https://www.prothomalony.com/

18330

literature

সাহিত্য

কবির রাজা দিলওয়ার

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৩১

কবি দিলওয়ারের ওপর কিছু লেখা আমার পক্ষে সত্যিই কঠিন। কারণ, তিনি একজন উঁচুমাপের কবি, গণমানুষের কবি। তার বিশাল ও ইস্পাতদমনীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে কিছু লেখা আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবুও লিখছি কয়েকজনের তাগিদ আর তার দেওয়া প্রশ্রয় ও আদরের সুবাদে। তার স্নেহময় ডাক আমাকে বড় নস্টালজিক করে তুলত। এর চেয়ে বড় দিক ছিল তার মধ্যে শ্রমজীবীদের গৌরবের আভিজাত্য। অথচ ছিল না কোনো অহংকার বা বাণিজ্যিক সাংস্কৃতিক রসের শুল্কহীন কর আদায়ের গুরুগম্ভীর মুখোশ, যা বর্তমান মুক্তবাজারের কল্যাণে নিয়মসিদ্ধ। তার ডাকের মধ্যে পেতাম এক সাহসী সৌরভ। এই সৌরভ মানুষের হাড্ডিসার বুকে এনে দিত আস্থা; অন্যদিকে আমাদের বাঙালির ঐতিহ্যগত বিনয় ও শ্রদ্ধাবোধকেও সক্রিয় করে তুলত।

দিলওয়ার ছিলেন একজন কবি, তবে সাধারণ কবি নন—ছিলেন গণমানুষের কবি। তার কবিত্ব দেখে অনেকেরই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত, যাদের মধ্যে আমিও একজন। তিনি দেশের ছিলেন, আবার দেশান্তরীও। দ্বান্দ্বিকতাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো তার ছিল অনন্য আন্তরিকতা, ধৈর্য ও ধীশক্তি। বিত্ত-বৈভব ছিল তার কাছে পায়ের ভৃত্য। তবে কোনো ধরনের বৈষম্যকে বরদাস্ত করতে পারতেন না। কবি দিলওয়ার মানুষের মাঝেই মানুষ খুঁজতেন। তাই বলে তিনি মানুষকে ঘৃণা করতেন না, বিশ্লেষণ করতেন। শক্ত ও কঠিন সংগ্রামই ছিল তার পথপরিক্রমার লক্ষ্য। তার আপন আদর্শ ছিল বাঁচার জন্য, বাঁচতে শেখার জন্য সংগ্রাম।

দিলওয়ার সাহেবের জ্ঞানপিপাসা ছিল অদম্য। রুগ্ণ স্বাস্থ্যের জন্য বিরক্ত বোধ করতেন; হতাশা ছিল মনের গভীরে, যা হঠাৎ করে কখনো কখনো প্রকাশও করতেন। তবে বিষয়টিকে বিরক্তির বদলে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতেন।

‘কথাকলি’তে দেখা যেত, নিবিষ্টচিত্তে এলোমেলোভাবে রাখা বই খুঁজছেন। কাঙ্ক্ষিত বইটি পেয়ে গেলে মুখমণ্ডল প্রশান্তিতে ভরে যেত। সংসারের টাকা দিয়ে বই কেনা নিয়ে যুক্তির প্রলেপে আটকে যেতেন ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই ঠাট্টা করে বলতেন কঠোর পরিশ্রম ও কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। আমাকে বেশি করে বই লেখার পরামর্শ দিয়ে বলতেন, ‘এগুলোই থাকবে।’

আমার ‘ইতিকথা’ বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “গ্রন্থখানি লিখেছেন জীবনের প্রতি পরোক্ষভাবে একান্ত অনুরক্ত প্রিয় মানুষ আফতাব চৌধুরী। তার আরও পরিচয় আছে—তিনি সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমাজসেবী, নিবন্ধকার, বৃক্ষপ্রেমিক ইত্যাদি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এর জন্য স্বীকৃতিসহ পুরস্কৃতও হয়েছেন। বৃহত্তর সিলেটে সম্পদের অধিকারী হয়েও যে কজন ব্যক্তি লেখালেখির মাধ্যমে সমকালের ধারায় নিজেদের নাম উল্লেখযোগ্যভাবে রেখে যেতে চান, আফতাব চৌধুরীকে তাঁদের একজন বলে গণ্য করা যায়।”

আফতাব চৌধুরী ১৯৭৫ সাল থেকে অব্যাহতভাবে চুটিয়ে লিখছেন। সময় একদিন নির্ধারণ করবে তার লেখাগুলোর প্রকৃত গুণাবলি। তবে আমি বলতে বাধ্য যে তার হাত থেকে মুষলধারে শব্দের বৃষ্টি বর্ষণ দেখে আমি কিছুটা বিস্ময় বোধ করেছি এবং এখনো করি।

কবি দিলওয়ার উইনস্টন চার্চিলের একটি অমর উক্তি উদ্ধৃত করতেন: “This is not the end, this is beginning of the end.” (অর্থাৎ এটি শেষ নয়, সমাপ্তির শুরু)। আমার বই সম্পর্কে তার এই মন্তব্য আমাকে দারুণভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। এখন পর্যন্ত আমার ২৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি বই তার সংগ্রহে ছিল—এখন আছে কি না জানি না। আমি এই মুহূর্তে কৃতজ্ঞচিত্তে তাকে স্মরণ করছি।

মনে পড়ে বেশ কয়েক বছর আগের একটি ঘটনার কথা। গর্বাচেভের নীতি নিয়ে একটি জমজমাট উপ-সম্পাদকীয় লেখেন তিনি। অন্যদিকে গর্বাচেভ আমার কাছে মানবসভ্যতা ও ইসলামের শত্রু হিসেবে কাজ করছেন বলে দৃঢ়তার সঙ্গে মত প্রকাশ করতাম। তার লেখাটি পড়ে ক্ষেপে গিয়েছিলাম। আগেই উল্লেখ করেছি, আমি তার স্নেহধন্য। যুক্তি-তর্ক, সিপিডির অসার নেতৃত্ব ও পশ্চিমা প্রচারের কথা উল্লেখ করে বেশ কিছু কথা বললাম। তিনি শুনলেন, কিছু বললেন না। এসব কথাবার্তা নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে বকাঝকা করলেও আমি নীরব থাকতাম—উদ্দেশ্য তার কাছ থেকে কিছু শেখা বা জানা।

কয়েক মাস পর দেখলাম, উপ-সম্পাদকীয়তে গর্বাচেভ কার স্বার্থ কেমন করে রক্ষা করতে যাচ্ছেন, তা তিনি অল্প কথায় সহজ ভাষায় একটি স্থানীয় পত্রিকায় তুলে ধরেছেন। তিনি জনগণের কথা ভাবতেন বলেই সহজ কথা সহজে লিখে যেতে পারতেন। অনেকেই তার উপ-সম্পাদকীয় কেটে রেখে দিতেন। কিছুদিন পর দেখা হলে তিনি জানতে চাইলেন, গর্বাচেভ সম্পর্কে আমার ধারণা সত্য হতে চলেছে কি না। উত্তরে বললাম, “সে তো আপনার লেখায় বিবৃত হয়ে আছে।”

মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে বলতেন, সংবাদপত্রের আশপাশের এলাকায় থাকতে চান। কেন—জানতে চাইলে বলেছিলেন, আসা-যাওয়ার দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাবেন এবং পড়াশোনায় আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে চিত্র প্রদর্শনী সহজে দেখতে পারবেন। চিত্রকর্মের প্রতি তাঁর দারুণ দুর্বলতা ছিল। তার বাড়িতে দুটি চিত্রকর্ম ছিল, জানি না এখনো আছে কি না। তিনি সেই চিত্রকর্ম দুটি নিজের আয় থেকে কিনেছিলেন। ভাবলে অবাক লাগে, সংসারের চাপ ও চিকিৎসার খরচ বাঁচিয়ে তিনি শিল্পকর্ম কিনতেন! এটি একটি দুর্লভ উদাহরণ। টাকা কম থাকায় বড় মাপের শিল্পীর কাজ কিনতে না পারার আক্ষেপও ছিল তার।

তিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। মাঝে মাঝে পাহাড়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। ‘সমুদ্র যার মা’ তারই ফসল। ছিন্ন কথায় এমন অনেক কথাই বলতেন, যাতে তার নান্দনিক ভাবনার দিকটি প্রকাশ পেত। অথচ তিনি সহজে আবেগের কথা প্রকাশ করতেন না। কথায় কথায় সময় চলে যেত। বলতেন, “বাসায় গিয়ে কী করবেন, বসেন। দেখি, কিছু নাস্তা করা যায় কি না।” গল্প করতাম। গল্পের ছলে তার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে কিছু আহরণ করার লোভই ছিল আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। তার মধ্যে ছিল শৈল্পিক তাড়না। অথচ মনে-প্রাণে তিনি একজন কবি। ছোটগল্পেও তার হাত ছিল অত্যন্ত সাবলীল। উপন্যাস লেখারও ছিল তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আমার মনে হয়, অসুস্থ হয়ে না পড়লে কবি ও সাহিত্যিক হিসেবেই সমধিক পরিচিতি পেতেন এই উপমহাদেশে।

তবে এদিক থেকে তিনি বুদ্ধদেব বসুর একটি উক্তিকে কিছুটা হলেও পরাস্ত করেছেন। বসুর উক্তিটি ছিল, “বর্তমানে সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে না, সাংবাদিকতাই হচ্ছে সাহিত্যের নামে।” কথাটি শুনে তিনি হাসতেন; অবজ্ঞা করে নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করে।

রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না কবি। কিন্তু যেকোনো কর্তব্যপরায়ণ ও ন্যায়নিষ্ঠ রাজনীতিবিদের চেয়ে তাঁর দূরদর্শিতা ছিল সুদূরপ্রসারী। তাকে আমিসহ অনেকেই বিরক্ত করেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক। দ্বিধাহীন চিত্তে স্পষ্ট কথা বলে যেতেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তেল’ পড়া থাকলেও আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ (The Old Man and the Sea) ছিল তার মননে। দুঃখের বিষয়, তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। বিজ্ঞজনেরা যখন বাজার অর্থনীতি ও এনজিওর মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যস্ত, তখন কেই-বা তার মূল্যায়ন করবে?

তার নিজস্ব লাইব্রেরিটি ছিল এক সৃজনশীল গবেষণাগার। মাঝে মাঝে পত্রিকা নিয়ে কথা উঠত। বিভিন্ন পত্রিকার গঠনমূলক সমালোচনা করতেন, এমনকি আমাকেও ছাড়তেন না। পড়া শেষে কোনো কোনো পত্রিকা হাতে নিয়ে ভুলত্রুটি ও 'নিউজ ট্রিটমেন্ট' নিয়ে শান্তচিত্তে শিক্ষণীয় দিকগুলো আলোচনা করতেন। মনে হতো এই বুঝি রেগে উঠবেন। না, বলতেন—পত্রিকা হচ্ছে প্রক্রিয়াবিজ্ঞান, চর্চা ছাড়া এগুলো টিকে থাকে না। কবি হিসেবে খ্যাতি পেলেও আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষ হিসেবেই তার পরিচয় ছিল সবচেয়ে বড়। দেশে ছিলেন, দেশান্তরেও ছিলেন। দুঃখীর পাশে ছিলেন, অভাবীর পাশেও ছিলেন। নারীশিক্ষা বিস্তারের পক্ষে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনি ছিলেন গোঁড়ামির বিপক্ষে।

কবি দিলওয়ারের মতে, হাতে গোনা কয়েকজন সাহিত্যিক ছিলেন বলেই সাহিত্যের মান এখনো বেশ উঁচুতে আছে। অবক্ষয় চলছে, তবে তা যাতে আর বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দিতেন। প্রতিযোগিতা করার কথা বলতেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। আজ যারা তার মৃত্যুদিবসে শোকসভা বা বিবৃতিতে নানা বিশেষণ ব্যবহার করছেন, তারা কি নিজেদের বিবেকের কাছে কবি দিলওয়ারের প্রতিচ্ছবির ছাপ ফেলতে পারবেন? পারলেই হবে তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা নিবেদন।

কবি দিলওয়ারের মতো বিরলপ্রজ কবি আমাদের দেশে খুবই কম আছেন। জন্ম ও মৃত্যুদিনে কবি দিলওয়ারকে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে স্মরণ করা হয়, তবে আমরা মনে করি তা আরও ব্যাপক আকারে হওয়া উচিত। অথচ অনেক নিম্নমানের কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা একুশে পদক পেয়ে যান।

দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বলা যায়, কবি দিলওয়ার আছেন এবং থাকবেন তাদের সঙ্গে ও পাশে—যারা দেশ গঠনে ও সমাজ পরিবর্তনে নিয়োজিত। আমিও তাদের পাশে আছি ও থাকব, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন