https://www.prothomalony.com/

18226

opinion

অভিমত

তামাকের পাতায় লাভ, মানুষ-মাটি-বনের ক্ষতি

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪১

একজন কৃষকের কাছে তামাক একটি লাভজনক ফসল হতে পারে। বীজ, সার, কীটনাশক, কারিগরি পরামর্শ, ঋণ বা অগ্রিম এবং উৎপাদিত পাতা বিক্রির ব্যবস্থা থাকায় তামাক অনেক কৃষকের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ অর্থনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠেছে। কিন্তু কৃষকের খাতায় যে লাভ দেখা যায়, সমাজের খাতায় সেটি সব সময় লাভ নয়।

এক একর জমিতে তামাক চাষ করে কৃষক কত টাকা পেলেন, এই হিসাবের সঙ্গে যদি নিজের ও পরিবারের শ্রম, ঋণের খরচ, তামাক শুকানোর জ্বালানি, মাটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ, পানি ও পরিবেশের ঝুঁকি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ওই জমিতে অন্য ফসল উৎপাদনের সুযোগব্যয় যোগ করা হয়, তাহলে লাভের অঙ্কটি কি একই থাকে?

তামাক চাষের বিতর্কটি আসলে এখানেই। প্রশ্নটি শুধু তামাক ভালো না খারাপ, তা নয়; প্রশ্ন হলো, কৃষকের ব্যক্তিগত লাভের বাইরে এই ফসলের প্রকৃত সামাজিক খরচ কত?

বাংলাদেশে তামাক চাষের পরিমাণ সময় ও অঞ্চলের সঙ্গে বদলেছে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে তামাক চাষের জমি এক লাখ আট হাজার হেক্টরে উঠেছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। আবার সাম্প্রতিক গবেষণায় কিছু অঞ্চলে তামাক চাষের বিস্তার ও উৎপাদন বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ জাতীয় চিত্রকে ‘তামাক চাষ শুধু বাড়ছেই’ এভাবে সরল করে দেখা ঠিক হবে না।

কৃষক তামাকের দিকে কেন যান, সেটিই বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০২৬ সালে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ কৃষক তামাক কোম্পানির ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং ৭৬ শতাংশ সরাসরি কোম্পানির কাছে তামাকপাতা বিক্রি করতেন। ৭২ শতাংশ কৃষক তামাক শুকানোর সময় পরিবেশদূষণের কথা জানিয়েছেন। তবে গবেষণাটি মাত্র একটি উপজেলার ৫০ জন কৃষকের ওপর পরিচালিত; তাই এর ফলাফলকে জাতীয় চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না।

এই তথ্য অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আনে। কৃষক কি স্বাধীনভাবে তামাক বেছে নিচ্ছেন, নাকি বাজারব্যবস্থা তামাককে তার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ অর্থনৈতিক বিকল্পে পরিণত করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তামাক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশে তামাক কোম্পানিগুলো মূলত চুক্তিচাষ ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি কৃষককে বীজ, সার, কীটনাশক, কারিগরি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় ঋণ বা অগ্রিম সরবরাহ করে। বিনিময়ে কৃষক নির্দিষ্ট পরিমাণে ও নির্দিষ্ট দামে তামাকপাতা কোম্পানির কাছেই বিক্রি করেন।

এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঋণ পরিশোধ না হলে কৃষক কার্যত কোম্পানির শর্ত মেনে পরের মৌসুমেও তামাক চাষ করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। কারণ বিকল্প ঋণ বা বাজারের কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা তার নেই। ফলে কৃষক একবার এই চক্রে ঢুকলে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই ব্যবস্থা আরও জটিল রূপ নেয়, যেখানে ভূমি মালিকানার প্রশ্নটিও বিতর্কিত। সরকারি বা সম্প্রদায়ের জমিতে তামাক চাষের বিস্তারের ফলে স্থানীয় ভূমি সম্পর্ক পাল্টে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে আরও মাঠপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন।

থানচি ও চকরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, যখন বিকল্প ফসলের বাজার ও দাম স্থিতিশীল থাকে, কৃষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে তামাক ছাড়তে পারেন। লামা-আলীকদমে কৃষি বিভাগের প্রণোদনাও এই প্রবণতাকে সমর্থন করছে।

তামাক কোম্পানিগুলো যে সমন্বিত সহায়তা দেয়, বীজ থেকে বাজার পর্যন্ত, তা কৃষকের কাছে তামাককে নিরাপদ করে তোলে। কারণ অন্য কোনো ফসলের ক্ষেত্রে কৃষক একই ধরনের সমন্বিত সহায়তা সবসময় পান না। ধান, ভুট্টা, ডাল, সরিষা বা সবজির জন্য যদি একইভাবে বীজ, ঋণ, প্রযুক্তি, বাজার ও ক্রয়-নিশ্চয়তার সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তাহলে কৃষকের সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে। তাই তামাক চাষ কমানোর প্রশ্নটি শুধু কৃষককে নিরুৎসাহিত করার নয়; বরং বিকল্প কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রশ্ন।

তামাক চাষে কৃষক ও শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু কীটনাশক বা সার ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। ভেজা তামাকপাতার সংস্পর্শে ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে সবুজ তামাকজনিত অসুস্থতা ঘটাতে পারে। এর ফলে বমি বমি ভাব, বমি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কীটনাশকের সংস্পর্শও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তামাক উৎপাদনের অর্থনৈতিক হিসাবের সঙ্গে নারী ও শিশুশ্রমের প্রশ্নটিও যুক্ত। কক্সবাজারের রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়নের একটি মাঠ প্রতিবেদনে তামাকের চুল্লিতে কাজ করা শ্রমিকদের বড় অংশ নারী ও শিশু বলে উঠে এসেছে। লালমনিরহাটেও অতীতে তামাক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকাজে বিপুলসংখ্যক শিশুর যুক্ত থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব তথ্য নির্দিষ্ট এলাকার বাস্তবতা; এগুলো দিয়ে সারা দেশের তামাকশ্রমিকদের অনুপাত নির্ধারণ করা যাবে না। কিন্তু ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। তামাকের উৎপাদন খরচ কমাতে যদি পরিবারের নারী ও শিশুর শ্রম ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই শ্রমের প্রকৃত মূল্য কি কৃষকের লাভের হিসাবের মধ্যে থাকে? শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার যে সুযোগ নষ্ট হতে পারে, তার সামাজিক মূল্যও কি সেই হিসাবের অংশ হওয়া উচিত নয়?

তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং চুল্লির বর্জ্য পরিবেশের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের মাতামুহুরী ও বাঁকখালী অববাহিকায় তামাক চাষের বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নদী, খাল ও জলজ পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব অভিযোগকে সর্বত্র বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করা পানি বা মাটি দূষণের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

মাতামুহুরী নদী অববাহিকা কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য এবং বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই অঞ্চলে তামাক চাষের বিস্তারকে শুধু একটি লাভজনক ফসলের প্রসার হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর পরিবেশগত প্রভাবের প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়।

তামাক চাষের পরিবেশগত খরচের একটি বড় অংশ আসে পাতা শুকানোর জ্বালানি থেকে। বিশেষ করে পার্বত্য ও উপকূলীয় কিছু এলাকায় কাঠ জ্বালিয়ে তামাক শুকানোর চুল্লি ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়।

গবেষণায় তামাক শুকানোর পদ্ধতিভেদে প্রতি একর তামাকের জন্য প্রায় ৫ দশমিক ২ থেকে ৬ টন পর্যন্ত কাঠ ব্যবহারের হিসাব পাওয়া গেছে। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি একর তামাক পোড়াতে গড়ে ১৩০ মণ কাঠের প্রয়োজন হয়। এটি সব এলাকা ও সব ধরনের চুল্লির জন্য একই নয়; কাঠের ব্যবহার পদ্ধতি, চুল্লির দক্ষতা ও স্থানীয় বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে।

বান্দরবানের লামা ও আলীকদমসহ পার্বত্য অঞ্চলে তামাকচুল্লির জন্য বিপুল জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও বন থেকে, কোথাও বসতবাড়ি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ থেকে কাঠ সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের প্রতিটি দাবির আলাদা মাঠপর্যায়ের যাচাই প্রয়োজন।

তাই তামাক চাষকে দেশের সব বন উজাড়ের একমাত্র কারণ বলা যাবে না। কিন্তু কোনো একটি ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হলে তার পরিবেশগত ব্যয় হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।

এক মৌসুমের তামাকের জন্য পোড়ানো একটি গাছ শুধু একটি গাছের ক্ষতি নয়। গাছের সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা, জীববৈচিত্র্য, কার্বন ধারণ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রেরও সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষিজমি শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। তাই তামাকের লাভ হিসাব করার সময় জমিটি অন্য কোনো ফসলের জন্য ব্যবহার করলে কী পাওয়া যেত, এই সুযোগব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের নদী ও চরাঞ্চলে তামাক চাষের বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে খাদ্যশস্যের জমি ব্যবহারের প্রশ্নটি এসেছে। আবার চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর চরে তামাকের জায়গায় বাদাম চাষের বিস্তারের উদাহরণও পাওয়া যায়। এটি দেখায়, বাজার ও উৎপাদন সহায়তা থাকলে কৃষকের কাছে বিকল্প ফসল বাস্তব বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু বিকল্প ফসল তখনই কার্যকর, যখন তার নিশ্চিত বাজার থাকে, দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, প্রয়োজনের সময় ঋণ পাওয়া যায় এবং উৎপাদনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি সম্প্রসারণসেবা পাশে থাকে।

তামাকের ক্ষেত্রে যে সমন্বিত সহায়তা কৃষককে উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে, খাদ্যশস্য ও বিকল্প ফসলের ক্ষেত্রেও তেমন ব্যবস্থা তৈরি না করে শুধু তামাক চাষ কমানোর আহ্বান কার্যকর হবে না।

তামাক নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র যে কর রাজস্ব পায়, তার বিপরীতে সমাজ ও অর্থনীতির মোট ব্যয় কত?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস এবং ইকোনমিকস ফর হেলথের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার ও উৎপাদনের সম্মিলিত বার্ষিক অর্থনৈতিক ব্যয় ছিল প্রায় ৮৭৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসম্পর্কিত ব্যয় ছিল প্রায় ৭৩০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন এবং পরিবেশগত ক্ষতির ব্যয় প্রায় ১৪৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন টাকা। একই সময়ে তামাক থেকে কর রাজস্ব ছিল প্রায় ৪০০ বিলিয়ন টাকা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি। ৮৭৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন টাকার হিসাবটি শুধু তামাক চাষের ক্ষতি নয়; এতে তামাকের ব্যবহার ও উৎপাদনের সম্মিলিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। তাই এই অঙ্ককে সরাসরি তামাক চাষের ক্ষতি বলা যাবে না।

তবু হিসাবটি একটি বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে আনে। তামাক থেকে পাওয়া রাজস্বের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতার যে ব্যয় তৈরি হয়, সেটিও রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক অর্থনীতির অংশ।

সম্প্রতি ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যেখানে তিন বা ততোধিক ফসলি কৃষিজমিতে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নকারী তামাক চাষ নিষিদ্ধ এবং এক ও দুই ফসলি জমিতে পর্যায়ক্রমে তামাক চাষ সীমিত করার বিধান রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে সংসদে পাস হওয়া ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইনেও এই বিধান সংরক্ষিত হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, তিন বা ততোধিক ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধ এবং এক ও দুই ফসলি জমিতে পর্যায়ক্রমে তামাক চাষ সীমিত করতে হবে।

তবে এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সীমা আছে। আইনটি রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে প্রযোজ্য।

এই সীমাটি মাতামুহুরীর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদীটির উজান ও অববাহিকার একটি বড় অংশ বান্দরবান জেলার লামা ও আলীকদম এলাকায়। স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলীকদমে চাষযোগ্য জমির ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ তামাকের অধীনে চলে গেছে। অথচ জাতীয় কৃষিজমি সুরক্ষার এই আইনের বিধান সেখানে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।

পার্বত্য অঞ্চলে আইনের এই সীমাবদ্ধতা কেবল প্রশাসনিক ব্যতিক্রম নয়; এটি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে ভূমি মালিকানার কাঠামোও জটিল। ম্রো ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকের আনুষ্ঠানিক ভূমি দলিল নেই এবং তারা সরাসরি কোম্পানির নিবন্ধন থেকে বাদ পড়েন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আইন করে তামাক চাষ সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। রংপুর অঞ্চলের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, আইন ও সরকারি পরামর্শ থাকলেও কোম্পানির প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক চাপ কৃষককে তামাকের দিকে টেনে নেয়। সম্প্রতি প্রায় ৫০ হাজার কৃষক পরিবার কোম্পানির প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে চাষ বাড়ালেও ফসল কাটার পর কোম্পানি ৮০ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যান করে। কৃষি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, কোম্পানির প্রভাব সরকারি পরামর্শের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

তাই কৃষককে তামাকের বদলে কোন ফসল চাষ করলে একই জমি থেকে ভালো আয় করতে পারবেন, সেই ফসলের নিশ্চিত বাজার কোথায়, বীজ, সার ও সেচের ব্যবস্থা কীভাবে হবে এবং চাষের শুরুতে প্রয়োজনীয় ঋণ বা আর্থিক সহায়তা কোথা থেকে পাওয়া যাবে, এসব প্রশ্নেরও বাস্তবসম্মত উত্তর দিতে হবে। কারণ তামাকের বিকল্প হিসেবে শুধু অন্য একটি ফসলের নাম বলে দিলেই কৃষকের জীবিকার বিকল্প তৈরি হয় না; বিকল্প ফসলের জন্য বাজার, ঋণ, প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তার একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়।

তামাক চাষ কমানোর সবচেয়ে টেকসই পথ শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরি করা। কৃষকের কাছে যে ফসলটি লাভজনক, সহজে বিক্রি করা যায় এবং যার জন্য উৎপাদনের শুরুতেই সহায়তা পাওয়া যায়, তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেটির দিকে ঝুঁকবেন।

তাই বিকল্প ফসলের জন্য দরকার উন্নত বীজ, সহজ ঋণ, সেচ ও প্রযুক্তি, কৃষি পরামর্শ, সংগ্রহব্যবস্থা, সংরক্ষণ এবং নিশ্চিত বাজার। তামাক কোম্পানিগুলো যে সমন্বিত সহায়তা দিয়ে কৃষককে তাদের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, কৃষি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও খাদ্যশস্য ও বিকল্প ফসলের ক্ষেত্রে তেমন সমন্বিত সহায়তা দিতে হবে।

মাতামুহুরীর চরে বাদাম চাষের উদাহরণটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তামাকের বিকল্প হিসেবে কোনো ফসল তখনই টেকসই হবে, যখন কৃষক দেখবেন, সেই ফসলেও আয় করা সম্ভব, বাজার আছে এবং উৎপাদনের ঝুঁকিতে তিনি একা নন।

অর্থাৎ তামাকের বিকল্প তৈরি মানে শুধু অন্য একটি বীজ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া নয়; একটি সম্পূর্ণ বিকল্প কৃষি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা।

তামাকের পাতায় কৃষকের চোখে যে লাভ দেখা যায়, তার পেছনে অনেক অদৃশ্য ব্যয় লুকিয়ে থাকতে পারে। নিজের ও পরিবারের শ্রম, ঋণের চাপ, মাটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ, চুল্লির জ্বালানি, পানি ও পরিবেশের ঝুঁকি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অন্য ফসল উৎপাদনের হারানো সুযোগ এর সঙ্গে যুক্ত।

এই হিসাব তাই শুধু কৃষকের আয় ব্যয়ের খাতা দিয়ে শেষ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রকৃতির হিসাবও।

তামাক চাষ নিয়ে নীতি নির্ধারণের সময় তাই একটি প্রশ্ন সবচেয়ে জরুরি, কৃষককে তামাক থেকে সরিয়ে দিলে তিনি কোথায় যাবেন? শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কৃষকের আয় কমিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। আবার কৃষকের স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য মাটি, বন, পানি, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও উপেক্ষা করা যায় না।

বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ শুধু তামাকবিরোধী প্রচারে নয়; কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষাকে একই নীতির ভেতরে নিয়ে আসার মধ্যেই।

তামাকের প্রকৃত হিসাব তাই শুধু পাতার দামে নয়, মাটি, বন, পানি, স্বাস্থ্য, শ্রম ও ভবিষ্যতের দামে করতে হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন