https://www.prothomalony.com/

18250

opinion

অভিমত

অ্যান্টিবায়োটিক: জ্বর সারানোর ওষুধ নয়, সঠিক সময়ে জীবন বাঁচানোর ওষুধ

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪৬

একটি পরিচিত দৃশ্য। কারও সর্দি, কাশি বা জ্বর হয়েছে। দুই দিন পরও পুরোপুরি ভালো না হওয়ায় তিনি ভাবছেন, “একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই দ্রুত ঠিক হয়ে যাব।” অনেক সময় রোগী চিকিৎসকের কাছেও একই প্রত্যাশা নিয়ে যান—অ্যান্টিবায়োটিক না দিলে চিকিৎসা যেন অসম্পূর্ণ।

কিন্তু এখানেই বড় ভুলটি ঘটে। অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত মূল্যবান ওষুধ। নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের সংক্রমণ, টাইফয়েড, স্ট্রেপ থ্রোট, গুরুতর পেটের সংক্রমণ বা সেপসিসের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে এটি জীবন বাঁচাতে পারে। আবার অপ্রয়োজনে বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে এই একই ওষুধ আমাদের ভবিষ্যতের চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক কী, আর কী নয়

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু সর্দি, অধিকাংশ কাশি, ফ্লু, ভাইরাল জ্বর এবং বেশির ভাগ গলাব্যথা ভাইরাসের কারণে হয়। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
অনেকে বলেন, “কফ হলুদ বা সবুজ হয়েছে, নিশ্চয়ই অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে।” এটিও সব সময় ঠিক নয়। ভাইরাল সংক্রমণেও কফের রং বদলাতে পারে। শুধু কফের রং দেখে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা নিরাপদ চিকিৎসা নয়।

কিছু সাইনাস ইনফেকশন বা কানের সংক্রমণ ব্যাকটেরিয়াজনিত হলেও সব ক্ষেত্রেই সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। বয়স, রোগের সময়কাল, জ্বরের মাত্রা, শ্বাসকষ্ট, শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতি কোথায়?

প্রথম ক্ষতিটি ব্যক্তিগত। অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কারও কারও বমিভাব, পেট খারাপ, ডায়রিয়া, র‍্যাশ বা ফাঙ্গাল সংক্রমণ হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মারাত্মক অ্যালার্জিও হতে পারে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে গুরুতর C. difficile ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

দ্বিতীয় ক্ষতিটি আরও বড়—অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে শরীরের রোগ সৃষ্টিকারী ও স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কিছু জীবাণু বেঁচে থাকতে শেখে। তারা ধীরে ধীরে ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। পরে সত্যিকারের গুরুতর সংক্রমণ হলে পরিচিত, সহজলভ্য ও কম দামের ওষুধ আর কাজ নাও করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে ব্যাকটেরিয়াল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ৪৭ লাখের বেশি মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল বলে অনুমান করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা⁠। এটি কেবল হাসপাতালের সমস্যা নয়। এটি পরিবার, কমিউনিটি, খামার, পরিবেশ ও পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যা।

“ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দেননি”—এটি অবহেলা নয়

অনেক রোগী মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিক না দিলে চিকিৎসক হয়তো গুরুত্ব দেননি। আসলে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা। ভাইরাল জ্বরে প্রয়োজন হতে পারে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার, জ্বর ও ব্যথার উপযোগী ওষুধ, নাক বন্ধ থাকলে নিরাপদ উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা এবং সতর্ক পর্যবেক্ষণ। চিকিৎসক তখন রোগীকে বলে দেবেন—কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আবার যোগাযোগ করতে হবে।

এই ‘নিরাপদ অপেক্ষা’ বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ক্ষতি এড়ানো এবং রোগের গতিপ্রকৃতি বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার একটি আধুনিক পদ্ধতি।

রোগীর করণীয়: পাঁচটি সহজ নিয়ম

প্রথমত, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। পরিচিত কারও ভালো হয়েছিল বলে আপনারও একই ওষুধ লাগবে—এমন নয়।

দ্বিতীয়ত, অন্যের ওষুধ খাবেন না এবং নিজের পুরোনো ওষুধ জমিয়ে রেখে পরে ব্যবহার করবেন না। একই উপসর্গের পেছনে ভিন্ন রোগ থাকতে পারে। ভুল ওষুধে সঠিক রোগ নির্ণয় দেরি হয়।

তৃতীয়ত, অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে নিয়ম মেনে খান। কোন ওষুধ, কত দিন, কীভাবে খাবেন—চিকিৎসকের নির্দেশ ঠিকভাবে অনুসরণ করুন। ভালো লাগলেই নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ করা বা ডোজ কমানো ঠিক নয়। আবার ওষুধ নিয়ে প্রশ্ন বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

চতুর্থত, অ্যান্টিবায়োটিক দাবি না করে প্রশ্ন করুন। যেমন: “এটি কি ভাইরাল হতে পারে?” “অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও কীভাবে আরাম পাব?” “কোন লক্ষণ হলে আবার আসব?” এই প্রশ্নগুলো রোগীকে সচেতন সিদ্ধান্তে সাহায্য করে।

পঞ্চমত, সংক্রমণ প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিন। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, অসুস্থ হলে অন্যদের থেকে দূরে থাকা এবং বয়স ও অবস্থান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া সংক্রমণ কমায়। সংক্রমণ কমলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও কমে।

চিকিৎসকদের ভূমিকা

চিকিৎসকদের জন্যও এটি শুধু প্রেসক্রিপশনের প্রশ্ন নয়; এটি যোগাযোগের প্রশ্ন। রোগীর অসুস্থতা, উদ্বেগ ও দ্রুত সুস্থ হওয়ার ইচ্ছাকে সম্মান করেই বোঝাতে হবে কেন অ্যান্টিবায়োটিক সব জ্বরের ওষুধ নয়।

প্রয়োজনে লক্ষ্যভিত্তিক পরীক্ষা, স্থানীয় প্রতিরোধের তথ্য, রোগের তীব্রতা এবং রোগীর বয়স ও অন্যান্য রোগ বিবেচনায় অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করতে হবে। যতটা সম্ভব সঠিক রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত ওষুধ, সঠিক মাত্রা ও প্রয়োজনীয় সময়—এই চার নীতিই অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার।

হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কমিউনিটি—সব জায়গায় অ্যান্টিবায়োটিক স্টিউয়ার্ডশিপ বা দায়িত্বশীল ব্যবহারকে শক্তিশালী করা দরকার। এর অর্থ হলো চিকিৎসা কম দেওয়া নয়; বরং সঠিক রোগীকে সঠিক সময়ে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া।

অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ জ্বরের ‘শর্টকাট’ নয়। এটি এমন এক সম্পদ, যা আজ ভুলভাবে ব্যবহার করলে কাল আমাদের হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

জ্বর হলে শুধু একটি ওষুধের নাম খুঁজবেন না। খুঁজুন সঠিক রোগ নির্ণয়, সঠিক পরামর্শ এবং সঠিক সময়ের চিকিৎসা। অ্যান্টিবায়োটিক বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু একটি ওষুধ বাঁচিয়ে রাখা নয়—নিজের, পরিবারের এবং আগামী প্রজন্মের চিকিৎসার নিরাপত্তা রক্ষা করা। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন