https://www.prothomalony.com/
18244
opinion
শিল্পোন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের খামখেয়ালিপনার মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে গোটা পৃথিবীকে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড আর সিএফসি জাতীয় গ্যাসের নিঃসরণ বছর বছর বেড়েই চলেছে। এসব গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ফিল্টার ওজোনস্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, ভূপৃষ্ঠ তপ্ত হয়ে উঠছে, আর সেই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নও বছরের পর বছর নতুন রেকর্ড গড়ছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা যেমন অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতেও ঋতুচক্র এলোমেলো হয়ে পড়ছে। শীতপ্রধান দেশগুলো অবশ্য ভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে মূল সংকট বরফ গলে যাওয়া আর তার প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। আর সেই বাড়তি জলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে দাঁড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু উপকূলীয় দেশগুলো।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান ঘনত্বে। শিল্পবিপ্লবের আগে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮০ পিপিএম। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৫ সালে এসে সেই ঘনত্ব রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, যা শিল্পপূর্ব যুগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি। গত ষাট বছরে এই বৃদ্ধির হার এতটাই দ্রুত যে, বরফ যুগের পর প্রাকৃতিকভাবে যে হারে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়েছিল, তার চেয়ে প্রায় একশ গুণ দ্রুততর এই পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকেই পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা বলে চিহ্নিত করছেন।
হিমবাহের অবস্থাও ক্রমেই উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালে অ্যান্টার্কটিকার একটি বিশাল হিমবাহের চাঁইয়ে গবেষকরা চিড় ধরতে দেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে ভেঙে যায়। গ্রিনল্যান্ডের বরফের অবস্থাও প্রতি বছর আরও খারাপ হচ্ছে; প্রতি বছর কয়েকশ বিলিয়ন টন বরফ গলে সমুদ্রে মিশছে, আর সেই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও প্রতি বছর সামান্য করে বাড়ছে। ব্রিটেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার এই ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতকের শেষ নাগাদ বিশ্বের সমুদ্রস্তরের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাবে।
তাপমাত্রার হিসাবও একই কথা বলছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলো ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হিসেবে একের পর এক রেকর্ড গড়েছে; বিশ্বের গড় তাপমাত্রা এখন শিল্পপূর্ব যুগের তুলনায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার বেশি। আর্কটিক অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বিশ্বের গড় হারের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি, যা বরফ যুগেও দেখা যায়নি এমন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে সরাসরি ও ব্যাপকভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গত দেড় দশকে দুর্যোগজনিত কারণে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, আর বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ই এই বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ। সিডর, আইলা, বুলবুল, আমফান আর ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় জনপদকে বারবার লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে, আর প্রতিটি দুর্যোগের পরই সেই ক্ষত পুরোপুরি সারার আগেই নতুন আরেকটি দুর্যোগ হাজির হয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারও একটা নীরব সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লবণাক্ত জল ভেতরের দিকে ঢুকে পড়ছে, চাষের জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে, আর সুপেয় জলের সংকট তীব্র হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা এই লবণাক্ততার প্রকোপে সবচেয়ে বেশি ভুগছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেখানকার মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকায়। গবেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। জলবায়ু-ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের একাংশের হিসাব বলছে, কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৫০ সাল নাগাদ শুধু ধীরগতির জলবায়ু সংকটের কারণেই বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি অর্ধ মিটারের কাছাকাছি বেড়ে যায়, তাহলে দেশের উপকূলীয় ভূমির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
সব হিসাব যে একমুখী, তা অবশ্য নয়। কিছু গবেষক মনে করেন, নদীবাহিত পলি জমে কিছু কিছু এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা পেতে পারে। যেমন হাতিয়াসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন চর জেগে ওঠার নজিরও মিলেছে। তবু সার্বিক প্রবণতা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলের মূল্যায়ন প্রায় একরকম, সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান উচ্চতা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটা বড় হুমকি হয়েই থাকবে।
তাপপ্রবাহের তীব্রতাও প্রতি বছর নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। কয়েক বছর আগে রাজশাহীতে তাপমাত্রা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছুঁয়েছিল, যা এখনও দেশের অন্যতম উচ্চ রেকর্ড হিসেবে আলোচিত। প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময়সীমা দীর্ঘ হচ্ছে, তাপপ্রবাহের সংখ্যা বাড়ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, জনস্বাস্থ্য আর শিশুদের শিক্ষায়। জাতিসংঘের শিশু সংস্থার সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বাংলাদেশকে জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকিতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন শিশুদের অন্যতম আবাসভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই পুরো সংকটের মূল উৎস কিন্তু বাংলাদেশ নয়। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সিংহভাগ দায় এখনও শিল্পোন্নত দেশগুলোর, যারা দশকের পর দশক ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে নিজেদের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করেছে। অথচ তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো নিচু, নদীবহুল, জনবহুল দেশগুলোকে। বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বারবার এই ন্যায্যতার প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর পদক্ষেপ এখনও যথেষ্ট নয়। শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল যেমন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আসছে না, তেমনি নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রাও অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে।
তবু আশার জায়গাটুকু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে, অনেক দেশ জ্বালানি খাতে কার্বনমুক্তির পথে এগোচ্ছে, আর জলবায়ু সচেতনতাও আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। কিন্তু এই অগ্রগতির গতি এখনও বিশ্বব্যাপী চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় পিছিয়ে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি দুটো কাজ, একদিকে নিজস্ব অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো, উপকূল রক্ষা, লবণ সহনশীল কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের ন্যায্য দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা। বিশ্ববিবেক যদি সত্যিই জাগ্রত হয়, আর শিল্পোন্নত দেশগুলো নিজেদের দায় স্বীকার করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়, তবেই হয়তো এই মহাদুর্যোগ থেকে উত্তরণের একটা পথ খোলা থাকবে। না হলে, এই সংকটের ভার বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকেই একা বইতে হবে, যার প্রতিরোধে তাদের প্রায় কোনো ভূমিকাই ছিল না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
অভিমত থেকে আরো পড়ুন