https://www.prothomalony.com/
5398
literature
একটি স্যুররিয়ালিষ্ট কবিতার মতো
তমিজ উদ্দীন লোদী
দেখো কী অনায়াসে প্রতিবিম্ব কথা বলছে আয়নার ভেতর
পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে
উল্টে যাচ্ছে পলেস্তরা খসা ইট,এপিটাফ থেকে খসে পড়ছে
বাঁধানো অক্ষর। ইচ্ছেমাফিক সাজানো হচ্ছে ইট, মাল্টিষ্টোরেড।
ছড়িয়ে পড়ছে কবরের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস।
জানি না আড়ালে একটি সজল চোখ অশ্রু নামালো কিনা?
বৃষ্টি থেকে উবে গেলো কিনা বাষ্পের কণা
কিংবা একটি দাঁড়কাক উড়ে গেলো কিনা এই ঘোর সন্ধ্যায়?
কোনো বিশ্বাস নয় তবু এক বিষণ্ণ মাদুলি দ্বিধা ও সংস্কারের
মাঝখানে দোলে। শাদাপ্যাঁচা উড়ে যায়।
গমের শিষের মতো মাথা তোলে আহত ঋত্বিক আর
ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে আমার রক্তের সাথে তোমার রক্তের লাল-
গোত্রের আড়াল থেকে নেমে আসে একিভূত শিরার মতন।
পৃথিবী মৃত্যুফাঁদ।
নিধনের খেলা চলে তীব্র ঘৃণা হয়ে
কে ধরবে বলো এখন স্যুররিয়ালিষ্টদের চাঁদ?
যতোই স্মৃতির শরীর জুড়ে আঁচড় কাটুক নিসর্গ, বৈশাখ
কালো কাঁকড়ারা তবু হেঁটে যাবে শিরদাঁড়া বেয়ে।
যতোই মুখোশ খুলুক
উন্নাসিক হেঁটে যাবে, যাবেই তোয়াক্কাহীন নাক উঁচু করে।
প্রাক্কলিত ভ্রম, বিঘ্ন আয়োজন
কাজী আতীক
একবার এক ভরা মরশুম বর্ষায়- ভেবেছিলাম
ঝাপ দেবো মনু গাঙ্গে, জানতে চেয়ে নদীটির
ভেতরকার রূপ রূপান্তর জলের সূক্ষ্ম কারুকাজে,
দেয়া হয়নি- স্রোতের তোড়ে ভেসে যাবার ভয়ে,
আষাঢ় শ্রাবণে মনু ভীষণ খরস্রোতা পাহাড়ি ঢলে।
আরো একবার এক অমাবস্যার রাতে-
গাছতলায় রাত্রিবাসের নেশা চেপেছিলো,
রাতকে গভীর জানতে চেয়ে গাছের অনুভবে,
তাও হয়নি অন্ধকার অদৃশ্যে তলিয়ে যাবার ভয়ে,
আসলে অন্ধকার কেবলই এক একা অনুভব
গা’ ছমছম শিউরে উঠা এক অশরীরী অস্তিত্ব হয়ে,
অথচ সেই আমিই চিরকাল কেবলই এক একাকী অস্তিত্বের
যেমন শরতের খণ্ড মেঘ কিংবা সুতো কাঁটা চরকা-বুড়ী চাঁদে!
দৃশ্যমান স্থবিরতা কিংবা অদৃশ্য আড়ালের স্থিরতা,
এসব কিছুই যাপন পরিভাষাগত এক বিলাস বিভ্রম,
হয়তো কেবল এক বিকল্প কল্প অভিলাষ-
সাম্যতার ধারনা কিংবা অজাতশত্রু বোধ বাসনা যেমন।
আসলে এসবের কিছুই পরিণতি প্রাপ্ত হয়না,
তাই এগুলো শুধুই এক আকাঙ্ক্ষা বিভ্রম, অথবা-
হয়তো কেবলই এক প্রাক্কলিত ভ্রম বিঘ্ন আয়োজন।
পানকৌড়ি
ভজন দত্ত
চুমুতে চমক নেই সকালদুপুর রাত
চারিপাশে শুধু গল্পের উল্লাস
বসে আছে পথপাশে সকল
অগঞ্জিকাসেবী গল্পকথক
তাহাদের গল্পকে মিথ্যে করে আকাশপথে
তোমার কাছে ভুলের ফুল হয়ে আসি রোজ তোমাকেই ঠিকানাহীন সুদীর্ঘ চিঠি লিখি হররোজ, রোজের নরম পাপড়ির নির্যাস স্বপ্নে
সার্পেন্টাইল পথের থানে থানে রাখা মানতের সহস্র সহস্র হাতি-ঘোড়ার চুমু আর চুমু
মিথ্যের গল্প সাঙ্গ হলে তোমার হৃদয়
প্রেমের দীর্ঘকবিতায় পানকৌড়ি।
ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এখন
শেখ জলিল
পৃথিবীটা যখন খুব কাছের ছিলো-
এই ধরো ইন্ডিয়ার সাথে অস্ট্রেলিয়া
কিংবা আফ্রিকার সাথে আমেরিকা;
তখন তোমার আমার সাক্ষাৎ হতো খুব
আমাদের দু'জনার ভাষাটাও ছিলো বোধগম্য
আমরা আমাদের চোখের চাহনি দেখেই
বুঝে নিতাম অগাধ অন্তরের চাওয়া-পাওয়া৷
মাঝখানে সৌরঝড় এসেছে, অগ্নুৎপাত হয়েছে
ভূমিকম্পে তছনছ হয়েছে এই পৃথিবী বারবার
আমাদের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে গেছে সাত-সাতটি মহাদেশে;
আমরা দুই শতাধিক দেশ হাজার হাজার ভাষায় কথা বলি
আমাদের নাওয়া-খাওয়া, চাওয়া-পাওয়া সব বদলিয়েছি অনেকবার৷
পৃথিবীটা এখন খুব দূরের হয়ে গেছে!
যদিও এসেছে টেলিফোন, ইন্টারনেট, দূরদর্শন-
আমরা হারিয়েছি চিঠির ভাষা, ভালোলাগা কথা
হারিয়ে ফেলেছি অপত্য স্নেহের যত অমূল্য বন্ধন
খুব প্রিয় বিষয়গুলো এখন বন্দিত্ব নিয়েছে অন্তর্জালে
আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে লাভসাইন, ইমোতে!
প্রেম
দেওয়ান নাসের রাজা
গোধূলি লগ্নে এসে
তস্ত্র দাঁড়ালে তুমি
গোলাপ বাগানে,
তোমার শাড়িতে ওই
নীল আকাশ মিশেছে।
গোলাপ পাপড়ি এই যুবকের হাতে
যুবকের চোখ প্রেমময়-
আমার দুয়ারে এসো,
সব প্রেম খেলা করে
ভাঙা বেটমের ঘরে।
গোলাপ তুলতে যদি কাঁটা বিঁধে
বাতাসে পালক উড়ে আহত পাখির
হৃদয় বৃষ্টি অবিরল ঝরে,
সুরে টান দিলে তুমি
মাধুরী মিশিয়ে।
কাঁটায় রক্ত ঝরে-আহত ভ্রমর
ঘুম চোখে গান গাও,
আমাকে ভেবে
উতলা বাতাসে বলে।
পরিণীতা রানি
সুমন শামসুদ্দিন
নিকষিত নিরুপমা, রূপসী রূপম;
পূরয়িতা পারিজাত, তু্মি অনুপম।
চিরায়ত অনুসূয়া, অসিতনয়ন;
দিবানিশি ডাকো কাছে, মোহে রূপায়ণ।
ঘাসফুল চেয়ে থাকে, তোমার কপোলে;
কপোলের রাঙাআভা, শোভন-বিভোলে।
প্রিয়ংবদা অহল্যা, হৃদে কর বাস;
রূপংদেহি লাবণ্য, সুমধুর ভাষ।
দিবানিশি ভাসি আমি, মধুরিত সুরে;
অগভীর ঘুমে থাকো, বিনোদিত পূরে।
সুরবিথী কলতানে, সুরভিত মন;
উড়ে চলি দূরদেশে, সুবাসিত ক্ষণ।
সুহাসিনি বাঁধো প্রেমে, লাজুক আকাশ,
পরিণীতা রানি তুমি, মেঘে সহবাস।
ভয়
মান্নান নূর
একলা একলা থাকি,ছারপোকারা বলে,
‘একলা থাকলে প্রেতাত্মারা আসে,
আমি বলি, প্রেতাত্মারা শুধু ভয় দেখায়-
একলা একলা থাকি, ইঁদুরগুলো গর্ত খোঁড়ে
আমার স্থাপনা নড়বড়ে করে তোলে-
আমি বলি, ‘এ-মাটির উমগুলো তোমরা নষ্ট করো না’
একলা একলা থাকি,শঙ্খচিলেরা আজ ভয়ভয় চোখে
উদোম আকাশ থেকে নিরুদ্দেশ-
ত্রাসের রাজত্বে শঙ্খচিলেরা আজ নীলাকাশহীন
একলা একলা থাকি,সবুজ প্রান্তরে গা টা এলিয়ে দেই
বিদ্রোহী ভেবে তারা আমাকে এড়িয়ে যায়-শো’তে দেয় না
আমি শো’লে নাকি সবুজেরা ভিনগ্রহী-
আমাকে বিশ্বাস করে না
একলা একলা থাকি,মাঠের কিনারের বৃক্ষগুলো নতজানু-আগডাল মরা
দূরের হাওর-বিল ধূ ধূ বালুচর-দুধেল গাইগুলো হাড্ডিসার
মানুষদের নাকি এখন তাদের সবচেয়ে বেশি ভয়।
বৃষ্টি দরকার
কুলসুম আক্তার সুমী
বিষণ্ণ মেঘে ঢেকে আছে মনের আকাশ,
বিধ্বস্ত-বিপন্ন-অস্বস্তিকর সময়, কাটছে না…
ঝাঁঝালো গন্ধ যেন অশ্রুভেজা বাতাসে।
কাঠগোলাপের গাছে ভনভন করছে মাছির দল,
মন সরোবর পদ্মকানন বিষ পিঁপড়ের দখলে—
কোন কারণ পাওয়া যাচ্ছে না এ অস্বাভাবিকতার।
পাশ থেকে কেউ বিলিয়ন ডলারের লটারির কথা বলছে,
কেউ পরিচিত কারো পরকীয়ার আলাপ করছে,
কেউ বাচ্চা নিয়ে বিড়ম্বনার সমাধান চাইছে।
কিন্তু কোথাও নেই আমি, কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না—
কেউ কুড়িয়ে দেবে হারিয়ে যাওয়া আমাকে,
খুব দরকার বেহিসেবি চওড়া হাসিটার।
আজ তোমাকে দরকার,
মনের উঠোনে অঝোর বৃষ্টি নামানো দরকার,
দু’হাত ভরা বসন্তের সুবাস দরকার।
কোরবানির গরু
সুমন আহমেদ
জমির আলীর একমাত্র আদরের ছেলে লাবিদ। লাবিদ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। লাবিদের জন্মের কিছুদিন পরই তার মা মারা গেলেন। ছেলের সুখের কথা ভেবে জমির আলী দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। দিন এনে- দিন খাওয়া জমির আলী একমাত্র ছেলেকে উচ্ছশিক্ষা দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে, মাথার গাম পায়ে ফেলে দিনমজুরি করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
কিছুদিন যাবৎ জমির আলী খুব চিন্তিত। এখন আষাঢ় মাস বৃষ্টি বাদলের দিন। ভাঙা ঘরটা যে ঠিক করা দরকার; না হলে অনেক কষ্টে কাটাতে হয় বৃষ্টি বাদলের দিনগুলো। কিছুদিন পরই আসছে আবার ঈদুল আযহা, ঈদে লাবিদকে নতুন জামা কিনে দিতে হবে। নিজে পুরোনো কাপড় পরে প্রতি ঈদে লাবিদকে নতুন জামা কিনে দেন জমির আলী। কিন্তু এ বছর জমির আলীর কাছে এক কানাকড়িও নেই। জমানো টাকা পয়সা যা ছিল তা খরচ হয়ে গেছে ছেলের চিকিৎসায়। হঠাৎ একদিন লাবিদের এপেন্ডিসাইটিস এর ব্যথা উঠলো। তারপর হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকে। জমানো টাকা এবং মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসা করান তিনি। সেই দেনা এখনো শোধ হয়নি। তাছাড়া, দিনমজুরের সেভিংস বলতে আর কি-ই বা থাকে, দুঃচিন্তা ছাড়া।
খুব বেশি ভালোবাসেন ছেলেকে জমির আলী। স্ত্রী মারা যাবার পর থেকে ছেলেকে বুকে আগলে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ছেলেই যে তার শেষ সম্বল। বেঁচে থাকতে চাইলেই কি আর বেঁচে থাকা যায়! যদি ভাগ্য বিধাতা না চান! কত কি-ই তো স্বপ্ন দেখেন জমির আলী ছেলেকে নিয়ে। কে জানে, কপালে কী আছে!
ভাবতে ভাবতে একসময় অবসাদ ছেয়ে গেল তাকে। কোথায় পাবে এতো টাকা! কী করে ভাঙা ঘরটা ঠিক করবেন, আর কী করেই বা ছেলেকে নতুন জামা কিনে দেবেন!
ভাবনার ছেঁদ কাটিয়ে বাবা বাবা বলে ডাকতে শুরু করলো লাবিদ।
বাবা ও-বাবা! আমার বন্ধু তমালদের কোরবানির
গরু এনেছে, মস্ত বড়ো বিশাল এক লাল গরু। বাবা আমাকে এবার নতুন জামা কিনে দিতে হবে না, হাট থেকে তমালদের মতো বিশাল বড়ো একটা লাল গরু কিনে আনবে! এ বছর সবার মতো আমরাও কোরবানি দেবো।
বিশাল আকাশটা যেন ভেঙে পড়লো জমির আলীর মাথায়। কোথায় পাবে এতো টাকা? জমির আলী কোনোদিন তার ছেলের কোনো চাওয়াকেই অপূর্ণ রাখেননি। খেয়ে না খেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এক জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে ছেলের সমস্ত চাওয়া গুলোকে একটু একটু করে পূরণ
করেছেন তিনি। আজ কী করে ছেলের এত বড়ো চাওয়া পূরণ করবেন! একটা নতুন জামা কেনার মুরদ নাই, লাল গরু?
ভাবতে ভাবতে চোখের জলে বুক ভেসে যেতে লাগলো জমির আলীর। দু'হাত তুলে ভাগ্য বিধাতাকে ডেকে বললেন, হে ভাগ্য বিধাতা! তুমিই বলে দাও আমি এখন কি করবো?
আজ কী আমার- মা মরা একমাত্র ছেলের চাওয়া পূরণ করতে পারবো না?
সেদিন জমির আলী ছেলেকে খুশি করতে কথা দিয়েছিলেন, ঈদের দিন সকালে গরু এনে দেবেন। সে অপেক্ষায় লাবিদের সময় যেন পার হচ্ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর- ঈদের দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই লাবিদ তার বাবাকে ডাকতে শুরু করলো!
বাবা ও বাবা! তুমি না গরু আনতে যাবে, কি হলো? উঠো বাবা, তাড়াতাড়ি উঠো! বেলা হয়ে গেলো যে। বাবা ও-বাবা! তুমি এখনো ঘুমাচ্ছো কেন?
লাবিদ ডেকেই যাচ্ছে! জমির আলী কথা বলছে না। এদিকে পাড়া প্রতিবেশি এসে ভির জমালো জমির আলীর উঠোনে। সেদিন আর ঘুম ভাঙেনি জমির আলীর! শেষবারের মতো চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
একমাত্র ছেলেকে কোরবানির গরু কিনে দিতে না পাড়ায় সেদিন মর্মপীড়ায় সারারাত জেগে থেকে কেঁদেছিলেন জমির আলী। তারপর, সে কান্নার অবসান হলো! আর কোনোদিন জমির আলীকে রাত জেগে গরু কিনতে না পারায় কেঁদে বুক ভাসাতে হবে না। আর কোনোদিন ছেলের শখ পূরণ করতে না পারায় মর্মাহত হতে হবে না জমির আলীকে।
ঘুমন্ত অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক করে সমস্ত অভাব অনটনকে অবসর দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন