https://www.prothomalony.com/
18371
opinion
শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার। নামের মধ্যেই একধরনের মহত্ত্ব আছে। যুদ্ধের পৃথিবীতে শান্তির পক্ষে দাঁড়ানো, ক্ষমতার দম্ভের সামনে আইনের কথা বলা, নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষায় নিজের অবস্থান ধরে রাখা—এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কারের মর্যাদা। কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাস খুললে দেখা যায়, শান্তির স্বীকৃতিও সব সময় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কখনো পুরস্কার পেয়েছেন এমন মানুষ, যাঁদের পরবর্তী ভূমিকা পুরস্কারের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কখনো পুরস্কার না পাওয়া মানুষের নামই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বড় আক্ষেপ।
আছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শান্তির নোবেল নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথা কারও অজানা নয়। যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেছেন। নিজের কূটনৈতিক সাফল্যের কথা বলেছেন। অন্যদের নোবেল পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। পুরস্কারটি তাঁর হাতে আসেনি। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের আলোচনায় তিনি এমনভাবে উপস্থিত থাকেন। পুরস্কারটি না পেয়েও এর বিতর্কের একজন নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর সেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। এবার বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভি পিল্লে। আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তির প্রসারে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে। নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা এই নির্বাচনের অন্যতম ভিত্তি। পুরস্কার ঘোষণার পর প্রশ্নটি আবারও ফিরে এসেছে—শান্তির নোবেল কি কেবল অতীতের কাজের স্বীকৃতি, নাকি বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তাও?
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লের। বর্ণবাদের সমাজে বেড়ে ওঠা এই আইনজ্ঞের কর্মজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার চেষ্টা। তিনি রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে যৌন সহিংসতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল সুরটি হলো—রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড়ই হোক, অপরাধের অভিযোগ উঠলে জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এই অবস্থানই তাঁকে যেমন সম্মান এনে দিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখেও দাঁড় করিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁর অবস্থান এবং জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের ভূমিকা তাঁকে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এনেছে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ সমালোচকেরাও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো তদন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত, কোনো রাষ্ট্রের পাল্টা বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। এগুলোকে এক করে দেখলে সাংবাদিকতার নির্ভুলতা নষ্ট হয়। একইভাবে, কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেই তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
নাভি পিল্লেকে শান্তির নোবেল দেওয়ার মধ্য দিয়ে কমিটি আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে একটি অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সমর্থকেরা বলবেন, যুদ্ধের সময় মানবাধিকারের কথা বলা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টাই পুরস্কারের যথার্থ কারণ। সমালোচকেরা বলবেন, এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি পক্ষকে শক্তিশালী করার বার্তাও বহন করতে পারে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের সমস্যা এখানেই। পুরস্কারটি একজন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি গিয়ে পড়ে রাষ্ট্র, সরকার, যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল নোবেল কমিটি।
এরপর আসে এক নাটকীয় ঘটনা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মাচাদো নিজের নোবেল মেডেলটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন। ট্রাম্প ঘটনাটি প্রকাশ্যে প্রচার করেন। দৃশ্যটি ছিল ব্যতিক্রমী। যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন, তাঁর হাতে এসে পৌঁছাল একজন প্রকৃত বিজয়ীর মেডেল।
কিন্তু নোবেল পুরস্কার কোনো ট্রফি নয়, যা উপহার দিলেই তার পরিচয় বদলে যায়। নোবেল শান্তি কেন্দ্র স্পষ্ট করেছে, মেডেলের মালিকানা বদলাতে পারে, কিন্তু পুরস্কারজয়ীর পরিচয় হস্তান্তরযোগ্য নয়। মাচাদো মেডেলটি ট্রাম্পকে দিলেও ২০২৫ সালের নোবেল বিজয়ী হিসেবে ইতিহাসে তাঁর নিজের নামই থাকবে। এখানে রাজনীতি ছিল, কূটনৈতিক হিসাব ছিল, ব্যক্তিগত স্বীকৃতির প্রশ্নও ছিল। কিন্তু নোবেলের ইতিহাসে মাচাদোর নামই থাকবে ২০২৫ সালের বিজয়ী হিসেবে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের আলোচনায় ট্রাম্পের উপস্থিতি নতুন নয়। নিজের কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার দাবি করেছেন, তাঁর কাজের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। অন্যদিকে, ২০০৯ সালে বারাক ওবামার নোবেল পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
২০১৯ সালে জাতিসংঘে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন করা হলে তিনি অনেক কিছুর জন্যই পুরস্কার পেতে পারতেন। ওবামাকে নিয়ে তাঁর বিদ্রূপেরও একটি পরিচিত জায়গা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ওবামা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। পুরস্কার ঘোষণার সময় তাঁর প্রশাসনের অর্জন তখনো সীমিত ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছিল, এটি কি বাস্তব অর্জনের স্বীকৃতি, নাকি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশার পুরস্কার? ওবামা নিজেও পুরস্কার পাওয়ার সময় স্বীকার করেছিলেন, অতীতের অনেক মহান বিজয়ীর পাশে নিজেকে দাঁড় করানোর মতো অর্জন তাঁর তখনো হয়নি।
ট্রাম্পের সমালোচনার মধ্যে ব্যক্তিগত আক্ষেপ আছে, রাজনৈতিক প্রচারও আছে। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের আড়ালে একটি পুরোনো প্রশ্নও রয়ে যায়—শান্তির নোবেল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব ফলাফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর রাজনৈতিক প্রত্যাশার ভূমিকা কতটা? ২০২৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প একাধিক সংঘাত সমাধানের কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। তাঁর সমর্থকেরা বলেন, কূটনৈতিক চাপ, সরাসরি আলোচনা এবং দর-কষাকষির মাধ্যমে তিনি সংঘাত থামানোর চেষ্টা করেছেন। সমালোচকেরা পাল্টা প্রশ্ন করেন, কোনো যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হলো, সংঘাতের মূল কারণ দূর হলো কি না, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিরাপত্তা ও অধিকার পেল কি না—এসব বিবেচনা না করে শুধু ঘোষিত সাফল্যের ভিত্তিতে শান্তির মূল্যায়ন করা যায় কি?
২০২৬ সালের পুরস্কারও ট্রাম্পের হাতে আসেনি। ৭ অক্টোবর তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, নিজের কাজের জন্য তিনি পুরস্কারের যোগ্য বলে মনে করেন, যদিও নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাঁকে বেছে নেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলবেন, তাঁর মধ্যস্থতায় একাধিক যুদ্ধবিরতি হয়েছে। সমালোচকেরা বলবেন, শান্তির মূল্যায়ন প্রচারের জোরে নয়, দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলে হওয়া উচিত। দুই পক্ষের যুক্তিই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে, কে পুরস্কার পাবেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে বিতর্কের তালিকা ছোট নয়।
হেনরি কিসিঞ্জার ও লে ডুক থো (১৯৭৩)। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ তখনো পুরোপুরি থামেনি। লে ডুক থো পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। কিসিঞ্জারের ভূমিকা এবং কম্বোডিয়ায় মার্কিন বোমাবর্ষণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগও করেন। শান্তির জন্য দেওয়া পুরস্কারটি তখন নিজেই হয়ে ওঠে যুদ্ধ ও নৈতিকতার বিতর্কের কেন্দ্র।
ইয়াসির আরাফাত, ইতজাক রাবিন ও শিমন পেরেজ, ১৯৯৪। অসলো চুক্তির স্বীকৃতিতে দেওয়া এই পুরস্কার মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনাকে সামনে এনেছিল। কিন্তু চুক্তির প্রত্যাশা স্থায়ী সমাধানে রূপ নেয়নি। পরবর্তী সংঘাত ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা পুরস্কারটির ঐতিহাসিক মূল্যায়নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আং সান সু চি, ১৯৯১। গৃহবন্দি অবস্থায় তিনি গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচিত হয়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির অভিযোগের মুখে তিনি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত অবস্থান নেননি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে তাঁর বক্তব্যও বহু মানুষের হতাশার কারণ হয়।
বাংলাদেশের কাছে বিষয়টি কোনো দূরের আন্তর্জাতিক বিতর্ক নয়। রোহিঙ্গাদের বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। তাঁদের ঘরবাড়ি হারানো, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা আজও একটি বড় মানবিক সংকট। সু চির পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠলেও নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেয়ার মানবিক কাজের জন্য তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আলোচনায় এসেছে।
আবি আহমেদ, ২০১৯। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের জন্য তিনি পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে টিগ্রে অঞ্চলের যুদ্ধে তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। একসময় যে উদ্যোগ শান্তির প্রতীক হয়েছিল, তা-ই পরে নতুন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক, ২০০৬। বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল গর্বের মুহূর্ত। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তবে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার, ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। কোনো উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়ন করতে হলে তার সুফল ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই দেখতে হয়। পুরস্কার সেই মূল্যায়নের বিকল্প নয়।
পুরস্কার নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই বিজয়ীদের দিকে তাকাই। কিন্তু যাঁরা পাননি, তাঁদের নামও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মহাত্মা গান্ধী নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। একাধিকবার মনোনীত হয়েও তাঁর হাতে এই সম্মান ওঠেনি। ১৯৪৮ সালে তাঁর মৃত্যুর বছর কাউকে শান্তির নোবেল দেওয়া হয়নি। পরে নোবেল প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গান্ধীকে পুরস্কৃত করতে না পারাকে একটি বড় আক্ষেপ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে।
কোনো পুরস্কারের সিদ্ধান্তই ইতিহাসের সম্পূর্ণ মানচিত্র নয়। পুরস্কার না পেলেই কেউ শান্তির জন্য কম কাজ করেছেন—এমন নয়। আবার পুরস্কার পেলেই তাঁর সব কাজ ইতিহাসের বিচারে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। কেউ যুদ্ধবিরতিকে শান্তি বলেন। কেউ মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ হলেই শান্তি আসে না; ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত হওয়াও জরুরি। কেউ কূটনৈতিক সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেন, কেউ বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।
এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নোবেল কমিটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কমিটির পাঁচ সদস্য নরওয়ের পার্লামেন্টের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠানটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন হলেও তার রাজনৈতিক ও নৈতিক পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাও আছে। পুরস্কার দেওয়ার সময় ভবিষ্যৎ জানা যায় না। কোনো নেতা পরে কী করবেন, কোনো চুক্তি কত দিন টিকবে, কোনো আন্দোলন ক্ষমতায় গেলে নিজের আদর্শ ধরে রাখতে পারবে কি না—এসব আগাম নিশ্চিত করা অসম্ভব। তবু পুরস্কারের মূল্য আছে। কারণ এটি কখনো কখনো এমন মানুষদের সামনে নিয়ে আসে, যাঁরা ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচারকে বড় করে দেখেছেন। যাঁরা যুদ্ধের মধ্যেও মানবাধিকারের কথা বলেছেন। যাঁরা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছেন।
২০২৬ সালের নাভি পিল্লের পুরস্কারও সেই পরীক্ষার বাইরে নয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন এই সম্মানের ভিত্তি। তাঁর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও থাকবে। কিন্তু বিতর্কের উপস্থিতি নিজে থেকেই পুরস্কারকে ভুল প্রমাণ করে না। একইভাবে পুরস্কার পাওয়াও কোনো ব্যক্তির প্রতিটি অবস্থানকে প্রশ্নাতীত করে না। ২০২৬ সালের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ১০ ডিসেম্বর অসলোয় আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। সেদিন পিল্লে মঞ্চে দাঁড়াবেন, আর তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক চলবে বিশ্বজুড়ে।
পুরস্কারের মেডেল দেয়ালে ঝুলতে পারে। বক্তৃতা সংবাদপত্রে ছাপা হতে পারে। বিজয়ীর নাম ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু শান্তি? শান্তি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন