https://www.prothomalony.com/

18339

opinion

অভিমত

ব্রডশিট কথন ও বিচারিক অপকর্মের আলাপ এবং ফ্যাসিজমের রূপকার

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০০

বিগত পলাতক সরকার। হ্যাঁ, পলাতকই তো। যে সরকারের পুরো মন্ত্রীসভা, সংসদ সব পালিয়ে যায়, তাকে তো পলাতক সরকারই বলতে হয়। সেই সরকার তার টিকে থাকার ভিত গড়েছে বিচার বিভাগের মাধ্যমে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ নানান কালাকানুনের মধ্যে দিয়ে দেড় দশক রাজত্ব করেছে। বলতে পারেন ত্রাসের রাজত্ব। এই ত্রাস সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী বিচার বিভাগ খোদ। 

মিডিয়া এজেন্সি 'ব্রডশিট' একটা ভালো তথ্য দিয়েছে কীভাবে বাংলাদেশে বিচারিক বদমাইশি শুরু হয়েছিল তা নিয়ে। সরাসরি 'ব্রডশিট' থেকে তুলে দিই। 'ব্রডশিট' বলছে, 

'১৯৭৪ সালের শুরুতে হাইকোর্টে একটা হেবিয়াস কর্পাস মামলা উঠেছিল। আঠারো বছরের শাহজাহান শরীফকে জাতীয় রক্ষীবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে, তারপর তার আর খোঁজ নাই, পরিবার আদালতে এসেছে।

বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য পর্যবেক্ষণ দিলেন, রক্ষীবাহিনী যেভাবে চলছে তাতে সংবিধানের প্রক্রিয়ার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নাই।

শেখ মুজিবের সরকার এই পর্যবেক্ষণের জবাব দিল আইন বদলে। রক্ষীবাহিনী আদেশে ৮ক ও ১৬ক ধারা যোগ হলো, বাহিনীর কোনো সদস্যের সরল বিশ্বাসে করা কোনো কাজের জন্য কোনো মামলা চলবে না।

এই দায়মুক্তি কার্যকর করা হলো পিছিয়ে, ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে, যেদিন বাহিনী গঠিত হয়েছিল। মানে দুই বছরে বাহিনী যা করেছে, সবই আইনের চোখে মাফ।'

বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ কোনো কাজে দেয়নি। বরং আইন বদলে ফেলা হয়েছে। অথচ বিচার বিভাগ নিজেদের সংবিধানের রক্ষক দাবি করে। বদলের ফেলা আইন সংবিধানের মূল স্পিরিটের পক্ষে না বিপক্ষে তা বলা কার দায়িত্ব? এই যে রক্ষক এবং আইন বদলে ফেলে দেয়ার মধ্যে যে দ্বৈরথ রয়েছে, তা অনেকেরই বোধগ্যম নয়। পঁচাত্তর পরবর্তী ইনডেমনিটি নিয়ে কথা বলা হয়। বলা হয় না, রক্ষীবাহিনীর সকল অপকর্মকে দায়মুক্তি তথা ইনডেমনিটি দিয়েছিল পঁচাত্তর পূর্ববর্তী সরকার। স্বাধীন বাংলাদেশের দায়মুক্তির শুরু তখন থেকেই। সেকথা কারো মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় না। 'ব্রডশিট' এই ব্যাপারটি মনে করিয়ে দিয়েছে। ধন্যবাদ 'ব্রডশিট'কে। বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যারা প্রকাশ্যে সরকারপন্থী, যারা ফ্রন্টফুটে আছে, তারা বিষয়গুলো হয়তো জানেই না। আর জানলেও অজ্ঞাত কারণে লজিক্যালি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। আর যারা জানে তাদের সিংহভাগই পলাতকপন্থী। তারা উল্টো এসব অপকর্মকে সিলগালা করে দিতে সচেষ্ট, যাতে কেউ জানতে না পারে। যখনই এ বিষয়গুলো জোরালো ভাবে সামনে চলে আসে, তখন পলাতকপন্থীরা অন্য আরেকটা ইস্যু সামনে আনে। যাতে মূল ইস্যু ঢেকে যায়। অথচ এই আলাপগুলো হওয়া জরুরি। এগুলো হলো একটি কল্যাণ-রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায়। এসব সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধানের আলাপই হলো কল্যাণ-রাষ্ট্রে পৌঁছানোর পথ। 

'ব্রডশিট' যেভাবে উপস্থাপন করেছে বিষয়টি, সে বিষয় উপস্থাপনে সরকারপক্ষের বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়টা কেন ব্যর্থ হলো। নাৎসিবাদের আলাপ যেভাবে সামনে এনেছে 'ব্রডশিট' তেমনটা কেন সরাসরি সরকারপন্থীদের কাছ থেকে এলো না। এসব প্রশ্ন ভ্যালিড। হিটলারের নাৎসিবাহিনী রাষ্ট্র নয় হিটলারের কাছে শপথ নিতো। এর অর্থ হলো, নাৎসিরা রাষ্ট্রপক্ষ না হয়ে হিটলারের পক্ষে থাকতো। তারা হিটলারের অনুরক্ত। যাকে ব্যক্তিগত বাহিনী বলা যায় নিঃসন্দেহে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনীও রাষ্ট্র নয় শপথ নিতো শেখ মুজিবের কাছ থেকে। অর্থাৎ নাৎসিদের মতন রক্ষীবাহিনীও ছিল ব্যক্তিগত বাহিনী। এনিয়ে 'ব্রডশিট' আরো বিস্তারিত বলতে পারতো। আরও বলার অনেককিছু ছিল। তারপরও তারা বলেছে, এটাই বড় কথা। 

'ব্রডশিট' মোটাদাগে বিচারিক অপকর্মের কথা তুলে ধরেছে নানান উদাহরণ সহকারে। একটা কথা পরিষ্কার বাংলাদেশে ফ্যাসিজম জগদ্দল পাথর হয়ে উঠেছিল বিচার বিভাগের সহায়তায়। জুলাই বিপ্লবের পরও বিচার বিভাগ চেষ্টা করেছিল জুডিশিয়াল ক্যু এর। যারফলে ছাত্রদের সর্বোচ্চ আদালতমুখী হতে হয়েছিল। ঘেরাও করতে হয়েছিল। তারপরেও বিচার বিভাগের তৎকালীন অধিকর্তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছিলেন নিজেরা টিকে থাকতে এবং ফ্যাসিজমকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। সেই চেষ্টা আপাতত অসফল। মনে রাখবেন, এখানে 'আপাতত' শব্দটি ব্যবহার করেছি। 

এখন আসি ক্যান্টনমেন্ট থানার আলোচিত সাবেক ওসি'র আলাপে। সে বলেছে, উপরের দিকে স্যাররা পলাতকদের পক্ষে নয়, কিন্তু তারা অর্থাৎ নিচের দিকে অনেকেই পক্ষে। কথাটা কতটা অ্যালার্মিং তা বোঝার ক্ষমতা সরকারপক্ষীয় বুদ্ধিজীবীদের আছে কিনা জানি না। একই কথা কথা বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও। মাথা পরিবর্তিত হলেও শরীর অনেকটা আগের মতই। সুতরাং অন্যজনের মাথা এবং আরেকজনের শরীরের সমন্বয় ঘটা প্রায় অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, পঁচাত্তর পূর্ববর্তী এবং গত দেড় দশকের জুলুমের পুরোটাই কায়েম হয়েছে বিচার বিভাগের কাঁধে ভর করে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা'র আলাপই যার প্রমাণ। তিনি তার উপর জোর প্রয়োগের কথা বলেছেন, কথাটা কিয়দংশ সত্যি। মূল সত্যটা হলো বেশিরভাগ হয়েছে তার ইচ্ছেতেই এবং তিনি তা করেছেন সানন্দে। খায়রুল হকের কথা আর নাই বললাম। 

জানি, অনেকেই বলবেন, দু'চারজনের হিসেব দেখে অন্যদের খতিয়ান বিচার করবেন কীভাবে? এই যে বলেন, দু'চারজন খারাপ অন্যরা ভালো, একথাটির পুরোটাই বিভ্রান্তিকর। সত্যকে টুইস্ট করার ভালো টুল এই তুলনামূলকের আলাপ, দু'চারজন খারাপ, অন্যরা ভালো। যদি ভালোই হয়, তাহলে কেন বর্তমান সময়েও পুলিশ কর্মকর্তাদের আফসোসের আলাপ শুনি, 'আমরা যাদের ধরে দিই, তারা সহজেই জামিন পেয়ে যায়'। কথা আর বাড়াই না। বাংলাদেশের আইন মানি। আইন অনুযায়ী রায়ের আদেশের বিরোধীতা করা যায় না। অর্থাৎ এটাও ইনডেমনিটি। কিন্তু অনেক দেশেই করা যায়, করে এবং তা বিনা বাধায়। যুক্তরাষ্ট্রেও রায় নিয়ে কথা বলা হয়, বলা যায়। সমালোচনা করা যায়। এবং যুক্তরাষ্ট্র কল্যাণ-রাষ্ট্র। ওয়েলফেয়ার কান্ট্রি। মাইন্ড ইট। কল্যাণ-রাষ্ট্র গড়ে উঠার পথটা আমাদের চিনতে হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন