https://www.prothomalony.com/
18403
north-america
অভিবাসন নীতির প্রভাব ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:১৯
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এখন আর শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান, কর্মীদের বৈধ অবস্থান ও কাজের অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অভিবাসী পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক—সব মিলিয়ে বিষয়টি দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবনের আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোট দেবেন মার্কিন নাগরিকেরা। নির্বাচনের আগে অভিবাসন নীতির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় ব্যবসার পরিস্থিতিও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসছে।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অভিবাসন অভিযান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফ্লোরিডায় হোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিকেরা কর্মী এবং ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কানসাসে গবাদিপশু খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দক্ষ ও বৈধ কাগজপত্র থাকা কর্মীদের মধ্যেও অভিযানের কারণে অনিশ্চয়তা তৈরির কথা বলেছেন। একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অভিবাসী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফসল তোলা, ফল ও সবজি বাছাই, দুগ্ধ উৎপাদন এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কাজে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে। এসব কাজে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদন, সরবরাহ এবং ব্যবসার ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।
কানসাসের গবাদিপশু খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অভিবাসন অভিযান বৈধভাবে কাজ করা দক্ষ কর্মীদের মধ্যেও ভীতি তৈরি করতে পারে। এতে কর্মীরা কাজে আসতে অনীহা প্রকাশ করলে বা নিয়োগদাতারা পর্যাপ্ত কর্মী না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কৃষি খাতে শ্রমিকসংকটের প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমিত থাকে না। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনব্যবস্থা, পাইকারি বিক্রেতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাও প্রভাবিত হতে পারেন। তবে অভিবাসন নীতির কারণে খাদ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে শ্রমিকের প্রাপ্যতা, উৎপাদন ব্যয়, আবহাওয়া, জ্বালানির দাম ও সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতে বৈধ শ্রমিকের সরবরাহ নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের নীতিগত চ্যালেঞ্জ। কৃষি নিয়োগদাতাদের একাংশ মনে করেন, প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়োগের জন্য আরও কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য বৈধ কর্মপথ দরকার। অন্যদিকে, অভিবাসন আইন কার্যকর করা এবং শ্রমবাজারে অনিয়ম প্রতিরোধের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, নিয়োগদাতাদের বিদ্যমান আইন মেনেই কর্মী নিয়োগ করতে হবে।
হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায় কী প্রভাব পড়ছে
অভিবাসী কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের আতিথেয়তা খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রান্না, খাবার পরিবেশন, হোটেল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অভিবাসী কর্মীদের ওপর নির্ভর করে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে ফ্লোরিডার কয়েকজন ব্যবসায়ীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও অভিযানের কারণে কর্মীদের পাশাপাশি ক্রেতারাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ফলে কিছু এলাকায় ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে একটি রেস্তোরাঁর মালিক কার্লোস রাবা কংগ্রেসের এক শুনানিতে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের একটি বড় অংশ সালভাদরের নাগরিক, যাঁরা অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের সুরক্ষা বাতিল হলে প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের বড় অংশ হারাতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবসার সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। প্রথমত, অভিজ্ঞ কর্মী হারালে নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের খরচ বাড়ে। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে প্রতিষ্ঠানকে কম সময় খোলা রাখতে হতে পারে বা গ্রাহকসেবা সীমিত করতে হতে পারে। তৃতীয়ত, ক্রেতাদের চলাচল কমে গেলে বিক্রিও কমতে পারে।
তবে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর অভিবাসন নীতির প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করে তার কর্মীদের অভিবাসন-অবস্থা, কর্মীসংখ্যা, অবস্থান এবং স্থানীয় বাজারের ওপর।
স্বাস্থ্যসেবায় অভিবাসী কর্মীদের ভূমিকা
স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক হাসপাতাল, বিশেষ করে গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত কম সেবাপ্রাপ্ত এলাকায়, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে সমস্যার মুখোমুখি হয়। বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা এসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকান মেডিকেল কলেজেসের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় চারজন চিকিৎসকের একজন বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, চিকিৎসাব্যবস্থায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া প্রবীণদের পরিচর্যা, নার্সিং সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবাকেন্দ্রেও অভিবাসী কর্মীরা কাজ করেন। এসব কর্মীর বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীসংকট আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হারানোর প্রভাব গুরুতর হতে পারে। সেখানে বিকল্প চিকিৎসক বা পরিচর্যাকর্মী দ্রুত পাওয়া সব সময় সম্ভব নয়। কর্মীর অভাবে সেবার সময় কমানো, নতুন রোগী গ্রহণ সীমিত করা বা বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে অভিবাসন নীতির কারণে কোন এলাকায় কতজন স্বাস্থ্যকর্মী হারিয়েছেন, সে বিষয়ে দেশব্যাপী নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন।
অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় থাকা কর্মীদের অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য একটি অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা। নিজ দেশে সশস্ত্র সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য নির্ধারিত পরিস্থিতির কারণে নিরাপদে ফিরে যাওয়া সম্ভব না হলে যোগ্য ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্তে এই সুবিধা পেতে পারেন।
টিপিএস নিজে গ্রিন কার্ড নয় এবং এটি স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তাও দেয় না। এই মর্যাদার আওতায় থাকা ব্যক্তিরা প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করলে কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে কোনো দেশের জন্য সুরক্ষা প্রত্যাহার বা মেয়াদ পরিবর্তন করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে সালভাদরের নাগরিকদের টিপিএস নিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং তার ফলে রেস্তোরাঁ খাতের কর্মীসংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের সুরক্ষার পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব মূল্যায়নের সময় একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: টিপিএসের মেয়াদ, আদালতের আদেশ, কাজের অনুমতির বৈধতা এবং ব্যক্তির অন্যান্য অভিবাসন সুবিধা আলাদা বিষয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণা ও আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।
অভিবাসন অভিযান ও স্থানীয় সম্প্রদায়
অভিবাসন নীতির প্রভাব কর্মক্ষেত্রের বাইরেও পড়তে পারে। কোনো এলাকায় অভিযান নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে কিছু পরিবার স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র বা স্থানীয় ব্যবসায় যাওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়তে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এই অভিজ্ঞতা সব সম্প্রদায়ে সমান নয়। স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর গঠন, ব্যবসার ধরন এবং সরকারি সেবায় প্রবেশের সুযোগ—এসব বিষয় পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।
নীতির সমর্থকেরা বলেন, অভিবাসন আইন কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, নীতির সমালোচকেরা মনে করেন, ব্যাপক অভিযান এবং বৈধ কর্মীদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা আইন মেনে চলা মানুষ ও তাঁদের পরিবারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইনপ্রয়োগ, বৈধ অভিবাসীদের কাজের অনুমতি এবং অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের মর্যাদা এক বিষয় নয়। প্রতিটি শ্রেণির ক্ষেত্রে আইন ও প্রক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে অভিবাসন নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের নির্বাচন হবে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে অভিবাসন, সরকারি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমনীতি নিয়ে আইন প্রণয়ন ও তদারকির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপের উল্লেখ রয়েছে। ওই জরিপে ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। একই প্রতিবেদনে পিউ রিসার্চের গবেষণার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অর্ধেক মার্কিন নাগরিক প্রশাসনের অভিবাসন প্রয়োগের পদ্ধতিকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে করেন।
তবে জরিপের ফলাফলকে পুরো নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভোটারদের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত অবস্থানসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখে। অভিবাসন নীতির প্রতি অসন্তোষ থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট দল নির্বাচনে জিতবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অভিবাসন নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা তাই নির্বাচনী প্রচারের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের প্রশ্ন, অন্যদিকে শ্রমিকের প্রাপ্যতা, ব্যবসার স্থিতিশীলতা এবং জনসেবার চাহিদা—নীতিনির্ধারকদের সামনে এই বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন