https://www.prothomalony.com/
4073
decoration
বসন্ত মানেই স্নিগ্ধতা, তারুণ্য, লাবণ্য, আনন্দ। উত্তর আমেরিকা বা আমার প্রাচ্য দেশীয় জন্মভূমি সবখানেই আনন্দ কলতান হয়ে বাজে এই বসন্তে। কবি নজরুল তাই লিখেছেন, “আসে বসন্ত ফুল বনে সাজে বনভূমি সুন্দরী; চরণে পায়েলা রুমুঝুমু মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি।” উত্তর আমেরিকায় বসন্ত শুরু হয় মার্চের ২০ তারিখ থেকে। শীতপ্রধান অঞ্চলের প্রতিটি প্রাণী আর প্রকৃতি উন্মুখ হয়ে থাকে শুকনো গাছে নতুন পাতার কুশি দেখার অপেক্ষায়।
সবুজ ঘাসের দেখা মিলতেই প্রান্তর, উদ্যান, উঠোন, আঙ্গিনা, লন, ব্যাকইয়ার্ড যেন জানান দেয় বসন্ত সমাগমের শুভবার্তা। গাছে গাছে পত্রপল্লবের হিল্লোল, ঘাসেদের কানাকানি, হেলেদুলে ঢলে পড়া নব কিশলয়ের ফিসফাস, দুরন্ত কাঠবিড়ালীর চঞ্চল আবির্ভাব, কান খাঁড়া করে থাকা খরগোশের চকিত পলায়ন, পাখিদের গান—সবই যে বসন্তের আগমনী সংবাদ। হরিণ আর বুনো টার্কির দল বন জঙ্গলের আবাস ছেড়ে বের হয় পরিভ্রমণে, মনুষ্য সমাজকে অগ্রাহ্য করে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টাতে নীলাকাশের মতোই ঝলমলে থাকে মন। শীতের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনের অবসান শেষে সূর্যস্নানের অবগাহনে সারাবছরের ভিটামিন ডি নেয়ার সময়ও এটি।
মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুতে সকালে আর রাতে বেশ ঠান্ডা থাকে। স্নিগ্ধ ভোরে বা মনোরম বিকেলে হাঁটার সুযোগ থাকলে কাঠবিড়ালীর সাক্ষাত হবেই। পথের দু’ধার আলো করে ফুটে থাকা অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো ফুল দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বেগুনি, হলদে, লাল, গোলাপি, সাদা, মেরুন, নীল —কোন রঙ নেই সেখানে! অথচ ক’দিন আগেই বরফের পাহাড় ছিল ওখানটায়। অল্প ক’দিনেই সূর্যের তাপে বরফের স্তুপ বিলীন হয়েছে। মন ভুলানো ফুলের আগমনে হৃদয় নেচে উঠে। আশা ভোঁসলের সেই গানটি মনে করে গুনগুনিয়ে উঠি— “মন মেতেছে মনময়ুরীর কী খেলায় নাম না জানা ফুল ফুটানোর এই বেলা…।”
বসন্তের শুরুতে গোটা দুনিয়ার মানুষকেই পাগল করে দেয় ফুলের রানি টিউলিপ, ড্যাফোডিল, ম্যাগনোলিয়া, লাইলাক। এ বলে, আমাকে দ্যাখো। ও বলে, আমার রূপের সাথে পাল্লা দেবার সাধ্যি কার? কানাডার রাজধানী অটোয়ার টিউলিপ উৎসবের সুখ্যাতি রয়েছে। এদেশে টিউলিপের চাষ শুরু
হওয়ার পেছনে একটা ছোট্ট গল্প রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডকে শত্রু মুক্ত করতে কানাডার সৈনিকদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। কৃতজ্ঞতা আর বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ নেদারল্যান্ড ১ লক্ষ টিউলিপ বালব পাঠায় উপহার হিসেবে। তখন থেকেই ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বর্ণিল রঙের টিউলিপ উৎসব অটোয়ার কমিশনার পার্ক, ডোস লেকের আশেপাশে।
একই চিত্র দেখা যায় আমেরিকার নিউইয়র্ক ও তার আশেপাশের স্থানগুলোতে। ম্যানহাটনের বুকে লেগে থাকা বৃহৎ উদ্যান সেন্ট্রাল পার্কে এসময়ে বাসন্তী হাওয়ার আমন্ত্রণে চেরী ব্লসম উপভোগ করতে যায় দলে দলে লোক। টিউলিপ আর বাহারি ফুলের সমাহারে পুরো প্রকৃতি যেন রঙের খেলায় মেতে ওঠে। শত বছরের পুরনো বৃক্ষগুলো আপন রঙ ফিরে পাবার আনন্দে অকাতরে বিতরণ করে যায় অক্সিজেন। পাখিদের কলতান, প্রজাপতির চকিত আগমন, শিশুদের ছুটোছুটি আর প্রেমিক যুগলের চোখের মুগ্ধতায় চমৎকার এই মিলনোৎসব উদযাপিত হয়।
বসন্তের আগমন মানেই গ্রীষ্মের প্রস্তুতিও বটে। বাড়ির একফালি আঙিনা বা ব্যালকনিতে যারা চাষবাস করেন তাদের বিকেলগুলো ব্যস্ততায় কাটে। সারাদিন কাজের পর ঘরের উষ্ণতায় গজানো ছোটো পটের চারাগুলো ব্যাকইয়ার্ডের মাটিতে স্থানান্তর করার কাজ থাকে। বাড়ির সামনের লনে শোভা বর্ধনকারী গুচ্ছ লতা বা ঝোপ ঝাড়ের যত্নের পাশপাশি পেরিনিয়াল জাতীয় ফুল গাছের গোড়ায় মাটি, সার দিয়ে পরিচর্যার কাজ তো রয়েছেই। সেই সাথে থাকে দীর্ঘ শীতের পর জানালা পরিষ্কার, রঙ করা আর ঘরদোর সারাইয়ের কাজ। এদেশে 'স্প্রিং ক্লিনিং' রীতিমতো আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হয়।
পৃথিবীর সমস্ত জাতির মিলনমেলার এই মহাদেশে বসন্তকে উপভোগ করে না এমন একটি জাতিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে ফূর্তির বহিঃপ্রকাশ হয় পোশাকে, জুতায়, খাবারের বৈচিত্র্যে আর উদযাপনে। ফোনে বাইরের তাপমাত্রা দেখার আগেই জেনে যাই জানালা দিয়ে রাস্তায় লোকের পরিহিত শর্টস আর চপ্পল পরা পা দেখে। সাইকেল চালকদের পদচারণায় মুখরিত হয় পথ প্রান্তর। আইসক্রিম, স্মুদি হাতে চলমান কিশোর আর প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে হাওয়ায় ভেসে আসা বারবিকিউয়ের জিভে জল আনা সুগন্ধেও বাসন্তী বার্তা লুকিয়ে থাকে। বিহ্বল হয় পথচারী রডোডেন্ড্রন আর লাইলাকের সৌরভে, বসন্ত মুখর দক্ষিণ সমীরণে।
সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন