https://www.prothomalony.com/
18389
bangladesh
জকিগঞ্জ-সিলেটের সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা। সিলেট মহানগর থেকে প্রায় শতমাইল দুরে জকিগঞ্জ পৌর সদর। জকিগঞ্জ পৌর সদরের পূর্বেই রয়েছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের করিমগঞ্জ শহর। মাঝখানে শুধু কুশিয়ারা নদী। দুই পারের মানুষ দুই দেশের নাগরিক হলেও একটি জায়গায় রয়েছে দারুন মিল। আর তা হলো-কুশিয়ারার দুই পারের মানুষ দুই দেশের অধিবাসী হলেও এই দুই পারের মানুষই ভাষাগত ভাবে সিলেটি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় এই দুই পারের মানুষ গণভোটের মাধ্যমে আলাদা হয়ে যায়। তবে এখনো দুই পারের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তা অনেক সম্পর্ক খোঁজে পাওয়া যায়।দেশ বিভাগের সময় অনেকের ঠিকানা অদল বদল হলেও আত্মীয়তার ঠিকানা এখনো সবার মনে আছে।
একজন ভ্রমন পিপাসু মানুষ জকিগঞ্জ গেলে অনেক নান্দনিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবে। জকিগঞ্জে পাহাড় বা সমুদ্র কোনটিই নেই। কিন্তু তবুও আছে মোহনীয় সৌন্দর্য্য। মনের অনুভূতি ও আবেগ থেকে এখানে সৌন্দর্য্য উপভোগ করার মত অনেক কিছুই আছে।
জকিগঞ্জ পৌর শহরে আপনি দেখতে পারবেন কুশিয়ার এপার ও ওপারের মানুষের মানুষের জীবনধারা। এপারে যখন সময়ে সময়ে মসজিদের আজান শোনা যায়,তেমনি নদীর ওপার হতে শোনা যায় মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি। এই সৌন্দর্য্যটা যেকোন সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য পিপাসু মানুষকে আনন্দ দেবে। জকিগঞ্জ পৌর শহরের কাস্টমস ঘাট এলাকায গেলে এই সম্প্রীতির সৌন্দর্য্যটা চোখে পড়ে। কাস্টমস ঘাট এলাকাটা এমনিতেই সুন্দর। এখানে গেলে এমনিতেই মন ভালো হয়ে যায় তার প্রকৃতির জন্য।
জকিগঞ্জ পৌর শহর থেকে কালিগঞ্জ রোডে আসলে পাবেন আমলশীদ নামক স্থান। এখানে নেমে মাত্র তিন চার মিনিট হেটে পেয়ে যাবেন তিন নদীর মোহনা। এই তিন নদীর মোহনার সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন শত শত পর্যটক এই স্থানে আসেন। এখান থেকেই সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দুটির জন্ম। সুরমা ও কুশিয়ারা ভারতের বরাক নদীর শাখা নদী। এই জায়গায় গেলে সুরমা,কুশিয়ারা ও বরাক-এই তিনটি নদী একসাথে দেখা যায়।
অতপর কালিগঞ্জ বাজার। কালিগঞ্জ বাজারটি শুধু জকিগঞ্জ নয়,পুরো সিলেটের একটি পুরাতন ও প্রসিদ্ধ বাজার। কালিগঞ্জ বাজারে নিয়মিত বসে বিশাল গরু ছাগলের হাট। ঈদের সময় পাশ্ববর্তী অনেক উপজেলার মানুষ কালিগঞ্জ বাজারে গরু কিনতে যেত। এখনো অনেক উপজেলা থেকে কালিগঞ্জ বাজারে গরু,ছাগল ক্রয় বিক্রয় করতে যায়। তাছাড়া কালিগঞ্জ বাজারে রয়েছে স্থানীয় মিস্টি,নিমকি,জিলাপি,তার্কিস ও আমির্তির ঐতিহ্য। কালিগঞ্জ বাজারে কিছু পুরাতন মিস্টির দোকান রয়েছে,যেগুলোর মিস্টিজাত পণ্য বর্তমান সময়ের অভিজাত মিস্টির বিপনী বিতানের চেয়ে অনেক ভালো। অনেকে এখনো বিয়ের মিস্টি কালিগঞ্জ বাজারের ঐ দোকানগুলো থেকে কিনে নেয়।
কালিগঞ্জ বাজারে অদুরেই রয়েছে "জান্নাত পার্ক এন্ড এন্টারটাইমেন্ট সেন্টার"। সম্পূর্ণে বিদেশী মডেলে নির্মিত এই পার্কে রয়েছে শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইডস সহ বিনোদন ব্যবস্থা।
সেখান থেকে কিছু সামনে এলেই জকিগঞ্জের আটগ্রাম নামক স্থান। জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের চারিগ্রামে সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। এই বাড়িটি হলো তৎকালীন জমিদার দেওয়ান সাজিদ রাজার বাড়ি। প্রায় ১৫ একর জমির উপর এই বাড়িটি অবস্থিত। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এই বাড়িটি নির্মান হয় আনুমানিক খ্রীস্টিয় আটারো শতকে। ইংরেজ আমলে তৎকালীন এই এলাকার জমিদার দেওয়ান সাজিদ আলী এই বাড়িটি নির্মান করেন। অনেক মানুষ এই বাড়িটিতে বেড়াতে যায়। এটি জকিগঞ্জের কাজলশার ইউনিয়নে অবস্থিত। তার একটু অদুরেই রয়েছে মরিচা বাগান বাড়ি। এখানেও মানুষ প্রতিদিন ঘুরতে আসে।
তাছাড়া জকিগঞ্জ উপজেলার রতনগঞ্জ বাজারের পাশে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম-যার নাম হলো ফুলতলী। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)-এর বাড়ি এই গ্রামে অবস্থিত। ফুলতলী সাহেবের বাড়ি স্থানীয় ভাবে "ছাহেব বাড়ি" নামে পরিচিত। এটি একটি বিশাল আয়তনের বাড়ি। এই বাড়ির ভিতরে মাদ্রাসা,মসজিদ,এতিমখানা ও পারিবারিক কবরস্থান সবকিছুই রয়েছে। এটি একটি দৃ্ষ্টিনন্দন বাড়ি। বাড়িটির পরিবেশ অনেকটা প্রাচীন রাজবাড়ির মতো। প্রতিদিন হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান এখানে আসে আল্লামা ফুলতলী ছাহেবের মাজার জিয়ারত করতে। প্রতি বছর আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর বাড়ির পাশে বালাই হাওরে বিশাল বার্ষিক ঈসালে সাওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এই বাড়িতে একবার কেউ আসলে তার অবশ্যই ভালো লাগবে।
মোটামোটি এই হলো জকিগঞ্জের দর্শনীয় স্থান। আপনি যদি ভ্রমণ পিপাসু হয়ে থাকেন,তাহলে জকিগঞ্জের এসব স্থান অবশ্যই আপনাকে আকৃষ্ট করবে। সময় ও সুযোগ পেলে অবশ্যই জকিগঞ্জ ঘুরে আসুন। দেখে আসুন সীমান্তবর্তী এ জনপদকে,মুগ্ধ হোন তার বিমোহিত সৌন্দর্য্যে।
লেখক: পর্যটক ও ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষক
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন