https://www.prothomalony.com/

18387

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য 

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৩৪

মস্তিষ্ক 

পারমিতা

মাথার ভেতরে ঘর্ঘর 

রোজ ছোটে বুদ্ধির রথ 

হলুদ তরলে দোলে মন 

বিমনা দেবতা জাগে রাত!

মাথার ভেতরে কড়ানাড়া ভেবেছ ধরেনি 

তাতে জং?

নির্ভয় নিবাত জীবন?

মধুগ্যাছে, ফেলে ফিকে রঙ!

ভুল সুরে ভুল গান সাধা 

মাথা একা জাগে দিনে রাতে 

দু'হাতে সাপটে বিভ্রম

ছেড়েছি যেহাত ছিল হাতে !!

আর কবে 

ভজন দত্ত 

নিঃশব্দে মচকাচ্ছে রাত 

তবুও ভাঙে না জল 

ঈশান কোণে ভাঙা ভাঙা লাল 

লালা হয়ে ঝরে পড়ার আগে 

চেখে নিচ্ছে চাঁদের স্বাদ 

সূর্য সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার আগেই 

পৃথিবীর ফাটলে ফাটলে 

পৌঁছে যাচ্ছে আলো 

আর আমরা পড়ে আছি 

নীল-সাদা-লাল-গেরুয়া সন্ত্রাসে!

আর কবে সশব্দে ভাঙবো 

নিঃশব্দে দিন বদলের জন্য 

এখন শুধু চোখ আছে জল নেই 

শব-মুখেও আঁটা মুখোশ... 

নেমেসিস কাব্য 

কাকন রেজা 

কুয়াশা ঘিরেছে চারিদিক

অথচ শীত আসতে রয়েছে বাকি ঢের;

জমে যাচ্ছে মানুষ, বরফ ঠোঁট

আঙুল শাসায় চুপ, এই সংকেত কিসের? 

কবিতার জন্য খুলে যায় শিরস্ত্রাণ

কবির শিরচ্ছেদ ঘোষণা হয়;

দিগন্তজোড়া সশব্দ কুয়াশার ভিড়ে

শোষক খুলিতে জাগে নেমেসিস ভয়।

জানি তো, নেমেসিস নেমেছে পথে

পথ কাঁপে গর্বের সে ভারে;

সব আবর্জনা শলা করে, যন্তর-মন্তর ঘর 

কার জায়গা হবে কত দূরের ভাগাড়ে। 

ভুল করে ফুল ছিড়ো না 

দেওয়ান নাসের রাজা 

ভুল করে ফুল ছিঁড়ো না,

কখন যে পাপড়ি ঝরে যায়

তখন শব্দের ঝড় আছড়ে পড়ে

কবির বুকে।

রাতের তারা হয়ে দূরেই থাকো⸺

ফুলকে ছুঁয়ো না 

কবি তো শিশির ফোঁটা 

সবুজ পাতায় কেবল গড়ায়। 

দেওয়ান বাড়ির ঘাটে 

তুমি বসে আছো 

আমার ঘরের চড়ুই⸺

তার চোখে বিশ্বাস। 

এমন সময় ডাক দিয়েছ 

নিঝুম সন্ধ্যায় 

হাওয়ারা বয়ে যায়। 

দূরেই থাক রাতের তারা 

রেলের চাকার মতো 

রেললাইন ক্লান্তিহীন চলে 

আজীবন 

দুটি তারা জ্বলে কাছাকাছি 

বন্ধু যেমন। 

প্রকৃতির রঙে

ড. আব্দুস সাত্তার

নদীর বুকে পাহাড়ের ছায়া, আকাশজুড়ে মেঘাবেশ,

প্রকৃতির এই নীরবতায় জাগে ভালোবাসার আবেশ।

দূর পাহাড়ের গায়ে যেন রোদ্দুর লিখে যায় প্রিয় গান,

নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে তোমারই প্রেমজ অভিমান।

নীল আকাশের মায়াবী চাদর জড়ায় বিস্তীর্ণ বনভূমি,

শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে শরতের নীরব ভূমি।

পাখির ডানায় ভোরের আলো ছুঁয়ে যায় দুজনার মন,

বহতা নদীর কাছে বসে শুনি হৃদয়েরই গোপন অনুক্ষণ।

তুমি পাশে থাকলে স্রোতস্বিনী নদী হয়ে যায় এ প্রাণ,

পাহাড় হয়ে আগলে রাখি তোমার সকল অভিমান।

আকাশজুড়ে যত তারা, সবই যেন প্রেমের ভাষা—

প্রকৃতির প্রতিটি রঙে তোমাকেই খুঁজি, হে ভালোবাসা!

বিপ্রতীপ

মৌসুমী পুলেন

বিকেলের ক্লান্ত সূর্য,

মেরুন-জাফরান বাতাসের আলিঙ্গনে বিস্ফারিত হয় 

এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্য।

সরল ইরানি রমণীর মার্বেল চোখে অপঠিত শব্দের কোরাসে অদ্ভুত দ্যুতি খেলে যায়।

দেখেছি কীভাবে তরুণ ডুবে যায় প্রাচীন থেকে প্রাচীনে,

আলোর মুখোমুখি বসে নির্ভুল আওড়ায় অব্যবহৃত সংলাপ!

হিম তমসার ফ্যাকাশে রঙ—

কোন গ্রহণ গিলে খাচ্ছে এসব তারুণ্য?

দৃষ্টি থেকে মুছে গেছে বুনো হাতি, যে অনুসরণ করে 

সত্যের শক্তি!

আমার তন্দ্রায় ভেসে ওঠে এথেন্সের কোনো নগরী;

হলুদ বৃক্ষ, অকৃপণ আকাশ দাঁড়িয়ে থাকে—

আমি কী যেন খুঁজছি

ভিড়ের বৃন্তে।

মানুষেরা ঝিনুকের মুক্তো নিয়ে রেখে যায় নীরব দহন,

আলো আসে কেবল সমুদ্রজুড়ে,

প্রতিটি ঢেউ ধারণ করে সূর্য ও সমুদ্রকে!

এই আছি এই নাই

মহসিন আলম মুহিন

ছিলাম না, আছি, থাকব না—

জীবন এত ক্ষুদ্র কেন, বুঝি না!

কত রঙ-বেরঙের স্বপ্ন চোখজুড়ে,

কত আশা, কত ভালোবাসা অন্তরে!

ঘর-সংসার থেকে সমাজ হয়ে দেশ,

কখনো মনের ভেতর জাগে বিদেশ!

সময় নেই কারো দিকে তাকাবার,

বড় হওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত জীবন পার।

আশার সীমানা বড় অন্তহীন,

কিছু ধরা পড়ে, আর বাকিরা মলিন।

চারপাশের কাজ শেষ না হতেই

ঘণ্টা যে বেজে ওঠে মাঝপথেই!

সবই পড়ে রবে, মিছে খাই-খাই,

হারিয়ে যাব যখন-তখন—এই আছি, এই নাই!

মেয়েদের কোনো বাড়ি নাই

অমিত মামুন

আমার মায়ে মাঝে মাঝে কইত,

''তাঁর কোনো বাড়ি নাই।''

জন্মসূত্রে একটা বাড়ি পাইছিলেন বটে,

বিয়ের পরে সেই বাড়িও তাঁর কপালে জোটে নাই।

মাইনসে বলাবলি করছিল, স্বামীর বাড়িই তাঁর বাড়ি।

আমার বাপ মরে যাওয়ার পরও

মাইনসে বলাবলি করছিল, স্বামীর বাড়িই তাঁর বাড়ি—

একবারও কেউ বলে নাই, এটাই তাঁর বাড়ি।

স্বামীর বাড়িতেই মায়ের জায়গা হইছিল,

মাইনসে বলাবলি করছিল, অবশেষে বউডা বাড়ি পাইছে।

কিন্তু ক্রিয়েটিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে কিডনির বিকলতায়

সেই বাড়ির অধিকারও চলে গেছে!

এখন হাসপাতালের বিছানায় চলে মায়ের যৌথ পরিবার।

হাসপাতালের বিছানায় গোঙাতে থাকা মায়ের মুখে

অস্ফুট শোনা যায় সেই আগের কথাগুলোই—

"মেয়েদের কোনো বাড়ি নাই,

সাড়ে তিন হাত মাটি ছাড়া

মেয়েদের কোনো বাড়িই নাই।"

কবিতার সাথে ঘর গেরস্থালি

শেখর ভট্টাচার্য

কবিতার কাব্যকলা কিছুটা পড়েছি ইংরেজি সাহিত্য পাঠ করার সময়। কাব্যকলা পড়া থাকায় কবিতা লিখতে ভয় পাই বেশি। ওই যে একটা গল্প আছে—একজন নরসুন্দর ক্ষুর চালিয়ে মানুষের শরীরের শল্যচিকিৎসা করে খাচ্ছিলেন দিব্যি। যখন তাঁকে এ বিষয়ে একটু গভীর জ্ঞান দেওয়া হলো, হিতে বিপরীত! ক্ষুর চালাতে হাত কাঁপে। আপনি যখন জেনে যাবেন কবিতা গদ্যের মতো নয়, কবিতা শুধু অন্তমিল নয়, তখন কবিতা লেখা কঠিন হয়ে যায়।

কবিতার সাথে ঘর-গেরস্থালি করতে হলে বেশ কিছু বিষয় জানতে হয়। ন্যূনতম আপনাকে জানতে হবে কয়েকটি বিষয়—রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, প্রতীক, অনুপ্রাস, ছন্দ। শুধু জানলেই হবে না, এর ব্যবহারও জানতে হবে। শব্দভাণ্ডারে থাকতে হবে "বিবিধ রতন" এবং অজস্র শব্দ। কাব্যকলা জেনেও কি কবিতা লেখা সম্ভব? কবিতার জন্য কাব্যভূমি চাই। জমিতে বীজ ফেলার আগে জমি প্রস্তুত করতে হয়; কবিতার কাব্যভূমি হলো মন। মন প্রস্তুত থাকলে কবিতার ঘোর কবিকে পেয়ে বসে। কবিতার মনোভূমি তৈরির জন্য চাই অজস্র কবিতা পাঠ। দেশ-বিদেশের ধ্রুপদী, আধুনিক, উত্তর-াধুনিক কবিতায় মনোনিবেশ না করলে কবিতার স্রোত মস্তিষ্কে কিংবা হৃদয়ে আসবে না।

কবিতার ঘোর কখনো আচ্ছন্ন করে ফেলে। কবিতায় পেয়ে গেলে অন্য কিছু আর লিখতে ইচ্ছা করে না। আমরা ছোটবেলায় শুনতাম, ওই মেয়েটিকে ভূতে পেয়েছে। মেয়েদেরকেই কেন ভূতে পেত জানি না। ভূতে পাওয়ার উদাহরণ দিলাম, কেউ ভুল বুঝবেন না। কবিতায় ডুবে যাওয়াকে আমি বলি 'ঘোর' সৃষ্টি হওয়া। ঘোর এলে কবিতা আসে; ঘোর না এলে কবিতা লেখা যায় না। কবিতা নির্মাণ করতে হয়, আবার কবিতা নির্মিত হয়েও যায়। যে কবিতা পরিশুদ্ধভাবে নির্মিত হয়ে যায়, সেটিকে মৌলিক কবিতা বলতে পারি আমরা। বিশ্বসাহিত্যে মৌলিক কবিতার সংখ্যা খুব সীমিত। নজরুলের "বিদ্রোহী" আমার কাছে মৌলিক কবিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কবিতা নিয়ে এত কথা বলে কেন কবি? কবি যখন প্রবলভাবে কবিতাক্রান্ত হয়ে পড়েন, তখন কবিতায় ছেয়ে যায় হৃদয়। কবিতায় পেয়ে যায় কবির সমস্ত ইন্দ্রিয়। কবিতার মান যাই হোক, কবিতায় ডুবে যাওয়া কিংবা ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করার মধ্যে আনন্দ আছে ভিন্ন—অন্য রকম।

কবিতা নিয়ে রোমান্টিক যুগের কবি মহামতি ওয়ার্ডসওয়ার্থ খুব সুন্দর কথা বলেছেন। কথাটি হলো: "Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings; it takes its origin from emotion recollected in tranquility"। অর্থাৎ কবিতা হলো গভীর অনুভূতির তীব্র বহিঃপ্রকাশ; প্রশান্ত মননে রোমন্থিত আবেগ থেকে কবিতার জন্ম। অনুবাদের বাংলাটি একটু কঠিন হয়ে গেল বলে মনে হয়। আরও সহজ, আরও বোধগম্য বাংলা করতে পারলে ভালো লাগত— "এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু।"

এই যে প্রশান্ত মন, সেখানেই ঘোর তৈরি হয়। এ কারণে আমার মনে হয় কবিতার ঘোর থেকে বের হয়ে গদ্য লেখা বড় কঠিন। আবার দীর্ঘ সময় গদ্যে মনোযোগী থাকলে কবিতার ঘোরে প্রবেশ করা সহজ নয়। লেখক আনিসুল হক কবিতা, উপন্যাস, গদ্য, কার্টুনসহ অনেক কিছু লিখে সাফল্য অর্জন করেছেন। আনিসুল হক রংপুর থেকে ঢাকা এসেছিলেন কবি হতে, যদিও তিনি বুয়েটের শিক্ষার্থী ছিলেন। কবিতা তাঁকে প্রকৌশল জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তিনি যখন ঢাকায় আসেন, আমার ধারণা আশির দশকে। আনিসুল হক আরও ভালো কবিতা লেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবিদের কাছে পরামর্শ নিতে শুরু করেন। তারা পরামর্শ দিতেন, "কবিতা লিখতে হলে কবিতায় মনোনিবেশ করো। গদ্যের কাছাকাছি যেয়ো না। কবিতার ঘোর, কবিতার ভাবের সামনে গদ্য বাঁধের মতো দাঁড়িয়ে যাবে।"

এসব বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছানো বড় কঠিন। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সৈয়দ হক পর্যন্ত অগণন লেখক আছেন যারা সব্যসাচী—দুহাত ভরে সবকিছু লিখেছেন।

মরমী কবিরা যেমন সারাজীবন কাটান অন্য একটি জগতে, কবিরাও অন্তত কবিতা লেখার সময় কিছুটা হলেও ধ্যানমগ্ন থাকেন। কবিরাও কিছুটা 'সাঁইজি' ভাবধারা দ্বারা আক্রান্ত। কবিতা লেখা আমার কাছে খুব কঠিন কাজ। অনেকেই মনে করেন কবিতা বুঝি শুধুমাত্র আবেগে পরিপূর্ণ শিল্প। কবিতায় আবেগ থাকে; কিন্তু সাথে যুক্তি, বিজ্ঞান, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অঙ্কসহ তাবৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজন হয়। কবিতাতে স্থিত হওয়া বড় কঠিন।

কবিতার আকাশ বিস্তৃত হোক। পরিশুদ্ধ মানুষ প্রশান্ত মনের কবিতা পড়ুক। পৃথিবী কবিতাময় হয়ে উঠুক।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন