https://www.prothomalony.com/

18335

opinion

অভিমত

নেকীর কাজে প্রতিযোগিতা: পরকালীন জীবনের অনন্য পাথেয়

খতিব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। 

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৫০

প্রতিযোগিতা মানব স্বভাবের এক সহজাত বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর এই রঙ্গমঞ্চে মানুষ প্রতিনিয়ত ব্যবসা, পড়াশোনা, পদোন্নতি বা সামাজিক মর্যাদার পেছনে ছুটছে। কিন্তু পার্থিব এই প্রতিযোগিতা দিনশেষে একবুক ক্লান্তি আর শূন্যতা ছাড়া কিছুই দেয় না। অথচ একজন মুমিনের ভাবনার দিগন্ত কেবল এই ক্ষুদ্র দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার অন্তরে লুকিয়ে থাকে অনন্ত আখিরাতের এক বিশাল ক্যানভাস। ইসলাম মানুষের এই সহজাত প্রতিযোগিতার প্রবণতাকে আখিরাতমুখী করতে অনুপ্রাণিত করে। এই নিবন্ধে সেই প্রতিযোগিতার স্বরূপ আলোচনা করা হলো।


নেকীর কাজে প্রতিযোগিতা বলতে বোঝায় সর্বদা নেক আমলে তৎপর থাকা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো। এটি মূলত নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তির সাথে এক অবিরাম লড়াই। কুরআন-হাদিসে এই প্রতিযোগিতা বোঝাতে পাঁচটি পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে মুনাফাসা, মুসাবাকা, মুসারাআহ, ইসতিবাক ও মুবাদারাহ।


প্রথমত, মুনাফাসা অর্থ কোনো বিষয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই নেককারগণ জান্নাতে থাকবে, আর এরূপ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত (সূরা মুতাফফিফিন: ২২-২৬)। এই প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য হলো এতে কারো প্রতি হিংসা বা ক্ষতিসাধনের স্থান নেই। আইয়ুব সাখতিয়ানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন কাউকে দুনিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে, তখন তুমি তার সাথে আখিরাত নিয়ে প্রতিযোগিতা করো।


দ্বিতীয়ত, মুসাবাকা অর্থ ঘোড়দৌড়ের মতো একে অপরকে ছাড়িয়ে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ বলেন, তোমরা প্রতিযোগিতা করো তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ-পৃথিবীর ন্যায় (সূরা হাদীদ: ২১)। কুরআনে ঈমানদারদের তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে নিজের উপর অত্যাচারী, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কল্যাণকর্মে অগ্রগামী (সূরা ফাতির: ৩২)। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সৎকাজে অগ্রগামী ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, মধ্যপন্থী আল্লাহর রহমতে, আর নিজের উপর অবিচারকারী নবীজির শাফায়াতে জান্নাতে প্রবেশ করবে (তাবারানি: ১১৬৬২)। উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিখ্যাত ঘটনা এই প্রতিযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি নিজের অর্ধেক সম্পদ দান করে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সমুদয় সম্পদ দান করে বলেছিলেন, পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৭৮, তিরমিযি: ৩৬৭৫)।


তৃতীয়ত, মুসারাআহ অর্থ জড়তা ঝেড়ে ফেলে ক্ষিপ্রতার সাথে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ বলেন, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩)। নবী যাকারিয়া আলাইহিস সালামের পরিবার এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সন্তানহীনতার কষ্টের মাঝেও তারা সৎকর্মে অগ্রণী ছিলেন (সূরা আম্বিয়া: ৮৯-৯০)।


চতুর্থত, ইসতিবাক একটি যৌথ উদ্দীপনাকে নির্দেশ করে, যেখানে প্রত্যেকে নিজ অবস্থান থেকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে ছুটে চলে। আল্লাহ বলেন, তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো, যেখানেই থাকো আল্লাহ তোমাদের সবাইকে একত্র করবেন (সূরা বাকারা: ১৪৮)। আল্লাহ আরও বলেন, আল্লাহ চাইলে তোমাদের একদলভুক্ত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি পরীক্ষা নিতে চান, অতএব তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো (সূরা মায়েদা: ৪৮)। অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালাবে, গন্তব্য হবে একটাই  আল্লাহর সন্তুষ্টি।


পঞ্চমত, মুবাদারাহ অর্থ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আগেই তা অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়া। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেন, অন্ধকার রাতের টুকরোর মতো ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের দিকে অগ্রসর হও, সেই সময় সকালে মুমিন থাকা ব্যক্তি সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে (সহিহ মুসলিম: ১১৮, তিরমিযি: ১৯৫)। ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদিসের মর্মার্থ হলো নেক আমল অসম্ভব হয়ে পড়ার আগেই সৎকাজে দ্রুত অগ্রণী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।


সংক্ষেপে, নেকীর কাজে প্রতিযোগিতার অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্যে অগ্রগামী থাকা, নেক আমলের সুযোগ পেলেই তা সম্পাদন করা, পাপের পর দ্রুত তওবা করা, আজান শোনামাত্র সালাতের প্রস্তুতি নেওয়া, প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের চেষ্টা করা, আগেভাগে সালাম দেওয়া এবং মানুষের সেবায় সবার আগে অগ্রণী হওয়া। এই প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং পারস্পরিক উৎসাহই মুখ্য বিষয়।


দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রতিযোগিতার পেছনে ছুটে জীবন ক্ষয় করার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের এই চিরন্তন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্যের পথ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে নেকীর কাজে অগ্রগামী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

জুমআর দিনের মর্যাদা: করণীয় ও বর্জনীয়

আব্দুল্লাহ শোয়াইব 

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। 

সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমআর দিন সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দিনটিকে দিবসসমূহের সর্দার এবং মুমিনের সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই দিনের ফযিলত পূর্ণরূপে লাভের জন্য সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণ প্রয়োজন। এই নিবন্ধে জুমআর দিনের মর্যাদা, করণীয় ও বর্জনীয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন জুমআ, এই দিনে আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই বের করে দেওয়া হয়েছে, আর কিয়ামতও এই দিনেই সংঘটিত হবে (সহিহ মুসলিম: ৮৫৪)। আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, এই দিনে আদম আলাইহিস সালামের রুহ কবজ করা হয়েছে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শিঙ্গা ফুৎকারও এই দিনেই হবে, তাই এই দিনে নবীজির প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে বলা হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)। পূর্ববর্তী উম্মতদের তুলনায় এই উম্মত জুমআর দিনের সঠিক সন্ধান পেয়েছে, যেখানে ইহুদিদের জন্য শনিবার ও খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত হয়েছিল (সহিহ মুসলিম: ৮৫৬)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, জুমআর দিন আল্লাহর কাছে কুরবানির দিন ও ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও সম্মানিত, এতে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যখন বান্দা কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা দান করেন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১০৮৪)।


জুমআর দিনের বহু ফযিলত রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করে প্রথম সময়ে মসজিদে আসে, সে যেন একটি উট কুরবানি করল, আর পরবর্তী প্রতিটি সময়ে আগমনকারীর সওয়াব ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে (সহিহ মুসলিম: ৮৫০)। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে মনোযোগ সহকারে খুতবা শোনে, তার এক জুমআ থেকে পরবর্তী জুমআ এবং আরও তিন দিনের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় (সহিহ মুসলিম: ৮৫৭)। জুমআর দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যখন সালাতরত অবস্থায় দোয়া করলে তা কবুল হয় (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)। এই সময় সম্পর্কে দুটি মত প্রসিদ্ধ— ইমামের মিম্বরে বসা থেকে সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত, অথবা আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এছাড়া জুমআর দিনে বা রাতে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমকে আল্লাহ কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করেন (মিশকাত: ১৩৬৭)।


জুমআর দিনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। প্রথমত, ফজরের সালাত জামাতে আদায় করা, কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সালাত জুমআর দিনের ফজরের জামাত (সহিহাহ: ১৫৬৬)। দ্বিতীয়ত, গোসল করে সুন্দর পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহার করা— সালমান ফারসি রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে এর ফলে গুনাহ মাফের সুসংবাদ এসেছে (সহিহ বুখারি: ৮৮৩)। তৃতীয়ত, আগেভাগে মসজিদে গমন করা, যাতে তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও নফল সালাত আদায়ের সুযোগ পাওয়া যায়। চতুর্থত, মনোযোগ সহকারে খুতবা শোনা (সহিহ মুসলিম: ৮৫৭)। পঞ্চমত, অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করেন (বায়হাকি, সুনানে কুবরা)। ষষ্ঠত, সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা, যাতে পরবর্তী জুমআ পর্যন্ত নূর চমকাতে থাকে (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২১৭৫)।


জুমআর দিনে কিছু কাজ বর্জনীয়ও রয়েছে। প্রথমত, আজানের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকা— আল্লাহ বলেন, যখন জুমআর জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা ছেড়ে দাও (সূরা জুমআ: ৯)। দ্বিতীয়ত, মসজিদে প্রবেশ করে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় না করা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত সালাত না পড়ে যেন না বসে (সহিহ বুখারি: ৪৪৪)। তৃতীয়ত, খুতবা চলাকালীন মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে যাওয়া (সুনানে আবু দাউদ: ১১১৮)। চতুর্থত, খুতবার সময় দুই হাঁটু উঁচু করে বসা (সুনানে আবু দাউদ: ১১১০)।


পঞ্চমত, খুতবার সময় অনর্থক কথা বলা বা মোবাইল স্ক্রল করার মতো কাজ করা— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, খুতবা চলাকালে সাথীকে চুপ থাকতে বললেও তা অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য হবে (সহিহ বুখারি: ৯৩৪, সহিহ মুসলিম: ৮৫১)। ষষ্ঠত, খুতবা চলাকালীন ঘুমিয়ে পড়া— এক্ষেত্রে স্থান পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ: ১১১৯)। সপ্তমত, শুধু জুমআর দিনকে নির্দিষ্ট করে সিয়াম পালন করা— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তবে আগে বা পরে একদিন সংযুক্ত করলে তা জায়েজ (সহিহ মুসলিম: ১১৪৪)। অষ্টমত, জুমআর দিনকে নির্দিষ্ট করে কবর যিয়ারতের বিশেষ আয়োজন করা, যার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।


জুমআর দিন কেবল একটি সালাত আদায়ের দিন নয়, বরং এটি মুমিনের আত্মার পুনর্জাগরণ, দোয়া ও তওবার এক সুবর্ণ সুযোগ। দুনিয়াবি ব্যস্ততা পরিত্যাগ করে আল্লাহর স্মরণে নিবেদিত হওয়া এবং খুতবা ও সালাতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই এই দিনের মূল দাবি। তাই করণীয় বিষয়গুলো যথাসম্ভব পালন করে এবং বর্জনীয় কাজগুলো পরিহার করে আমাদের জুমআর দিনকে প্রকৃত অর্থে সাপ্তাহিক ঈদ হিসেবে উদযাপন করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই তাওফিক দান করুন। আমীন।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন