https://www.prothomalony.com/
18249
new-york
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:২০
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানবিক ও মুসলিম দাতা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মানবিক উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএ আয়োজিত ‘টুগেদার ফর স্ট্রংগার পার্টনারশিপ অ্যান্ড গ্রেটার ইমপ্যাক্ট’ শীর্ষক এক যৌথ আলোচনায় এ ঐকমত্য তৈরি হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানবিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি, অর্থায়নের সংকট, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার এম মিজানুর রহমান।
হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল প্রধান নির্বাহী মাহমুদা খান আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অতিথি ও প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান। স্বাগত বক্তব্যে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দেওয়া বক্তব্য ও প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।’ রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করেন। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি আরও বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক চীন সফরেও এ সংকটের সমাধানে চীনকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কাজ করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে বিপন্ন অবস্থায় রেখে বাংলাদেশ বসে নেই। তাদের ন্যূনতম মানবিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি শিবিরে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনা এবং তাদের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করার জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে চায়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু খাদ্য, আশ্রয় কিংবা চিকিৎসার সংকট নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও সামাজিক সংকট। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দাতা সংস্থা এবং বেসরকারি মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার এম মিজানুর রহমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমে আসায় ক্যাম্পগুলোর মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখনো রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বড় দাতা দেশগুলোর একটি। কিন্তু সামগ্রিক অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় একজন রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এর ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের পাশাপাশি শিশুদের জন্য একটি কার্যকর সাধারণ শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন। তিনি হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনালের চলমান কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, সংস্থাটি ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএর প্রধান নির্বাহী মাসুম মাহবুব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংস্থাটির চলমান কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুধু ত্রাণ বা জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ শিশু ও তরুণ। তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও জটিল হতে পারে। তাই বিলম্ব না করে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিতভাবে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় ‘কোয়ালিশন ফর পাথওয়ে টু হায়ার এডুকেশন ফর রোহিঙ্গা চিলড্রেন’ গঠনের উদ্যোগ। রোহিঙ্গা শিশুদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অর্থবহ জীবনের পথে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগকে একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএ, হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যানিটি, আইসিএনএ রিলিফ কানাডা, পেনি আপিল ইউএসএ, বাইতুলমাল এবং পেনি আপিল কানাডা।
বৈঠকে উপস্থিত এক ডজনের বেশি মুসলিম চ্যারিটি, দাতা ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন। একটি সমন্বিত কোয়ালিশনের মাধ্যমে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক কর্মসূচিতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন তারা।
আলোচনায় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর সাম্প্রতিক সরেজমিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, এটি শুধু একটি শরণার্থী সংকট নয়; এর সঙ্গে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
ইব্রাহীম চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় বড় বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই বিপন্ন জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিউইয়র্কের এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। জাতিসংঘের নথিতেও রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি, মিয়ানমারের সংকটের মূল কারণ এবং শরণার্থী-আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজন ততই বাড়ছে।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন