https://www.prothomalony.com/
18247
bangladesh
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৩৯
একদিকে জাতিসংঘের বিশাল মঞ্চ, অন্যদিকে একের পর এক বৈঠক—নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সফর যেন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে এক ব্যস্ত কূটনৈতিক অভিযানে। বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলায় নিজের প্রথম ভাষণ দিয়েছেন তিনি। তার আগেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট থেকে ভুটান, মালদ্বীপ, হাইতি ও ক্রোয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কথা বলেছেন জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দিয়েছেন পাঁচ দফা প্রস্তাব। জলবায়ু, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ও এসেছে আলোচনার টেবিলে।
নিউইয়র্কে পা রাখার পর থেকে সময় যেন খুব দ্রুত এগিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। আনুষ্ঠানিক বৈঠক, জাতিসংঘের অধিবেশন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে করমর্দন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়—সব মিলিয়ে ব্যস্ততায় কেটেছে প্রতিটি দিন। প্রথম পূর্ণ কর্মদিবসেই নির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে ১০টিতে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা তুলে ধরা।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে নিজের প্রথম ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলায় দেওয়া এই ভাষণে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক সংকট এবং রোহিঙ্গা সমস্যার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সফরের শুরু থেকেই সরকার এসব বিষয়কে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল।
বিশ্বমঞ্চে প্রথম বড় উপস্থিতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বের একটি বড় কারণ তার এটি প্রথম ইউএনজিএ সফর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এটিই তার প্রথম অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে এটি তার পরিবারের জাতিসংঘের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততারও নতুন অধ্যায়।
এর আগে তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। পরে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। ফলে তারেক রহমানের এবারের ভাষণকে পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এই মঞ্চে উপস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে পারিবারিক ধারাবাহিকতার বাইরে এই ভাষণের আলাদা গুরুত্বও রয়েছে। কারণ, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদারের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগটি এবারের সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলায় বক্তব্য, বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠ
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলা ভাষার ব্যবহার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলায় বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি দেশের জনগণের আবেগ, প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকারকে সরাসরি উপস্থাপন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ভাষণের আগে জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তব্য দেবেন এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তুলে ধরবেন।
বাংলা ভাষায় দেওয়া বক্তব্যের প্রতীকী গুরুত্বের পাশাপাশি এর বিষয়বস্তুও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল—জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক বিষয় এবং রোহিঙ্গা সংকট ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ও আলোচনায় থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
জলবায়ু থেকে বিশ্বশান্তি
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকি দেশের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের কর্মসূচিতেও জলবায়ু বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নিয়েছেন এবং সেখানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। একই সঙ্গে ‘Climate Action and the Just Transition’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন তিনি।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে জলবায়ু অর্থায়ন দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, অভিযোজন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন বাড়ানোর প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দাবি এবারও সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের এই সময়ে বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার অবস্থান তুলে ধরেছে।
রোহিঙ্গা সংকট—সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রাধিকার
নিউইয়র্ক সফরের সবচেয়ে ধারাবাহিক বিষয়গুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকট। প্রধানমন্ত্রী একাধিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডির সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি এবং তাদের নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পায়।
২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আলোচনাতেও বাংলাদেশ বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদার এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে সংকটটির স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক, তুরস্কের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনা
সফরের অন্যতম আলোচিত বৈঠক ছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক।
জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে তুর্কি হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এই বৈঠক বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্প ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও দুই দেশের আগ্রহ রয়েছে বলে বৈঠক-পরবর্তী তথ্য থেকে জানা যায়।
এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে নিউইয়র্কের এই বৈঠক ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের একটি নতুন ধাপ তৈরি করতে পারে।
ভুটান, মালদ্বীপ ও হাইতির সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক ছিল। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিস-আইমের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠক থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ শুধু বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে না, বরং বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকও ছিল সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বৈঠক মানেই তাৎক্ষণিক চুক্তি বা অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া নয়। এসব বৈঠক সাধারণত ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্ধারণ, নীতিগত সমঝোতা এবং পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তি তৈরির সুযোগ করে দেয়।
মেটাকে বাংলাদেশে অফিস খোলার আমন্ত্রণ
প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা দেখা গেছে। জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম মেটার প্রধান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা জোয়েল কাপলানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেখানে বাংলাদেশে মেটার অফিস খোলার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে—এই বৈঠক তারই একটি উদাহরণ।
বোয়িং চুক্তি ও অর্থনৈতিক বার্তা
নিউইয়র্ক সফরের অর্থনৈতিক অংশে আরেকটি বড় বিষয় ছিল বিমান কেনার উদ্যোগ। সফরকালে বাংলাদেশ সরকার ও বোয়িংয়ের মধ্যে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এ ধরনের চুক্তি শুধু বিমান পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ও জড়িত।
ফলে জাতিসংঘের রাজনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি নিউইয়র্ক সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি আলাদা মাত্রাও দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক ও দাতব্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ
২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
এই বৈঠকের গুরুত্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত। সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশন, মানবিক সংস্থা ও বেসরকারি উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রযুক্তি ও মানবিক সহায়তার বিভিন্ন প্রকল্পে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের নৈশভোজে বাংলাদেশের উপস্থিতি
জাতিসংঘের অধিবেশন উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন। লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীরা উপস্থিত ছিলেন।
এটি ছিল জাতিসংঘের অধিবেশনকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আয়োজনের একটি অংশ। একই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব পালন করাও এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে।
প্রবাসীদের চোখে নিউইয়র্ক সফর
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ২১ সেপ্টেম্বর জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে বাংলাদেশি প্রবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা ছিল ব্যাপক। প্রবাসীদের একটি অংশের প্রত্যাশা—জাতিসংঘের মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থের বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে উপস্থাপিত হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়বে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তার প্রকাশ্য উপস্থিতিতে হাসিমুখ, বিভিন্ন বিশ্বনেতার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় এবং ধারাবাহিক বৈঠক প্রবাসীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজকে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ফলাফলের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বাস্তব মূল্যায়ন হবে সফরের আলোচনার ফল ও পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতে।
‘ভালো কিছু আসছে’—প্রত্যাশার জায়গাটি কোথায়?
নিউইয়র্কে প্রবাসীদের মধ্যে যে ‘ভালো কিছু আসছে’ ধরনের প্রত্যাশার কথা শোনা যাচ্ছে, তার পেছনে মূলত কয়েকটি দৃশ্যমান বিষয় রয়েছে। প্রথমত, সফরের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক মানবিক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তৃতীয়ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও রোহিঙ্গা সংকট—একাধিক খাত একই সফরে আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব যোগাযোগের বাস্তব ফলাফল বুঝতে হলে পরবর্তী কয়েক মাসের দিকে তাকাতে হবে। কোনো বৈঠক থেকে চুক্তি, বিনিয়োগ, প্রকল্প, অর্থায়ন বা নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তখন তার প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
হাসান ফেরদৌসের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে এই বাস্তবতার বিষয়টি। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক ভাষণের পাশাপাশি অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী ইস্যুতে শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে।
বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে এখন মূল পরীক্ষা
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু—জাতিসংঘে কী বলা হলো—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বলা বিষয়গুলো কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেবে কি না।
রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তা বাড়ানো। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে লক্ষ্য বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। প্রযুক্তি খাতে লক্ষ্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে শান্তি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও সার্বভৌম সমতার নীতির সঙ্গে যুক্ত রাখা।
সুতরাং নিউইয়র্ক সফরকে একক কোনো বৈঠক বা ভাষণের মাধ্যমে বিচার করার চেয়ে পুরো কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি প্রাসঙ্গিক।
২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর এখন শেষ পর্যায়ের দিকে। ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে ম্যানহাটনে জেপি মরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার পরও সফরের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যস্ততা শেষ হচ্ছে না। একদিকে থাকবে বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে থাকবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ।
শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক সফরের সাফল্য নির্ভর করবে এই যোগাযোগগুলো থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ফল অর্জন করতে পারে তার ওপর।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন