https://www.prothomalony.com/

16110

decoration

সাজসজ্জা

নানান দেশে নানান ভাষায় নানান নামে সরস্বতী

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১০:০৮

বিশ্বের বহু সংস্কৃতির,বহু ভাষায়; বহু জাতিগোষ্ঠীর বহু ধর্মে বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী। দন্ড-নীতি, চিকিৎসা-নীতি,সংগীত,শান্তি,জলপ্রবাহ, গ্রান্থাগারিক বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী। আলোর দেবী;  জ্ঞানের দেবী বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী। জ‍্যোতির দেবী; বিদ‍্যা-বুদ্ধির দেবী বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী। মন্ত্রে যিনি বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী, তিনিই বিদ‍্যার্থীদের কাছে সরস্বত্বী। সনাতনে সর্বজনে; সর্বজনীন।  

বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবী। উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগবেদে। সরস্বতীপূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা ও শ্রীকৃষ্ণ। এছাড়াও বৌদ্ধদের বজ্রযান ও মহাযান ধারাতে, সুবর্ণপ্রভাসুত্র-বৌদ্ধগ্রন্থে, বৌদ্ধ পুঁথিতে (থুরাথাডি), চৈনিক পৌরানিক কাহিনিতে, প্রাচীন যুগ থেকে ভারতীয় পুরাণ এবং তন্ত্রশাস্ত্রে, যর্জুবেদে, মায়ানমারের পুরাণে, স্কন্দপুরাণে, পদ্মপুরাণে, দেবীভাগবত পুরাণে; কবি বিহারীলাল চক্রবতী সারদামঙ্গল কাব্য হতে রবি ঠাকুরের সোনার তরী' কাব্যগ্রন্থের 'পুরষ্কার' কবিতাতে বিশালাক্ষ্মী বিস্তৃত।


তিনি বাঙালি সনাতন বিদ‍্যার্থীর কাছে বীণা, পুস্তক হস্তে প্রণতি পান। পদ্ম পাতা, কলা পাতায় উপবেশন হন। তিনি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে সাদা রাজহংস ড্রাগন (সর্প), ময়ূর, মেষ, বরাহ, বাহন নিয়ে মানুষ কল্পিত মূর্তিতে আসীনা হন। পোষাক-পরিচ্ছদের দিক লক্ষ্য করলে শুধু শাড়ি নয় পশমের ওভার কোট পরিহিতা হিসেবেও জাগ্রত হন। আবার বিশ্বের বহু সংস্কৃতির, বহু ভাষীর, বহু ধর্মে, বহু জাতিগোষ্ঠীর নিবেদনে গলায় মালার বদলে অ্যামুলেট (লাকি লকেট) এবং হাতে পাখা সহ দুই, চার, ছয় হাত বিশিষ্ট মূর্তিতে দৃশ‍্যত হন।


শাস্ত্রেও আছে 'নহি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে' (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৯), অর্থাৎ 'জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই'। চিন্তক আরজ আলী পাঠে জানাযায় " বিদ‍্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে জ্ঞানের কোন ডিগ্রী নেই; জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন। শ্বেতশুভ্র সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী। মাঘ মাসের এই পঞ্চমী তিথিতে আসেন লোকারণ্যে। বিদ‍্যার্থীদের কাছে হন পূজিত। সর্বোধ্বে পূজা ভরে ওঠে আনন্দে। "আনন্দকে ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি হচ্ছে প্রেম" (রবি ঠাকুর)।

রাষ্ট্র, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের স্তর পর্যালোচনা করলে "বিদ্যার দেবী" হিসেবে তিনি গৃহীত। বিশ্বের নানা প্রান্তে বাঙালি সনাতনী বিশ্বাসী বিদ‍্যার্থীদের কথা বাদ দিলেও  বিশ্বমানচিত্র লক্ষ‍্য করলে ভারত, চিন, মায়ানমার, তিব্বত, জাপান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এমনকি ইন্দোনেশিয়ায়ও দেবীর উপাসনা উপনীত। পূজার রীতিনীতি, আয়োজন, ভৌগোলিক অবস্থান ও সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্নতা হলেও হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের বাহিরেও অনেকের শ্রদ্ধায়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আরাধনায়, অর্চনার বাহিরেও নিবেদিত।
সমাজের স্তর লক্ষ‍্য করলে অক্ষর-জ্ঞানহীন, নাম সই করতে পারেন না এমন লোক হতে ধনাঢ্য-হতদরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বর্ণের দিক চিন্তা করলে ব্রাহ্মণ-নমশূদ্র; ভাষাভাষীদের দিক হতে বাংলা, চাইনিজ, জাপানি-নিহঙ্গ এমন ২২টি ভাষায়; জাতিগত দিক হতে বাঙালি, অহমীয়া, জৈন, তিব্বতি, বৌদ্ধিষ্ট, জাপানিজ, চীনা, বর্মী,থাই, খেমার, ইন্দোনেশিয়ান, জাতিগোষ্ঠির কাছে নিবেদিত হন-না ভাবা দুষ্কর !

নানান ভাষায়, নানান দেশে নানান নামে বিশালাক্ষ্মী পরিচিত হলেও তিব্বতে তাঁর পরিচয় ইয়াংচেননমা, মঙ্গোলিয়ায় কেলেইন উকিন তেগরি, চীন দেশে বিয়ানচাইতিয়ান (মিয়াওয়িন মু), জাপানে বেনজাইতেন, কম্বোডিয়ায় বাগিশ্বরী (ভারতী), থাইল্যান্ডে সুরতসাওয়াদি (সরৎসাওয়াদি),। সরস্বতী ইন্দোনেশিয়াতে সরস্বতী নামে পরিচিত হলেও পূজার দিনটি 'সরস্বতী দিবস নামে পরিচিত। তাদের ক্যালেন্ডার (বালিনিজ) অনুযায়ী বছরে দু'বার এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা 'বসন্ত পঞ্চমী'-এর (ভারতবর্ষে পালিত) থেকে আলাদা।

প্রাচীন বৈদিক যুগের দেবী  সরস্বতী পূজায় মূল প্রসাদ সহ তাজা ফল-ফলাদি,দই-মিষ্টি,লাব্বরা (পাঁচ মিশালি সবজি) ও খিচুড়ি কার না ভাল লাগে?? খিচুড়িতে কচকচে কাঁচা মরিচ স্বাদে-গন্ধে বিমোহিত করে। হালকা শীত, গরম খিচুড়ি যেন এক মহাননন্দ আর সাথে আলু ভাজা হলে আর কি লাগে ! কিন্তু নীহাররঞ্জনবাবু 'বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব)' ঘাঁটলে চোখে পড়ে মধ্যযুগীয় নিরামিষ খাদ্যধারার প্রাণপুরুষ শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আগপর্যন্ত ছানার মিষ্টি,ডাল, আলু কাঁচামরিচ এসবের ব‍্যবহার ছিল না বরং দুধকে ছিন্ন করা পাপ বলে গন্য হতো তাই সে যুগে মিষ্টি থাকলে তা ছানার মিষ্টি নয়। এখন সময়ের সাথে চিন্তা বদলাচ্ছে,জানা-অজানার জ্ঞানের উন্মেষ ঘটছে, জ্ঞান অন্বেষণের পরিধি বেড়েছে। বহু জাতি সংস্কৃতির শঙ্করায়ন হচ্ছে। যেখানে ব্রাহ্মণ পুরোহিত দিয়ে মন্ত্র পাঠ হতো সেখানে পুরুষ দূরের কথা নারী দিয়েই দেবী পূজ‍্য হচ্ছে। আর সেই জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী-ই তো হচ্ছেন বিশালাক্ষ্মী সরস্বতী।

এতো এতো ভাষা, সংস্কৃতি, দেশ, জাতিগোষ্ঠীর অবলোকনে সরস্বতী পূজার পেছনে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক ও পুরাণিক তাৎপর্য। যা আজও বাঙালি সমাজে জীবন্ত এবং প্রাণবন্ত। তবে মিথ, ফিউশন এবং পৌরাণিক কাহিনীর সমন্বয়ে হলেও শুধু ধর্মীয় আচারের গন্ডিতে ভাবা মনেহয় দীনতা। এটি হোক জ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক। বলা যেতে পারে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করে সমাজকে আলোকিত করার এক অনন্য প্রয়াস।  এর মাধ‍্যমে ধর্মীয় আচারের বাহিরে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ঐক্যের এক অভিনব চিত্র ফুটে ওঠে। 

সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন