https://www.prothomalony.com/

18435

north-america

উত্তর আমেরিকা

মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা, আমেরিকার ভবিষ্যতের লড়াই

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৪৫

আমেরিকার রাজনীতিতে নভেম্বরের নির্বাচন মানেই শুধু ভোটের হিসাব নয়। এই নির্বাচনে মানুষ অনেক সময় সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা থেকে বিদায় না করেও বুঝিয়ে দেয়, ক্ষমতাসীনদের ওপর তাদের আস্থা কতটা কমেছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। আগামী ৩ নভেম্বর ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনের জন্য ভোট দেবেন। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পথ কতটা মসৃণ হবে, আর কতটা বাধার মুখে পড়বে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভের পর সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের সামনে থাকে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে সেই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে থাকেন, অথচ কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে বিরোধী দলের হাতে। তখন আইন পাস, বাজেট অনুমোদন, প্রশাসনের জবাবদিহি—সবকিছুতেই শুরু হয় নতুন হিসাব।

এবার সেই হিসাবের কেন্দ্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় রিপাবলিকান শিবিরকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত সুরক্ষা, সরকারি ব্যয় কমানো এবং আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের বড় একটি অংশকে আকৃষ্ট করেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারের প্রতিশ্রুতি আর সরকার পরিচালনার বাস্তবতা এক নয়। ক্ষমতায় বসার পর প্রতিটি সিদ্ধান্তের ফলাফল এসে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। আর সেই ফলাফল ভালো না হলে ভোটাররা একসময় জবাব চাইতে শুরু করেন।

এবারের নির্বাচনে অর্থনীতি সেই জবাবদিহির প্রধান ক্ষেত্র।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের অক্টোবরের জরিপ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের ৮৪ শতাংশ বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তের জন্য অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে।

ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন সব সময় বোঝা যায় না। অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির কথা বলতে পারে, কর্মসংস্থানের হিসাব দেখাতে পারে। কিন্তু মাসের শেষে বাজারের বিল মেটাতে গিয়ে যদি একটি পরিবারকে হিসাব বদলাতে হয়, তাহলে সেই পরিবারের কাছে অর্থনৈতিক সাফল্যের সংজ্ঞা আলাদা। গ্যাস স্টেশনে, সুপারমার্কেটে কিংবা চিকিৎসকের বিল হাতে নিয়ে মানুষ যে বাস্তবতা অনুভব করেন, নির্বাচনের সময় সেটিই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্পের জন্য সমস্যা হলো, অর্থনীতির দায় এখন আর শুধু আগের প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন হিসেবে তাঁকে নিজের নীতির ফলাফলের দায় নিতে হবে। আর ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুযোগ হলো, তাঁরা যদি মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরতে পারেন, তাহলে অসন্তোষকে ভোটে রূপান্তর করা সম্ভব।

তবে ডেমোক্র্যাটদেরও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেই যে ভোটাররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিরোধী দলের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়। মানুষকে বোঝানো যে ক্ষমতায় গেলে তারা কী বদলাবে এবং কীভাবে বদলাবে।

অভিবাসন আরেকটি বড় নির্বাচনী প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি তাঁর সমর্থকদের কাছে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ। কিন্তু অনেক পরিবার, কর্মী ও কমিউনিটির কাছে এই নীতির প্রভাব উদ্বেগের কারণ। গ্রেপ্তার, বহিষ্কারের আশঙ্কা, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় এবং অভিবাসী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন খাতের সমস্যা নির্বাচনী বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্যও এই নির্বাচন দূরের কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নয়। অভিবাসন নীতি, স্বাস্থ্যবিমা, ব্যবসার পরিবেশ, শিক্ষা, কর এবং নাগরিক অধিকার—সবকিছুর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ভোটাধিকার শুধু একটি আইনি অধিকার নয়। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার সুযোগও। তাই দলীয় আনুগত্যের চেয়ে প্রার্থীর অবস্থান, কাজের রেকর্ড এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি বিচার করা জরুরি।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই জরিপে ৭৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের উদ্বেগ শুধু পকেটের হিসাব নিয়ে নয়। ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়েও।

সিনেটের লড়াইও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি রিপাবলিকানদের সিনেটে ৫৩-৪৭ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে জয় প্রয়োজন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও সিনেটের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হলেও তার ফলাফল কেবল একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব হবে না। এটি হবে ভোটাররা কোন ধরনের অর্থনীতি, অভিবাসন নীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি চান, তারও একটি প্রকাশ।

আমেরিকার গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—ক্ষমতায় থাকা মানে সব সিদ্ধান্তের জন্য স্থায়ী অনুমোদন পাওয়া নয়। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে সমর্থন জানায়, আবার প্রয়োজনে সেই সমর্থন প্রত্যাহারও করে।

৩ নভেম্বরের ভোটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবেন, নাকি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেবেন—তার উত্তর এখনো ভবিষ্যতের হাতে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার: নির্বাচনের আসল বিচার শুধু কে জিতল, তা নয়। ভোটারদের জীবন কতটা বদলাল এবং ক্ষমতাসীনরা তাঁদের প্রত্যাশার কতটা জবাব দিলেন, সেটিও।

ভোটের দিন প্রার্থীরা প্রচারের মঞ্চ ছেড়ে যাবেন। কিন্তু ভোটারদের রায় তাঁদের সঙ্গে থাকবে—পরবর্তী দুই বছর, এবং তারও পরে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন