https://www.prothomalony.com/

18241

opinion

অভিমত

ক্ষমতার পরীক্ষা: নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ ও মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:০০

বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল বড়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের সংকটের পর মানুষ চেয়েছিল আইনের শাসন, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার বলছে, তারা আগের সরকারের রেখে যাওয়া সংকট মোকাবিলা করছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে বলেছেন, তাঁর সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু সরকারের বক্তব্য দিয়ে বিচার হয় না। মানুষের অভিজ্ঞতাও তার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো আইনশৃঙ্খলা। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো বিভিন্ন ঘটনা বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে ৪০৪ জন নারী ও কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনা এবং ২৬১টি গণপিটুনির ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ৬৪১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪১টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা। একই সময়ে ধর্ষণের পর ৩৭ জন নারী নিহত হওয়ার কথাও সংগঠনটি জানিয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো একটি সরকারের সময় অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে মানেই সব অপরাধের জন্য সরাসরি সরকার দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত তথ্য দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। অপরাধের পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, পুলিশি সক্ষমতা, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবেশসহ বহু কারণ কাজ করে। সরকারের দায়িত্ব হলো এসব কারণ মোকাবিলা করা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।

আরেকটি বড় প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে। ২০২৬ সালে সাংবাদিক ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তসহ কয়েকজন সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় উসকানি বা অপরাধে সহায়তার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসসহ বিভিন্ন সংগঠন বলেছে, সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।

এখানেই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার অবশ্যই হবে। কিন্তু সাংবাদিকের রিপোর্টিং, মতামত বা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত যদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে তার সীমা কোথায়, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। আইন যেন অপরাধ দমনের হাতিয়ার হয়, মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার না হয়।

বিদ্যুৎ বিলও এখন মানুষের দৈনন্দিন অসন্তোষের একটি বড় কারণ। জুন ২০২৬ থেকে বিদ্যুতের খুচরা দামে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে নিম্ন আয়ের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নির্দিষ্ট স্তরের বাড়তি দাম প্রত্যাহার করা হয়।

এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মানুষ যখন বাড়তি বিল, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দ্রব্যমূল্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে, তখন সরকারের কাছে শুধু ব্যাখ্যা নয়, দৃশ্যমান সমাধান প্রত্যাশা করে।

এ কারণেই কুমিল্লার কথিত প্রতিম হত্যার মতো স্থানীয় কোনো হত্যাকাণ্ড কিংবা ধর্ষণ ও বলাৎকারের অভিযোগও জাতীয় আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীর পরিবারকে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং তদন্তে কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পক্ষের হস্তক্ষেপ না হতে দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত কোনো কলামিস্টের ঘোষণায় নির্ধারিত হবে না। সেটি নির্ধারণ করবে জনগণের অভিজ্ঞতা, আইনশৃঙ্খলার বাস্তব অবস্থা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি।

ক্ষমতায় থাকা যেমন জনগণের ভোটের ফল, তেমনি ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তিও জনগণের আস্থা। সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে বিরোধী মত সহ্য করতে হবে, সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার করতে হবে এবং মানুষের বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও নিত্যদিনের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নয়; জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা ধরে রাখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার।

লেখক: ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন