https://www.prothomalony.com/
18248
new-york
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:১৫
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিষয় তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে।’
ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পাশাপাশি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’
বিশ্বের চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং একে অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।’ রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকেই এ সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা সামান্য হলেও এর বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে COP-31-এ আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং বন্যা ও খরার প্রভাব মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘Recovery, Restoration and Reconstruction’ বা ‘3-R’ কৌশল অনুসরণ করছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথাও জানান তিনি।
নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হওয়ায় আর্থসামাজিক রূপান্তরের সব পরিকল্পনায় নারীদের অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতে এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও খেলাধুলা নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দুপুরের খাবার, ব্যাগ ও ইউনিফর্ম দেওয়ার উদ্যোগ এবং পাঠ্যক্রমে খেলাধুলাকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
ভাষণের শেষ দিকে তারেক রহমান বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চায় সরকার, যেখানে দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বাংলাদেশে অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় তুলে ধরে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন