগাছতলায়। কোনো ডাকাডাকি করেনি। চোখের কোণ চুইয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে। সে জল মায়ার। সেই জল ভালোবাসার।
জামগাছে নিচে এসে থামে আরিফ জোয়ার্দার। তিনি মৃত লালুর দিকে তাকিয়ে আছেন। কী যেন ভাবছেন! জোয়ার্দারকে দেখে রইছ ঘরের দাওয়া থেকে ওঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে জোয়ার্দারের সামনে এসে দাঁড়ায়। সালাম করে। রইছ দু'হাত কচলাতে থাকে। আমতা আমতা করতে থাকে।
লুঙ্গির কোঁচড় থেকে টাকার বাণ্ডিল বের করে। রইছ জোয়ার্দারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে
- হুজুর, এই নেন এইখানে তেতাল্লিশ হাজার ট্যাহা আছে। বাহি সাত হাজার ট্যাহা আমি খরচ কইরালাইছি। আমি বুঝতে পারি নাই হুজুর- লালু যে আমারে গাঙের জলে ভাসাইয়া চইলা যাইবো!
রাগে লাল হয়ে গেছে জোয়ার্দারের চোখমুখ। আগুনের ফুলকি ছুটছে চোখের তারায়। জোয়ার্দারের চোখের দিকে তাকিয়ে রহিছের কলিজার পানি উধাও হয়ে গেছে। তার গলা ধরে আসে। জলোচ্ছ্বাসের আগে নদীর জলের উপরিভাগ যেমন টলটলা শান্ত থাকে, ঠিক তেমন করে শান্ত হয়ে গেছে রহিছ। যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে বুনো জলোচ্ছ্বাস। লণ্ডভণ্ড করে দিতে মায়ার জমিন, সোনালী শস্য এবং সঞ্চিত গোলার ধান। জোয়ার্দারের কণ্ঠে
আগুনের গোলা। বারুদের মত ফুটছে। উপস্থিত গ্রামবাসী সবাই সেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস ঠিকঠাক বুঝতে পারছে বলে মনে হয়। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছে- আজ রহিছের কোনো রক্ষে নাই। জোয়ার্দারের ট্যাহা খরচ কইরা ফেলা চাট্টিখানি কথা না।
কিছুটা নীরবতা ভেঙে জোয়ার্দার হুংকার ছাড়ে...
- রহিছ, বাকি ট্যাকা দিয়া তুই কী করছোত? আমারে খুইল্লা ক দেহি।
- হুজুর গো, আমি ভাবছিলাম- লালু মনে হয় আমারে ঋণ থেইকা মুক্তি দিয়া গেছে। না গো, হুজুর, লালু আমারে গাঙে ভাসাইয়া দিয়া গেছে।
- সাত হাজার ট্যাহার তুই কী করছোত- আগে এই কথা ক। ইতিহাস শোনার সময় নাই আমার।
- হুজুর, তুলশিপুর বাজারের বিনয় পালের দোকানের বাকির পাঁচ হাজার সাতশ ট্যাহা দিছি। লালুর লাইগ্যা খইল ভূষি আনছিলাম। আর বাকি ট্যাহা দিয়া ঈদের বাজার সদাই করছি। একটা ফারোমের মুরগি, এক প্যাকেট সেমাইও কিনছি। হুজুর, আরেকটা কাম করছি- মাইয়াডার লাইগ্যা একটা লাল জামা কিনছি। হুজুর মাইয়াডারে যে কথা দিছিলাম! হুজুর গো আমারে আপনে মাফ কইরা দেন। দয়া কইরা একটু সময় দেন- আমি আপনের ট্যাহা শোধ কইরা দিমু।
কটমট করছে জোয়ার্দার দাঁত। রহিছের দিকে দ্রুত পায়ে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে যায় জোয়ার্দার। রহিছকে জড়িয়ে ধরে। উপস্থিত সবাই অবাক। জোয়ার্দার কী করছে এসব!
- তুই আমার এই চিনলি রে, রহিছ! আমি এত্তো খারাপ মানুষ। লালু রে ত আমি কিনছি কুরবানির লাইগ্যা। আল্লাহ আমার নিয়ত জানে। কুরবানি নিশ্চয়ই আল্লাহ কবুল করছেন- তাই লালুর এই পরিণতি। এই নে বকেয়া বিশ হাজার টেকা। রাখ ত। ঋণ পরিশোধ কর আগে। তবে একটা শর্ত আছে- আগামী কুরবানির গরুটা কিন্তু তুই আমাকে দিবি। বল।
রহিছের চোখ থেকে টলটল করে জল পড়ছে। আছিয়া ও তার মা জড়াজড়ি করে কাঁদছে। জোয়ার্দারকে পুরো গ্রামবাসী যে রূপে দেখে অভ্যস্ত, আজ তার ঠিক বিপরীত রূপ দেখে অবাক। বিচার শালিসে এই জোয়ার্দার হয়ে যায় অন্য মানুষ। কঠোরতর। পাষাণ। কোনো ছাড় দেন না। অথচ আজ জোয়ার্দারের চোখেও জল পড়ছে। চোখের জল মুছতে মুছতে জোয়ার্দার আছিয়াকে ইশারায় ডাকে। আছিয়া তার সামনে আসতেই জোয়ার্দার পাঁচশো টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে বলে- 'আছিয়া, ঈদের দিন সাজুগুজু করার জন্য আলতা লিপস্টিক কিনিছ। আর শোন- এইবার আমরা বেকতে একলগে ঈদ করমু। মনে থাকব? মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় আছিয়া।
জামগাছের পাতার ফাঁক গলে রহিছ উদ্দিনের দু'চোখ শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। যেন কাউকে খুঁজছে। হয়তো কিছু অব্যক্ত কথা বলতে চায় সে....।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন