https://www.prothomalony.com/
18351
opinion
ইউটিউবে নাটক-ডকুমেন্টারী দেখা আমার নিত্য অভ্যাস। মোশাররফ করিম,বাঁধন, সিয়াম, মম, চমক, অর্ষা, ইরেশ, আজাদ আবুল কামাল, পরীমনি, সাফা কবির, পার্থ বড়ুয়া সহ আরো কিছু নাম আছে থাকলে সে নাটক বা সিনেমা দেখি না। মন সায় দেয় না । কানের কাছে চিৎকার শুনি ‘ইনকিলাব' ‘ইনকিলাব'। কেন এমন হয়?
ইউটিউবে আছে মজার মজার বিষয়। মুক্ত দুনিয়ার ‘খোলাসা বয়ান'। যার যা ইচ্ছা বলছে, বলাচ্ছে, দেখাচ্ছে। আছে আমাদের কিছু হুজুরের বয়ানও। ফিফা বিশ্বকাপের সময় শুনলাম, এই হুজুররা বলছেন, আমাদের ধর্মে খেলা হারাম? কি অদ্ভুত কথা। জেনেশুনে এতটা মুসলিম দেশ বিশ্বকাপে খেললো ? সৌদী আরব, কাতার, মিশর, মরক্কো, আলজেরিয়া, জর্ডান, তুরস্ক, ইরান, তিউনিসিয়া, সেনেগাল এই মুসলিম দেশগুলো নাফরমানী বেদআতি করেছে? মনে হয়, বাংলাদেশের গুণী হুজুরদের ফতোয়া তাদের কাছে পৌঁছে নি!
এই হুজুররা বেদআতের তালিকা নিয়ে বসে আছেন। এটা করা যাবে না, ওটা হারাম, কবিরা গুনাহ, অমুক দিবস বেদআত। আরো আছে, ঘরে কি থাকলে জিন এসে যায়, পাদ দিলে কি করতে হবে, চিংড়ি-কাকড়া খাওয়া যাবে কিনা এ সব বিষয়ে বয়ান। আমার মনে হয়, মুক্ত জ্ঞান চর্চার পথে তারা বিরাট বাধা। জ্ঞান আহরণের দরজাগুলোর সামনে লাঠি হাতে তারা দাঁড়িয়ে আছেন, সাবধান, এ পথে এসো না। শাসকরাও তাদের খাতির-যত্ন করেন, পাবলিককে ঘুম পাড়ানোর মন্ত্র তাদের চেয়ে আর কে ভালো জানেন?
ষাটের দশকে সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক অভিবাসন হয়। এর প্রভাব স্থানীয় সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনে পড়ে। বিলাত প্রবাসীদের অর্থে মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মনে আছে, সে সময় একটি মহল প্রচারণা চালায়, বিলাত প্রবাসীরা রেস্টুরেন্টে মদ বিক্রি করেন, তাদের উপার্জিত অর্থ হালাল নয়, মসজিদ-মাদ্রাসায় নেয়া যাবে না। পরে দেখা যায়, প্রায় সবাই নিচ্ছে, এমনকি বিলাত সফর করে ব্যাগ ভর্তি পাউন্ড-স্টার্লিং নিয়ে ঘরে ফিরছেন। এক প্রবাসী জানিয়েছিলেন, ম্যানচেস্টারের এক গৃহবধু মওলানা দেলওয়ার হোসেইন সাঈদীর ওয়াজ শুনে তার তিলে তিলে জমানো এক হাজার পাউন্ড হুজুরের হাতে তুলে দেন।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দাপট বেড়েছে তৌহিদী জনতার। খবরে দেখলাম, বিয়ানীবাজারে তারা নৌকা বাইচ করতে দেবে না। নৌকা বাইচ কি নাজায়েজ? এই তৌহিদী জনতা (যাদের গুরু মবের জনক) হামলা করেছে গানের জলসায়, বাউলের মেলায়, মাজারে মাজারে। হজরত শাগপরাণের মাজারে হামলার দৃশ্য দেখেছি লাইভে। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি লালনের মাজার। তারা কি জানে না, লালন-হাসন রাজা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ।
সম্প্রতি হাত পড়েছে হজরত শাহজালালের (রঃ) মাজারে। আপাততঃ মনে হবে, একটা ভালো কাজ। ভেতরে কিন্তু অন্য। ‘গুপ্ত'র গন্ধ মিলছে। একটি মহল মাজার বিলুপ্তির চেষ্টায় রত বহু আগে থেকে। তারা চায় বাউল-ফকিরদের উচ্ছেদ। খাদেমদের কর্তৃত্বের অবসান। এই মহল মাজার বিরোধী, ধর্মীয় চেতনাধারী। বিশ্বাস করে না মাজারের অস্থিত্বে। অবশ্য মহলটি কখনো সফল হয়নি। আমার এই বয়সে দেখেছি, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, গভর্ণর মোনেম, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হোসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, সম্প্রতি তারেক রহমান ও গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি ফখরুল ইসলাম আলমগীর হজরত শাহজালালের মাজার জিয়ারত করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা হজরত শাহপরাণের মাজারও জিয়ারত করেন। এই মাজার দু'টির প্রতি সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমার জানামতে, শুধু একজন কখনো যান নি মাজারে, তিনি প্রধান উপদেষ্টা মুহম্মদ ইউনুস।
উল্লেখ্য, মোগল আমল থেকে হজরত শাহজালালের পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত সিলেট নিষ্করের মর্যাদা ভোগ করে আসছে। অর্থাৎ শাহজালালের সম্মানার্থে এই ভূমির কোন কর নেই। মোগল, বৃটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমলে সিলেট এই অনন্য মর্যাদা ভোগ করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব সহ বড় বড় আমলা,কেউ কখনো যা সাহস করেননি, সম্প্রতি জেলা পর্যায়ের এক আমলা সেই দুঃসাহস দেখিয়েছেন। হাত লাগিয়েছেন হজরত শাহজালালের মর্যাদা ও ঐতিহ্যে। লোকজন বলাবলি করছে, এই আমলা মাজার বিরোধী সেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চেতনাধারী দলের ‘গুপ্ত' সদস্য। সুযোগ বুঝে তাঁর পদকে হীন কাজে ব্যবহার করেছেন।
কি করেছেন কিনি? মাজারের দান বাক্স বা ডেগগুলো সীলগালা অর্থাৎ সরকারী তালা লাগিয়েছেন। এ ডেগের টাকা ভক্তদের দান বা মানতের অর্থ, সরকারের কর বা খাজনা নয়। আপনি কি ভেবেছেন এগুলো সরকারের রাজস্ব? অবশ্যই না। সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লন্ডন, নিউইয়র্ক সহ বিশ্বের নানা জায়গার মানুষ বিপদে-আপদে, বালা-মুসিবতে মানত করেন, কেউবা স্বপ্ন দেখে, কেউ ভালবেসে শাহজালালের দরগায় অর্থ দান করেন। এই অর্থ মাজার পরিচালনা, উন্নয়ন সহ নানা জনহিতকর কাজে ব্যয় হয়ে থাকে। আমাদের শৈশব কৈশোরে দরগার মোতওয়াল্লী এ জেড আব্দুল্লাহর নাম শুনেছি, সিলেটের গর্বের ধন মুসলিম সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান রয়েছে। আল-ইসলাহ সম্পাদক গুণীজন মুহম্মদ নূরুল হককে বসবাসের জমি দিয়েছেন। তাঁর উত্তরাধিকারী পুতুল ভাইর নাম শুনেছি, নানা জনহিতৈষী কাজে অবদান রেখেছেন। মোতওয়াল্লী পরিবার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার অধিকারী।
মানুষের মানতের অর্থ খাজনার মতো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। পরে হাত দেয়া হবে অন্যান্য কিছুতে। এক সময় দেখা যাবে, মাজারের অস্থিত্ব নিয়ে টাটাটানি। স্কুল-কলেজ, মিল-ফ্যাক্টরী সরকারীকরণের কথা শুনেছি, দরগার কথা এই প্রথম শুনলাম। সরকারীকরণের এ প্রয়াস কি ন্যায়সঙ্গত? যদি কোন অনিয়ম হয়ে থাকে, আয়-ব্যয়ের হিসাব চাইতে পারেন। খাদেম বা খাদেমদের সম্পত্তির বিবরণী চাইতে পারেন। এসব না করে মাজারে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিসের ঈঙ্গিত দেয়? গুপ্তদের ‘গুপ্ত' ইচ্ছা পূরণ?
হজরত শাহজালালের মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষায় সিলেটবাসী সোচ্চার হবেন, এই আশা করছি।
–নিউইয়র্ক।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন