https://www.prothomalony.com/
18392
bangladesh
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:০২
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু সীমান্ত, বাণিজ্য কিংবা পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ, তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতা, আইনের শাসন এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।
সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা মোকাবিলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারপ্রধান কি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার ওপর যথেষ্ট আস্থা রাখতে পারছেন না? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় দলীয় কর্মীদের সক্রিয় করা হলে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়তে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দলীয় বাহিনীর নয়, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা, বিচারপ্রক্রিয়া, সাংবিধানিক সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের অবসান হয়নি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনৈতিক সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে গেলে, প্রতিশোধমূলক রাজনীতি বিস্তার লাভ করলে, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে এবং দলীয় সংঘর্ষ সংগঠিত সহিংসতায় রূপ নিলে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনাই গৃহযুদ্ধের অনিবার্য পূর্বাভাস নয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই সংঘাতের আশঙ্কাকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার না বানিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি আইনভিত্তিক কূটনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। প্রত্যর্পণ চুক্তি, বিচারিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করেই এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগকে একটি রাজনৈতিক দলের সব সমর্থকের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত শাস্তির ভিত্তি করা যায় না। রাজনৈতিক অধিকার ও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পৃথকভাবে বিবেচনা করাই আইনের শাসনের দাবি।
ভারত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিহার, প্রত্যাবর্তন প্রশ্নে স্বচ্ছ কূটনৈতিক আলোচনা এবং রাজনৈতিক সংলাপের প্রতি সমর্থন দুই দেশের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো প্রতিপক্ষকে দমন নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। সরকার, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ, নিরপেক্ষ আইনপ্রয়োগ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিই সংঘাত প্রতিরোধের কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নেতার প্রত্যাবর্তনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি, সাংবিধানিক শাসন এবং জনগণের অধিকারের নিশ্চয়তার ওপর। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেও আধিপত্যের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত মূলনীতি। অন্যথায় রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের মূল্য দিতে হতে পারে দুই দেশের জনগণকেই।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন