https://www.prothomalony.com/
18349
opinion
বাংলাদেশের বায়ুদূষণ, জনস্বাস্থ্য ও মানুষের আয়ু
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:২১
আমরা প্রায়ই শুনি—বাংলাদেশের বাতাস খুব দূষিত। এই বাতাসে দীর্ঘদিন শ্বাস নিলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, নানা ধরনের অসুখ হতে পারে, মানুষের আয়ু কুমে যায়, ইত্যাদি। কথাগুলো বহুবার শুনেছি, কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই দূষণ আমাদের শরীর ও জীবনের ওপর ঠিক কতটা প্রভাব ফেলছে, সে সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল না।
তাই ভাবলাম, বিষয়টি নিয়ে একটু খোঁজখবর করে দেখি। জানতে চাইলাম—আমরা প্রতিদিন যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, সেটি আসলে কতটা দূষিত? এই দূষণ আমাদের কী ধরনের অসুখের ঝুঁকিতে ফেলছে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এর প্রভাব কি শুধু অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি আমাদের আয়ুর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে?
খুঁজতে গিয়ে University of Chicago-এর Air Quality Life Index (AQLI) 2025-এর একটি তথ্য আমাকে বেশ নাড়া দিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে PM2.5 বা অতিসূক্ষ্ম বায়ুকণার পরিমাণ যদি স্থায়ীভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মাত্রায় নামিয়ে আনা যায়, তাহলে একজন গড় ঢাকাবাসীর প্রত্যাশিত আয়ু প্রায় সাত বছর বাড়তে পারে। সহজ ভাষায় বললে, ঢাকার বাতাসে অতিরিক্ত PM2.5 দূষণের কারণে একজন গড় ঢাকাবাসীর সম্ভাব্য আয়ু প্রায় সাত বছর কমে যাচ্ছে।
সাত বছর!
মানুষের জীবনের হিসাবে সাত বছর মোটেই কম সময় নয়। এই একটি তথ্যই আমাকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ তৈরি করে দেয়।
সংখ্যাটি প্রথম যখন দেখি, তখন প্রবন্ধটি ভালো করে বোঝার জন্য দ্বিতীয়বার পড়ি। সাত বছর! একটি মানুষের জীবনের হিসাবে এটি অনেক বড় সময়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, মানুষের জন্ম ও মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। একই সঙ্গে আমি এটাও বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে চিন্তা করার, কারণ খোঁজার এবং ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তাই কোন বিষয় আমাদের স্বাস্থ্য ও জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেটি বোঝা এবং সম্ভব হলে সেই ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করাও আমাদের দায়িত্ব। বায়ুদূষণের বিষয়টিকে আমি সেভাবেই দেখি।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এই সাত বছরের হিসাবের অর্থ এই নয় যে ঢাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের জীবন থেকে ঠিক সাত বছর কেটে যাবে। এটি একটি জনগোষ্ঠীভিত্তিক হিসাব—দীর্ঘদিন PM2.5-এর সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি জনগোষ্ঠীর গড় আয়ুর ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব। ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব কম-বেশি হতে পারে। তারপরও সাত বছরের সংখ্যাটি আমাদের সমস্যাটির মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে।
PM2.5 আসলে কী?
আমরা যারা পরিবেশ বা জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করি না বা তেমন খোঁজখবর রাখি না, তাদের কাছে PM2.5 শব্দটি একটু technical মনে হতে পারে। তাই বিষয়টি সহজ করে বর্ণনা করার চেষ্টা করছি।
বায়ুদূষণ বললে আমরা সাধারণত গাড়ির কালো ধোঁয়া, রাস্তার ধুলা কিংবা নির্মাণকাজের ধুলার কথা ভাবি। এগুলো আমরা চোখে দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর দূষকগুলোর কিছু এত ছোট যে খালি চোখে আলাদাভাবে দেখা যায় না। PM অর্থ Particulate Matter বা বায়ুতে ভাসমান অতিসূক্ষ্ম কণা। আর 2.5 বলতে বোঝায় ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়েও ছোট কণা।
একটি উদাহরণ দিলে আকারটি বোঝা সহজ হবে। মানুষের একটি চুলের গড় প্রস্থ প্রায় ৭০ মাইক্রোমিটার। অর্থাৎ PM2.5-এর সবচেয়ে বড় কণাটিও একটি চুলের প্রস্থের প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ।
এগুলো শুধু সাধারণ ধুলার কণা নয়। এর মধ্যে থাকতে পারে ধোঁয়া, কালো কার্বন, বিভিন্ন ধাতু ও রাসায়নিক যৌগের অতিক্ষুদ্র কণা এবং তরল কণা। এত ছোট বলেই এগুলো বিপজ্জনক। বাতাসের বড় ধুলাবালির অনেকটাই আমাদের নাক ও শ্বাসনালিতে আটকে যায়। কিন্তু PM2.5-এর কণা ফুসফুসের অনেক গভীরে পৌঁছাতে পারে। কিছু কণা ফুসফুসের স্বাভাবিক বাধা অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন PM2.5 নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, COPD, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। WHO-এর ২০২১ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, PM2.5-এর বার্ষিক গড় হওয়া উচিত ৫ µg/m³ বা তার কম। খুব সহজ ভাষায় বলা যায়—দূষণ যত কম, স্বাস্থ্যের জন্য তত ভালো।
এখন দেখা যাক, বাংলাদেশের অবস্থা কতটা খারাপ
AQLI 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় পুরো এলাকাতেই PM2.5-এর মাত্রা WHO-এর নির্দেশিত মাত্রার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে কম দূষিত জেলা লালমনিরহাটকে বলা হয়। অথচ সেখানকার দূষণের মাত্রাও WHO-এর নির্দেশিত মাত্রার প্রায় সাত গুণ। এই সংখ্যাটিও উদ্বেগজনক।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যে পরিবর্তন হয়েছে, তার অনেকটাই আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি যে বাংলাদেশে বড় হয়েছি আর আজকের বাংলাদেশ—দুটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল।
মাথাপিছু আয় বেড়েছে। নতুন রাস্তা হয়েছে। সেতু হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। শিল্পকারখানা বেড়েছে। গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। ঢাকা একটি বিশাল মহানগরে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের অনেক কিছুই আমাদের গর্বিত করেছে।
কিন্তু একই সময়ে আমাদের নিঃশ্বাসের বাতাসও আরও দূষিত হয়েছে। এখানেই উন্নয়ন নিয়ে আমার মনে একটি প্রশ্ন আসে। উন্নয়ন যদি আমাদের জীবনকে সহজ করে, কিন্তু সেই উন্নয়নের পরিবেশগত মূল্য যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের অসুস্থ করে এবং আমাদের আয়ু কমিয়ে দেয়, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য আমরা কীভাবে হিসাব করব?
শুধু ঢাকা নয়—দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা
বায়ুদূষণ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর একটি। AQLI 2025-এর তথ্য অনুযায়ী, PM2.5 স্থায়ীভাবে WHO-এর নির্দেশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা গেলে গড় আয়ুর সম্ভাব্য বৃদ্ধি আনুমানিক—
দিল্লি — ৮.২ বছর
ঢাকা — ৬.৯ বছর
লাহোর — ৫.৮ বছর
ইসলামাবাদ — ৪.৫ বছর
করাচি — ২.৭ বছর
কাঠমান্ডু — প্রায় ২.৬ বছর
তালিকাটি দেখলে বোঝা যায়, ঢাকার সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই গুরুতর নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দূষণপ্রবণ বড় শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
এই বাতাস আমাদের শরীরে কী করছে?
কাউকে সিগারেট খেতে দেখলে আমরা জানি, তিনি ক্ষতিকর কিছু শরীরে নিচ্ছেন। কেউ মদ খেলে আমরা মনে করি, তার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু PM2.5-এর সমস্যাটা একটু অন্যরকম। এটি বেশির ভাগ সময় আমরা দেখতে পাই না। এর কোনো গন্ধও সবসময় টের পাওয়া যায় না। অথচ আমরা শ্বাস নেওয়া বন্ধ করতে পারি না।
WHO বায়ুদূষণকে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, COPD, হাঁপানি ও ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। State of Global Air 2025-এর হিসাবে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে দুই লাখের বেশি মৃত্যু বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বিশ্বব্যাপী সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭৯ লাখ। এ কারণেই বায়ুদূষণকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
World Bank-এর আরেকটি গবেষণায় ২০১৯ সালের তথ্য ব্যবহার করে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ঘরের ভেতরের ও বাইরের বায়ুদূষণ মিলে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং প্রায় ২৫০ কোটি দিনের অসুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তাদের হিসাবে এর স্বাস্থ্যগত অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা GDP-এর প্রায় ৮.৩ শতাংশের সমপরিমাণ।
উপরের দুটি গবেষণার বছর ও গবেষণাপদ্ধতি আলাদা, তাই মৃত্যুর সংখ্যাগুলো এক নয়। তবে দুটিই একই দিকে ইঙ্গিত করে।
বায়ুদূষণের মূল্য শুধু অকালমৃত্যুই নয়। এর আরও অনেক ক্ষতি আছে। মানুষ প্রায়ই অসুস্থ থাকে। চিকিৎসার খরচ বাড়ে। কাজে মন দিতে পারে না, কাজ থেকে ঘন ঘন ছুটি নিতে হয়। ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। পরিবার আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে।
শিশুদের কথা একবার ভাবুন
ঢাকায় জন্ম নেওয়া একটি শিশুর কথা ভাবুন। সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলার মধ্যে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। স্কুল থেকে ফেরার সময় একই বাতাস। বিকেলে বাইরে খেলতে গেলেও সেই একই বাতাস।
তার ফুসফুস তখনও বেড়ে উঠছে। শরীর বিকাশের পর্যায়ে। কিন্তু প্রতিদিন তাকে সেই দূষিত বাতাসই শ্বাস নিতে হচ্ছে। আমরা যারা আজ সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, শহর তৈরি করছি, রাস্তাঘাট নির্মাণ করছি, শিল্পকারখানা চালাচ্ছি—আমাদের সিদ্ধান্তের ফল তাকে আগামী বহু বছর বহন করতে হবে।
এখানে এসে বায়ুদূষণ আমার কাছে আর শুধু পরিবেশের সমস্যা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্বের প্রশ্ন।
ঢাকার PM2.5 কোথা থেকে আসে?
আমরা অনেক সময় মনে করি, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ গাড়ির ধোঁয়া। আমিও একসময় বিষয়টি প্রায় সেভাবেই ভাবতাম। কারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির কালো ধোঁয়া আমাদের চোখে পড়ে। গাড়ির ধোঁয়া অবশ্যই সমস্যার অংশ। কিন্তু পুরো ছবিটি আরও জটিল।
Bangladesh National Air Quality Management Plan 2024–2030-এ বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় স্থানীয়ভাবে তৈরি PM2.5-এর প্রধান উৎসগুলোর একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে—
রান্নার চুলা — ২৮%
বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র — ২৪%
ইটের ভাটা — ১৩%
পৌরসভার আবর্জনা পোড়ানো — ১১%
রাস্তার ধুলা — ৮%
যানবাহনের নির্গত ধোঁয়া — ৪%
অন্যান্য উৎস থেকে - ১২%
এই তথ্যটি আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা চোখে গাড়ির কালো ধোঁয়া দেখি বলে গাড়িকেই সহজে প্রধান অপরাধী মনে করি। কিন্তু PM2.5-এর বড় একটি অংশ এমন সব উৎস থেকে আসে, যেগুলো সবসময় আমাদের চোখে পড়ে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন দহনপ্রক্রিয়া থেকে SO₂ ও NOx-এর মতো গ্যাস বের হয়। এগুলো বাতাসে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরে নতুন PM2.5 তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ চোখে যে ধোঁয়া দেখি, সেটিই পুরো গল্প নয়।
দূষণের কোনো পাসপোর্ট নেই
আরেকটি বিষয়ও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুদূষণ দেশের সীমানা মানে না। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে আলাদা দেশ হলেও এই অঞ্চলের বিশাল অংশ একই আন্তঃসংযুক্ত বায়ুমণ্ডলীয় অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। বাতাসের সঙ্গে দূষণ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
তাই ঢাকায় আমরা যে PM2.5 মাপছি, তার প্রতিটি কণা ঢাকার মধ্যেই তৈরি হয়েছে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিষয়টা অনেকটা একটি পুকুরের মতো। পুকুরের এক পাশ আমরা প্রতিদিন পরিষ্কার করছি, আর অন্য পাশে যদি নিয়মিত ময়লা ফেলা হয়, তাহলে পুরো পুকুর পরিষ্কার রাখা কঠিন।
সে কারণেই বাংলাদেশের নিজের দূষণ কমানো যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান, দূষণ নিঃসরণ কমানো এবং আঞ্চলিকভাবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কাজ করা দরকার।
বাংলাদেশ কী করছে?
এ কথা বলা ঠিক হবে না যে বাংলাদেশে কিছুই করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ Air Pollution Control Rules 2022 গ্রহণ করেছে এবং National Air Quality Management Plan 2024–2030 তৈরি করেছে।
২০২৫ সালে World Bank ২৯০ মিলিয়ন ডলারের Bangladesh Clean Air Project অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূষণ নিঃসরণ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র উন্নত করা এবং ভ্রাম্যমাণ দূষণ পরীক্ষা চালুর মতো উদ্যোগ রয়েছে। ঢাকায় পুরোনো ডিজেল বাসের পরিবর্তে ৪০০টি দূষণমুক্ত বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়টি কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—নীতি তৈরি করা আর মাঠে তার ফল পাওয়া এক কথা নয়।
ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার দূষণ পর্যবেক্ষণ, নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা পরিষ্কার রাখা, পুরোনো দূষণকারী বাস-ট্রাক সরানো, কার্যকর যানবাহন পরিদর্শন, খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করা এবং রান্নায় ব্যবহৃত জৈব জ্বালানির পরিচ্ছন্ন বিকল্প—সবকিছুর ওপরই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আইন প্রয়োগের সম্পর্ক থাকতে হবে। AQI মাপলাম, প্রতিবেদন তৈরি করলাম, দূষণ কত তা জানলাম—এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে গেলে তো রোগ ভালো হয় না। পরিমাপের শেষ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কাজ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে কি কিছু শেখার আছে?
এই জায়গায় এসে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার কথা আমার মনে পড়ে। আমি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছি। কর্মজীবনেরও একটি বড় অংশ এখানে কেটেছে। আমি U.S. Department of Transportation-এ কাজ করলেও বহুদিন U.S. EPA-এর সঙ্গে যৌথ বায়ুমান গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছি। তাই বাংলাদেশের পরিবর্তন যেমন বাইরে থেকে নয়, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখেছি, তেমনি একটি উন্নত দেশ কীভাবে পরিবেশগত আইনকানুন প্রয়োগ করে, সেটিও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাতাস কিন্তু সবসময় আজকের মতো ছিল না। শিল্পায়ন, কয়লার ব্যবহার এবং দ্রুত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে একসময় দেশটির অনেক শহরেই বায়ুদূষণ বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল। ১৯৭০ সালের Clean Air Act এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং মোটরযানসহ বিভিন্ন উৎসের দূষণ নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলাফলটি বেশ চমকপ্রদ।
U.S. Environmental Protection Agency বা EPA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক গড় PM2.5-এর ঘনত্ব প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে।
আরও বড় ছবিটি দেখলে বিষয়টি আমার কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ১৯৭০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের GDP বেড়েছে প্রায় ৩৩৮ শতাংশ, জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং যানবাহনের মোট চলাচল বেড়েছে প্রায় ১৯৫ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ছয়টি প্রধান বায়ুদূষকের মোট নিঃসরণ কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ।
অর্থাৎ অর্থনীতি বড় হয়েছে, মানুষ বেড়েছে, গাড়ি আরও বেশি চলেছে—তারপরও বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।আমার কাছে এই তথ্যটির গুরুত্ব এখানেই। অনেক সময় আমাদের মনে হতে পারে, একটি দেশ উন্নত হলে দূষণ বাড়বেই—এটি হয়তো উন্নয়নের অনিবার্য মূল্য। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা অন্তত দেখায়, বিষয়টি সবসময় এমন হতে হবে না।
সঠিক প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, দূষণ নিঃসরণের মানদণ্ড, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কার্যকর আইন প্রয়োগ থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দূষণ কমানোও সম্ভব। আর পরিষ্কার বাতাসের অর্থনৈতিক লাভও কম নয়। EPA ২০১১ সালে Clean Air Act-এর ১৯৯০ সালের সংশোধনীগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে একটি বড় ব্যয়-সুবিধা গবেষণা করেছিল। তাদের কেন্দ্রীয় হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে এর আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা খরচের তুলনায় ৩০ গুণেরও বেশি হতে পারে। একই বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছিল যে, ২০২০ সালে এসব দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কারণে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এড়ানো সম্ভব হবে।
এখানে অবশ্য মনে রাখা দরকার—এগুলো EPA-এর মডেলভিত্তিক হিসাব, সরাসরি গুনে পাওয়া মৃত্যুর সংখ্যা নয়। তারপরও মূল বার্তাটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার বাতাসের জন্য খরচ শুধু পরিবেশ রক্ষার খরচ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্যও একটি বিনিয়োগ।
অবশ্যই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। দুই দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরব্যবস্থা, শিল্পের ধরন, প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এক নয়। আমি যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণটি দিচ্ছি শুধু একটি কারণে—একটি দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিষ্কার বাতাসের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। দুটিই সম্ভব। কিন্তু তার জন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ দরকার।
উন্নয়নের হিসাবটা অন্যভাবেও করা যেতে পারে
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের পরিবর্তন আমি নিজের চোখে দেখেছি। রাস্তা হয়েছে, সেতু হয়েছে, বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, শিল্পকারখানা বেড়েছে। আয় বেড়েছে, ঢাকা বিশাল শহরে পরিণত হয়েছে। এর অনেক কিছুই একসময় আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো উন্নয়নকে দেখার দৃষ্টিটাও একটু বদলে যায়।
এখন আমার মনে হয়, একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উড়ালসড়ক, দ্রুতগতির সড়ক, মেট্রোরেল আর উঁচু ভবন দিয়ে বিচার করলে উন্নয়নের পুরো ছবিটা দেখা হয় না। আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। মানুষ কতটা নিরাপদে হাঁটতে পারে? সে যে পানি পান করছে, সেটি কতটা পরিষ্কার? শহরে কতটা সবুজ জায়গা আছে? শিশুরা নিরাপদে বাইরে খেলতে পারে কি না? আর সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন— মানুষ যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, সেই বাতাস কতটা নিরাপদ?
খাবার ছাড়া আমরা কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারি। পানি ছাড়াও কিছু সময় থাকা যায়। কিন্তু শ্বাস নেওয়া বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। এই কারণেই বায়ুদূষণের বিষয়টি আমার কাছে এত উদ্বেগজনক মনে হয়। যে PM2.5 আমরা চোখে দেখি না, সেই অতিক্ষুদ্র কণাগুলো প্রতিদিন আমাদের শরীরে ঢুকছে। এর প্রভাব শুধু কাশি কিংবা চোখ জ্বালাপোড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, অকালমৃত্যু এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের গড় আয়ুর সম্পর্ক রয়েছে।
তাই আবার সেই প্রথম তথ্যটিতে ফিরে যাই। বাংলাদেশের PM2.5 যদি স্থায়ীভাবে WHO-এর নির্দেশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা যায়, AQLI-এর হিসাবে একজন গড় বাংলাদেশির প্রত্যাশিত আয়ু প্রায় ৫.৫ বছর বাড়তে পারে। ঢাকার মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ৬.৯ বছর। সংখ্যা হিসেবে দেখলে হয়তো আমরা এর গুরুত্ব পুরোপুরি অনুভব করি না। পাঁচ বছর। সাত বছর।
একসময় হয়তো সাত বছরকে খুব বড় সময় মনে হতো না। কিন্তু বয়স যত বাড়ে, জীবনের পথ যতটা পেছনে ফিরে দেখা যায়, ততই বুঝতে পারি—একটি মানুষের জীবনে সাত বছরের মূল্য কত। সাত বছরে একটি শিশু স্কুলে যেতে শুরু করে। সাত বছরে একজন মানুষ তার নাতি-নাতনির বড় হয়ে ওঠার অনেকটা সময় দেখতে পারে। সাত বছরে একটি পরিবারের জীবনে কত কিছু ঘটে! তাই আমার কাছে পরিষ্কার বাতাস কোনো বিলাসিতা নয়। এটি শুধু পরিবেশবাদীদের দাবি নয়। পরিষ্কার বাতাস মানুষের জীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন।
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা বড় বড় সেতু, রাস্তা, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সুন্দর সুন্দর ভবন রেখে যেতে চাই। অবশ্যই রেখে যাব। কিন্তু তাদের জন্য যদি নিরাপদে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস রেখে যেতে না পারি, তাহলে একদিন হয়তো তারা আমাদের উন্নয়নের হিসাবটা অন্যভাবে করবে।
ড. নজরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি দীর্ঘদিন পরিবহন পরিকল্পনা ও পরিবেশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা ও বায়ুর গুণমান নিয়ে নিজ উদ্যোগে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন