https://www.prothomalony.com/

18372

opinion

অভিমত

বৃহৎ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের অভিঘাত: গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৩৪

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে নয়; ভিন্নমতের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ এবং নাগরিক অধিকারের সমান সুরক্ষায়। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তার পরীক্ষা হয় বিশেষত তখন, যখন ক্ষমতাসীনদের সামনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অধিকার রক্ষার প্রশ্ন আসে। বৃহৎ জনসমর্থনসম্পন্ন কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত তাই নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর।

রাজনৈতিক দল কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, আশা ও প্রতিনিধিত্বের আকাঙ্ক্ষা। দলীয় কার্যক্রম বন্ধ করা গেলেও সমর্থকদের মতাদর্শ প্রশাসনিক নির্দেশে বিলুপ্ত হয় না। বরং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত হলে একাংশের মধ্যে বঞ্চনা, হতাশা ও ক্ষোভ জমতে পারে। তাদের কণ্ঠস্বর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত না হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভোটার বাস্তব বিকল্পের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রতিযোগিতার বাইরে একটি বড় শক্তিকে রাখা হলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকলেও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার কারণ, প্রক্রিয়া ও মেয়াদ জনগণের কাছে পরিষ্কার না হলে গুজব, অনাস্থা এবং উত্তেজনা বাড়ে। সরকার ও বিরোধী শক্তি উভয়েরই দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ সংলাপের সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত কখনো দুর্বলতা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার শর্ত।

অবশ্য কোনো দলই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সহিংসতা, দুর্নীতি কিংবা গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে স্বাধীন তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ জরুরি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনানুগ সীমাবদ্ধতার প্রয়োজনও বিশেষ পরিস্থিতিতে দেখা দিতে পারে। কিন্তু পুরো একটি দলকে নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপের জন্য সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি, পর্যাপ্ত প্রমাণ, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা অপরিহার্য। ব্যক্তির অপরাধের অভিযোগকে নির্বিচারে সব সমর্থকের রাজনৈতিক অধিকার হরণের যুক্তি বানানো যায় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যখন দল নিষিদ্ধের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, হুমকি, বাড়িঘরে হামলা কিংবা জোরপূর্বক ঘরছাড়া করার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু রাজনৈতিক নিপীড়নের বিষয় থাকে না; ন্যায়বিচার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন, আইনজীবীর সহায়তা এবং নিরপেক্ষ আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অধিকার লঙ্ঘন না করার মধ্যেই শেষ নয়; সম্ভাব্য লঙ্ঘন প্রতিরোধ এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ প্রতিকার নিশ্চিত করাও তার কর্তব্য। গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, যথাযথ চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা এবং আদালতের কার্যকর নজরদারি মৌলিক সুরক্ষার অংশ। এসব নিশ্চয়তা কোনো দলের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ নয়; নাগরিক হিসেবে সবার সমান প্রাপ্য। অপরাধের বিচার প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে হতে হবে, পরিচয় বা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নয়।

রাজনৈতিক সংকটের মূল্য শুধু নেতাকর্মীরা দেন না; তাদের পরিবারও বহন করে। কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গ্রেপ্তার, আত্মগোপন বা দীর্ঘ আইনি জটিলতায় পড়লে সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে, সংসারে আর্থিক অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সমাজেও। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস পরবর্তী প্রজন্মের মনোজগতেও স্থান করে নিতে পারে। তাই রাজনৈতিক বিরোধের মানবিক পরিণতি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে বিরোধী পক্ষকে শত্রু নয়, বিকল্প মত ও নীতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। ক্ষমতার পালাবদল সেখানে স্বাভাবিক; কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনে নাগরিকের অধিকার বদলে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে না। প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক শক্তির সম্পদ নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে ক্ষতি শুধু আজকের বিরোধী দলের নয়, আগামী দিনের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—সবার।

রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্বল্পমেয়াদে কোনো দলের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড থামাতে পারে, কিন্তু সামাজিক অসন্তোষের মূল কারণ দূর করে না। অংশগ্রহণের বৈধ পথ বন্ধ থাকলে গোপন তৎপরতা, মেরুকরণ ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রতিহিংসা পাল্টা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়; আর প্রতিটি নতুন পালা সমাজে সমঝোতার পথ আরও সংকীর্ণ করে। রাজনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, ন্যায্যতা ও নাগরিক আস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।

এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলতে পারে। বিশ্বাসযোগ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে আন্তর্জাতিক সংস্থা, কূটনৈতিক অংশীদার ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা উদ্বেগ জানাতে পারেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী স্বাধীন তদন্ত কিংবা জবাবদিহির আহ্বান আসতে পারে। তবে কূটনৈতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা কোনো স্বয়ংক্রিয় ফল নয়। রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় বাইরের সমালোচনা উপেক্ষা করা নয়; দেশের ভেতরেই আইনের শাসন ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো বিশেষ দলের রাজনৈতিক সুবিধা নয়; প্রশ্ন রাষ্ট্রের ন্যায়ভিত্তিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ থাকবে কি না। যে আইন আজ এক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে, কাল অন্য পক্ষও তার মুখোমুখি হতে পারে। অতএব রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নিয়ম এমন হওয়া উচিত, যাতে ক্ষমতা পরিবর্তিত হলেও নাগরিক নিরাপত্তা, ন্যায্য বিচার এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অধিকার অক্ষত থাকে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই নীতিতে ঐকমত্য গড়া জাতীয় প্রয়োজন।

সমাধানের পথ প্রতিহিংসা কিংবা দায়মুক্তি—কোনোটিই নয়। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ, বেআইনি হয়রানির কার্যকর প্রতিকার, স্বাধীন আদালত এবং সব পক্ষের জন্য শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ন্যায্য সুযোগ। রাজনৈতিক সমঝোতা কখনো অপরাধ আড়াল করার নাম হতে পারে না; আবার বিচারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার হাতিয়ার হতে পারে না।

ইতিহাস ক্ষমতার সাময়িক সাফল্যের পাশাপাশি তার নৈতিক মূল্যও বিচার করে। প্রশাসনিক ক্ষমতায় কোনো দলের কার্যক্রম সীমিত করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে স্থায়ীভাবে নির্বাসিত করা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বিরোধী পক্ষকে নীরব করার সক্ষমতায় নয়; ভিন্নমতের নাগরিককেও নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সাহসে। যে রাষ্ট্র এই সত্য উপলব্ধি করে, তার গণতন্ত্রই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ভিত্তি পায়।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন