https://www.prothomalony.com/
18571
north-america
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:১৪
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সারা দেশে রিপাবলিকানদের এই পরাজয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়া একাধিক রাজ্যেও এবার ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে ফলাফলকে রিপাবলিকান শাসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের সুস্পষ্ট প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সিএনবিসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দলটি অন্তত ২৫০টি আসন পেতে পারে। সিবিএসের হিসাবে সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২৫১ থেকে ২৬৮। বুধবার সকালে সিএনএনের হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিল ২৪০টি; কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে তখনো ভোট গণনা চলছিল। এনবিসি নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হতে পারে।
সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩-৪৭ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভাঙতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন ছিল নিট চারটি আসন। দলটি সাতটি আসনে জয় পেয়েছে—আইওয়া, কানসাস, ওহাইও, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসে। পাশাপাশি জর্জিয়া ও মিশিগানে নিজেদের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা। এনবিসি নিউজের গণনায় সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৫৪-৪৪; । আলাস্কা, কলোরাডো ও মিসিসিপির মতো কয়েকটি রাজ্যে তখনো ফল গণনা চলছিল।
মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনের কাছে পরাজয় স্বীকার করেছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ বনাম ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ ভোটে পরাজিত করেছেন। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম রাজ্যটিতে সিনেট নির্বাচনে জয় পেলেন কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। ওহাইওতে শেরড ব্রাউন পরাজিত করেছেন বর্তমান সিনেটর জন হাস্টেডকে। আইওয়ায় জশ টুরেক হারিয়েছেন অ্যাশলি হিনসনকে। আর টেক্সাসে জেমস তালারিকো অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে প্রায় ৫৫-৪৩ শতাংশ ভোটে পরাজিত করেছেন।
গভর্নর নির্বাচনের ফলেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি স্পষ্ট। স্টেটলাইনের হিসাব অনুযায়ী, ১৬ বছর পর দেশের অধিকাংশ গভর্নরের দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে দলটি। জর্জিয়ায় কিয়শা ল্যান্স বটমস, আইওয়ায় রব স্যান্ড, নেভাদায় অ্যারন ফোর্ড, ওহাইওতে অ্যামি অ্যাকটন এবং টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা জয় পেয়েছেন। জর্জিয়ায় বটমস জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর। আলাস্কা ও কানসাসে গভর্নর নির্বাচনের ফল লেখার সময়ও চূড়ান্ত হয়নি।
টেক্সাসে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাগুলোর একটি এসেছে টেক্সাস থেকে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এই রাজ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। অথচ এবার ৩২ বছর পর রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
শুধু সিনেট বা গভর্নর পদেই নয়, অ্যাটর্নি জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পদেও জয় পেয়েছে দলটি। দুই দশকের বেশি সময় পর টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রধান এই রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের এমন সাফল্য জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য, ইরান যুদ্ধ ও দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে ভোটারদের অসন্তোষের পেছনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম, ইরান যুদ্ধ এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩৮ শতাংশ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য এটি অন্যতম নিম্ন অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনবিসির বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, আলাস্কা এবং ডেমোক্র্যাটদের জয়ী হওয়া ছয়টি রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যের পাঁচটিতেই অর্ধেকের বেশি ভোটার প্রেসিডেন্টের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট ছিলেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ তাঁর মতে, ২০২৪ সালে ট্রাম্প-ভ্যান্স জুটিকে ভোট দেওয়া অনেক মানুষ এখন ক্ষুব্ধ। বুধবার ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে—এ কথা অনেকাংশে সত্য। তবে তাঁর দাবি, যুদ্ধের বিষয়ে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না এবং প্রয়োজন হলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নেবেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একাংশ আড়ালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পরাজয়ের জন্য দায়ী করছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক এজেন্ডা ভেটো করার হুমকি দিয়েছেন। তবে সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এবং নির্বাচনের ফল তিনি মেনে নিচ্ছেন।
তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনী সাফল্যের পর ডেমোক্র্যাটরা এখন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে চান। গ্যাস, মুদি পণ্য ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাতে তাঁরা প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চান। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তাঁরা। এসব তদন্তের পরিণতিতে অভিশংসনের উদ্যোগও আসতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটি ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন, ইলন মাস্ক এবং রাশিয়ার ডিজেল চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ স্পিকার পদে নিজের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান স্পিকার রিপাবলিকান মাইক জনসন জানিয়েছেন, তিনি সংখ্যালঘু দলের নেতা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। অন্যদিকে সিনেটে চাক শুমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের মনোনয়ন অনুমোদন করানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ এসব নিয়োগে সিনেটের সম্মতি প্রয়োজন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন বুধবার শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ডাও জোন্স সূচক প্রায় ১ হাজার ৫০০ পয়েন্ট বেড়েছে।
তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন সহজ হবে না। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং সিনেটের ফিলিবাস্টার নিয়মের কারণে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে প্রশাসনিক তদারকি, তদন্ত, শুনানি, সমন জারি এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণ।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপ্তি ও ভৌগোলিক বিস্তার সেই প্রচলিত রাজনৈতিক প্রবণতাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নিউইয়র্ক ও নিউজার্সিতেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য
নিউইয়র্কে গভর্নর ক্যাথি হকুল রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ। নিউজার্সিতে সিনেটর কোরি বুকার সহজেই জয় পেয়েছেন।
নিউজার্সির সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান টম কিন জুনিয়র ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেটের কাছে পরাজিত হয়েছেন। দ্বাদশ ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হামাউই জয়ী হয়ে নিউজার্সি থেকে প্রথম মুসলিম মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হতে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে নিউজার্সির দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান জেফ ভ্যান ড্রু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জ্যাক মালকের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই আসনের ভোট গণনা শেষ হয়নি।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানদের সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি শুধু নির্বাচনী বিজয় নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ। আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে প্রভাব ফেলবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন