https://www.prothomalony.com/

15898

decoration

সাজসজ্জা

বদর যুদ্ধের স্মারক মসজিদ ‘আল-আরিশ’

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ২৩:৪২

বদর যুদ্ধের স্মারক মসজিদ ‘আল-আরিশ’

সৌদি আরবে ওমরাহ পালন উপলক্ষে বরিশাল হজ কাফেলার সঙ্গে মদিনায় অবস্থান করছিলাম। দুই দিন পর মোয়াল্লেম জাকারিয়া ভাই প্রস্তাব দিলেন, বদর যুদ্ধপ্রান্তর দর্শনে যাবেন। যে ইতিহাস আমরা বইয়ে পড়েছি, মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে, সেই ঐতিহাসিক বদর প্রান্তর! মনে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল।

আমি আমার স্ত্রী, মা, শাশুড়িসহ কাফেলার সবাই মিলে দুপুরের খাবারের পর বড় বাসে বদরের যুদ্ধময়দানের উদ্দেশে রওনা হলাম। মনে জাগল এক অজানা শিহরণ। কেমন ছিল বদর প্রান্তর? কেমন আছে এখন? কতটা বদলে গেছে? পাহাড়ি পথে বাসে যেতে যেতে হালকা ঘুমে চোখ ঢুলে পড়ছিল। বাসে জাকারিয়া ভাই বদর প্রান্তরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ণনা করছিলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম মহান আল্লাহ তাআলা কীভাবে মহানবীকে (সা.) সহায়তা করেছিলেন!

বদর প্রান্তরে পৌঁছানোর সময় আসরের নামাজের সময়। বদর প্রান্তর এখন অনেকটাই আধুনিক রূপ পেয়েছে। আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, রয়েছে দোকান, মসজিদ, খেজুরগাছ ও নানা স্থাপনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের দলও আসছে। বদর প্রান্তরের চারপাশ ঘিরে রয়েছে পাহাড় ও পর্বত। আমরা সেখানে ‘আল-আরিশ’ মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করি। ‘আল-আরিশ’ মসজিদে নামাজ আদায় করে ভীষণ ভালো লেগেছিল। মসজিদটি খুব পুরোনো না হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

‘মসজিদ আল-আরিশ’ মদিনা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে বদর উপত্যকায় অবস্থিত। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, এটি অন্যতম প্রাচীন স্মারক মসজিদ। তবে নির্মিত প্রথম মসজিদ ও বর্তমান অবকাঠামো এক নয়। ‘আল-আরিশ’ নামটি এসেছে রাসূল (সা.) এর তাঁবু যে পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপন করা হয়েছিল, সেই ‘আল-আরিশ’ পাহাড়ের নাম থেকে, এমন জনশ্রুতি রয়েছে। অন্য সূত্র অনুযায়ী, ‘আরিশ’ আরবি শব্দ, যার অর্থ খেজুরগাছের ছাউনি বা কুটির।

‘মসজিদ আল-আরিশ’ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। এটি স্থানীয়ভাবে ‘মসজিদ বদর’ বা ‘মসজিদ আল-আরিশ’ নামে পরিচিত। বদরের যুদ্ধের সময় এই স্থানেই রাসূলুল্লাহর (সা.) তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। এখানেই ছিল যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টার। সে কারণেই ‘মসজিদ আল-আরিশ’ বদরের যুদ্ধের স্মারক হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে (২ হিজরি, ১৭ রমজান) সংঘটিত এ যুদ্ধে অংশ নেন ৩১৩ জন মুসলমান ও প্রায় ১ হাজার কুরাইশ। মুসলমানদের সহায়তার জন্য আল্লাহ তাআলা বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন। কোরআনে (সুরা আল-ইমরান) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ফেরেশতারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মুসলমানদের বিজয়ের মাধ্যমে আরবে বার্তা পৌঁছে যায়, তারা একটি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই যুদ্ধে মুসলমানদের বিপক্ষে আবু জাহল, উতবা ইবনে রাবিয়া, উমাইয়া ইবনে খালাফ, শায়বা ইবনে রাবিয়া, ওয়ালিদ ইবনে উতবা ও উকবা ইবনে আবি মুইত নিহত হন। বদরের যুদ্ধে মোট ১৪ জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। তাদের কবর বদর প্রান্তরেই অবস্থিত।

মসজিদ আল-আরিশের নির্দিষ্ট কোনো আলঙ্কারিক স্থাপত্যশৈলী নেই। আধুনিক সৌদি আরবে নির্মিত মসজিদগুলোর মতো (মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী ব্যতীত) এটি বাহুল্যবর্জিত এবং সালাফি (সুন্নাহভিত্তিক) ধারার কাঠামো অনুসরণ করে নির্মিত। এটি বদরের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্থান, যেখানে পরবর্তীকালে মসজিদ নির্মিত হয়।

মসজিদে দুটি মিহরাব ও একটি মিম্বার রয়েছে। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অলংকরণ চোখে পড়ে না। সাদা রঙের মসজিদটিতে একটি বড় গম্বুজ ও কয়েকটি ছোট গম্বুজ রয়েছে। ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, টাইলস, সুন্দর কার্পেট ও আলো-ব্যবস্থা দৃষ্টিনন্দন। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের স্থান।

‘আল-আরিশ’ মসজিদ ঠিক কোন সালে এবং কে নির্মাণ করেছিলেন, তা নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। তবে বদর যুদ্ধের পর এটি নির্মিত হয়েছিল, এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। এটি কোনো বৃহৎ ধারণক্ষমতার মসজিদ নয়। একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি কয়েক কাতারে নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমার নামাজ বা বিশেষ সময়ে এখানে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যায়। বর্তমানে দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের জন্য মসজিদটি উন্মুক্ত রয়েছে।

লেখক: ব্যাংকার ও গল্পকার

সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন