https://www.prothomalony.com/
18218
opinion
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর জীবন ও আদর্শ গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু বর্তমান যুগে ক্যাম্পাসগুলো সেক্যুলারিজম, নাস্তিক্যবাদ ও পশ্চিমা সংস্কৃতি চর্চার এমন এক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অনেক তরুণ দুর্বল ঈমান ও পরিচয় সংকটে ভোগে। ফলে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করলেও শিক্ষাজীবন শেষে অনেকে বের হয় গভীর আত্মিক শূন্যতা নিয়ে। এই বাস্তবতায় একজন মুসলিম শিক্ষার্থীকে ভাবতে হবে আমি কেন লেখাপড়া করছি, লক্ষ্য কি কেবল চাকরি, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টি?
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য ও ধর্মহীন আধুনিকতা শিক্ষার্থীর চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অনেকে নিজের ইসলামিক পরিচয় নিয়ে সংকোচ বোধ করতে শুরু করে এবং দ্বীনকে ব্যক্তিগত বিষয় মনে করে বা পিছিয়ে পড়া ভাবতে শুরু করে। অথচ কিয়ামতের দিন আল্লাহ এসব জিজ্ঞেস করবেন না, জিজ্ঞেস করবেন ঈমান ও আমল সম্পর্কে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত বান্দার পা নড়বে না জীবনকাল, যৌবনকাল, সম্পদের উৎস ও ব্যয়, এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল সম্পর্কে (তিরমিযি: ২৪১৬)।
আজকের বাস্তবতায় যৌবনকালকে অনেকে কেবল উপভোগের সময় মনে করে। হারাম সম্পর্ক, ফ্রি-মিক্সিং, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি ও উদ্দেশ্যহীন জীবন ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে ধ্বংস করে দেয়। অথচ ইসলাম কেবল সফল কর্মজীবী নয়, বরং মুত্তাকী, চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
জ্ঞান অর্জনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে চেনা ও জানা। আকিদা, ইবাদতের বিধান এবং হালাল-হারাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজে আইন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)। তবে দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জনও যদি আখিরাতের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হতে পারে। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আসমান-জমিনের সৃষ্টিতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করে (সূরা আলে ইমরান: ১৯০-১৯১)। যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সুরিয়ানি ভাষা শিখতে আদেশ করেছিলেন (তিরমিযি: ২৭১৫)। সুতরাং একজন মুসলিম শিক্ষার্থী যদি সঠিক নিয়তে আধুনিক বিষয়ে পড়াশোনা করে, তার সেই শিক্ষাও ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
দুঃখজনকভাবে আজ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে সিজিপিএ, উচ্চ বেতন ও সামাজিক স্ট্যাটাসই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আল্লাহ বলেন, যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রেখে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম; পার্থিব জীবন ধোঁকার উপকরণ ছাড়া কিছু নয় (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। তাই মেধা ও যোগ্যতা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উম্মাহর কল্যাণে ব্যয় না হলে বাহ্যিক সফলতা সত্ত্বেও আখিরাতে তা দেউলিয়াত্বই বয়ে আনবে।
দ্বীনের জ্ঞান সঠিক উৎস থেকে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইবনে সিরিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই ইলম দ্বীন, তাই লক্ষ্য করো কার কাছ থেকে তোমরা দ্বীন গ্রহণ করছ (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দামা)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ, যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরবে ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না (মুয়াত্তা মালেক: ১৫৯৪)। বর্তমানে ক্যাম্পাসে হাদিস অস্বীকারকারীদের ফিতনাও মাথাচাড়া দিচ্ছে, যা থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আদব ও আত্মশুদ্ধি ছাড়া জ্ঞান অহংকার ও রিয়ার জন্ম দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ত্রিশ বছর আদব শিখেছি এবং বিশ বছর ইলম অর্জন করেছি, কেননা সালাফগণ ইলমের আগে আদব শিখতেন (গায়াতুন নিহায়া: ১/১৯৮)। ইবনুল জাওযি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আদব হলো ইলমের দুই-তৃতীয়াংশ। প্রকৃত জ্ঞান তখনই সার্থক যখন তা বিনয়, আল্লাহভীতি ও উত্তম আখলাক তৈরি করে।
ক্যাম্পাস জীবনে কয়েকটি প্রধান ফিতনা লক্ষণীয়। প্রথমত, আত্মপরিচয়ে হীনমন্যতা—স্মার্ট প্রমাণের তাড়নায় অনেকে দ্বীনকে সংকুচিত করে। উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা ছিলাম নিকৃষ্ট জাতি, আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন, তাই অন্য কিছুতে সম্মান খুঁজলে আল্লাহ পুনরায় লাঞ্ছিত করবেন (মুসতাদরাকে হাকিম: ২০৭-২০৮)। দ্বিতীয়ত, ফ্রি-মিক্সিং ও অবৈধ সম্পর্কের ফাঁদ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন, দুনিয়া ও নারী থেকে সাবধান থাকো, কেননা বনী ইসরাইলের প্রথম ফিতনা নারীদের মধ্যেই ঘটেছিল (সহিহ মুসলিম: ২৭৪২)। তৃতীয়ত, অসৎ সঙ্গের প্রভাব আল্লাহ বলেন, হায় দুর্ভোগ, যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম, সে আমাকে উপদেশ থেকে পথভ্রষ্ট করেছিল (সূরা ফুরকান: ২৮-২৯)।
সময় ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় থাকে সুস্থতা ও অবসর (সহিহ বুখারি: ৬৪১২)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহারই একজন শিক্ষার্থীকে অসাধারণ মানুষে রূপান্তরিত করতে পারে।
শিক্ষার্থীর সামাজিক দায়বদ্ধতাও অপরিসীম। আল্লাহ বলেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের উদ্ভব হয়েছে মানবকল্যাণের জন্য, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও ও অসৎকাজে নিষেধ করো (সূরা আলে ইমরান: ১১০)। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের জ্ঞান দিয়ে সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত হয়, তখনই সে প্রকৃত খাইরুল উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।
আধুনিক ফিতনা ও বস্তুবাদী মোহের মাঝে দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে হলে ইসলামের সাজে নিজেকে সজ্জিত করার বিকল্প নেই। প্রতিটি মুহূর্ত ও সুযোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক একটি আমানত। সময়ের সঠিক মূল্যায়ন, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আদব-আখলাকের চর্চার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী নিজেকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। কুরআন-সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আখিরাতকে সামনে রেখে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করাই একজন মুমিন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্যের পথ। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
সন্তানদের প্রতি সালাফদের উপদেশ
মোঃ মেহেদী হাসান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
সন্তান প্রতিটি পিতা-মাতার হৃদয়ের টুকরো, ভবিষ্যতের উত্তরসূরী এবং সমাজ ও উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। একজন মুসলিম অভিভাবক সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়, বরং আখিরাতের মুক্তির পথেও পরিচালিত করতে চান। ইতিহাসের পাতায় সালাফে সালেহীনদের জীবনে আমরা দেখি, তারা সন্তানদের প্রতি কতটা গভীর ভালোবাসা ও প্রজ্ঞা নিয়ে উপদেশ দিতেন। সূরা লোকমানে বর্ণিত সন্তানের প্রতি লোকমান হাকিমের উপদেশমালা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই নিবন্ধে সালাফদের হৃদয়স্পর্শী কিছু উপদেশ তুলে ধরা হলো।
সালাফগণ পরস্পর সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার উপদেশ দিতেন। উসমান খাতেবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমার সন্তানকে আদব শিক্ষা দাও, কেননা তুমি জিজ্ঞাসিত হবে তাকে কীভাবে আদব শিখিয়েছ এবং কী জ্ঞান দিয়েছ (বায়হাকি, সুনানুল কুবরা: ৩/১২০)। ইব্রাহিম আল-হারবি রাহিমাহুল্লাহ একজন পিতাকে বলেছিলেন, সাবধান থাকবে, তোমার সন্তান যেন তোমাকে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে না দেখে, তাহলে তাদের চোখে তুমি তুচ্ছ হয়ে যাবে। ইবনে রজব হাম্বলি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অর্থ দান করার চেয়ে সুন্দর কথায় উত্তম আচরণ করা বেশি পছন্দনীয়; লোকমান তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, তোমার কথা যেন সুন্দর হয় এবং মুখ যেন হাস্যোজ্জ্বল থাকে, তাহলে যারা সোনা-রূপা দান করে তাদের চেয়ে তুমি অধিক জনপ্রিয় হবে।
ঈমানের উপদেশ প্রসঙ্গে উবাদা ইবনে সামিত রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পুত্রকে বলেন, হে বৎস! তুমি ততক্ষণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না জানবে যা তোমার উপর ঘটেছে তা এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না, আর যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ঘটার ছিল না; আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেন লেখো, কলম জিজ্ঞেস করল কী লিখব, আল্লাহ বললেন কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদির লেখো (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭০০, তিরমিযি: ৩৩১৯)।
পাপ পরিত্যাগের শিক্ষায় আতা ইবনে আবি রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর পুত্রকে বলেন, আল্লাহর আনুগত্যকারী ও অবাধ্যতাকারীর ঈমান একরকম হতে পারে না (হেবাতুল্লাহ লালকায়ি, শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ)। মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার উপদেশে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুশয্যায় পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, তুমি আল্লাহকে ভালোবাসবে ও ভয় করবে, তাহলে মৃত্যু যখনই আসুক তা কখনো অপছন্দ করবে না (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ২/১৫)।
সালাতের উপদেশে মুআজ ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সন্তানকে বলেন, যখন সালাত আদায় করবে, বিদায়ী ব্যক্তির মতো আদায় করো, মনে করো না তুমি আর ফিরে আসতে পারবে; আর জেনে রাখো, মুমিন মারা যায় দুই কল্যাণের মাঝখানে (আহমাদ ইবনে হাম্বল, কিতাবুয যুহদ: ১৪৮)। অল্পে তুষ্টির উপদেশে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু পুত্র আব্দুল্লাহকে বলেন, তুমি এমন লোকদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহর রিযিক পেটেও ব্যবহার করে, পিঠেও ব্যবহার করে (আহমাদ ইবনে হাম্বল, কিতাবুয যুহদ: ১৫৮)। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রাচুর্য চাইলে অল্পে তুষ্টির মাধ্যমে অন্বেষণ করো, কেননা তা এমন সম্পদ যা কখনো নিঃশেষ হয় না (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক)।
সৎ সঙ্গ গ্রহণের উপদেশে জাফর ইবনে মুহাম্মাদ তাঁর পুত্র মুসাকে বলেন, সাক্ষাৎ করলে ভালো লোকের সাথেই করো, পাপীদের সাথে নয় (হাফেজ মিজ্জি, তাহজিবুল কামাল)। আলী ইবনুল হাসান রাহিমাহুল্লাহ পুত্রকে বলেন, পাপী, কৃপণ, মিথ্যাবাদী, মূর্খ ও আত্মীয়তা ছিন্নকারীর সাথে বন্ধুত্ব করো না (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১২/৪৮৫)। লোকমান তাঁর ছেলেকে বলেন, ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে চেনা যায় রাগের সময়, সাহসীকে যুদ্ধক্ষেত্রে, আর প্রকৃত ভাইকে প্রয়োজনের সময় (ইবনে মুফলিহ, আল-আদাবুশ শারইয়াহ: ৩/৫৬২)।
শুকরিয়া আদায়ের উপদেশে সালেহ ইবনে জানাহ দিমাশকি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমার একটি দিন যদি দ্বীন, শরীর, সম্পদ ও পরিবার নিরাপদে থেকে অতিবাহিত হয়, তবে বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করো, কেননা কত মানুষের সেদিনই সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক: ২৩/৩২৫)। অপচয় রোধের উপদেশে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পুত্র আব্দুল্লাহকে বলেন, মনে যা চাইবে তাই খাওয়াই মানুষের অপচয়কারী হওয়ার জন্য যথেষ্ট (মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন উওয়াইজাহ, ফাসলুল খিতাব)।
কথার গোপনীয়তা রক্ষার উপদেশে আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহুর মা তাঁকে বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোপন কথা গোপন রাখো (মুসনাদে আহমাদ: ১৩৩৮০)। ইলম অর্জনের উৎসাহে ইবরাহিম ইবনে আদহাম রাহিমাহুল্লাহর পিতা প্রতিটি হাদিস মুখস্থের বিনিময়ে দিরহাম উপহার দিতেন (খতিব বাগদাদি, শরফু আসহাবিল হাদিস)। বিদআতীদের কথা না শোনার উপদেশে তাউস রাহিমাহুল্লাহ পুত্রকে বলেন, কানে আঙুল দাও, হৃদয় দুর্বল, ভ্রান্ত আকিদায় আক্রান্ত হতে সময় লাগে না (ইবনুল জাওযি, তালবিসু ইবলিস)।
সচ্চরিত্র গঠনের উপদেশে সাইদ ইবনুল আস রাহিমাহুল্লাহ পুত্রকে বলেন, মহৎ গুণাবলি সহজলভ্য হলে নীচু লোকেরাই আগে অর্জন করত, কিন্তু তা কঠিন ও তিক্ত (ইবনে আবিদ্দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক)। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সম্মানিত ব্যক্তির সাথে ঠাট্টা করো না, নীচু স্বভাবের সাথেও নয় (ইবনে আবিদ্দুনিয়া, আস-সামতু ওয়া আদাবুল লিসান)। ঋণ না করার উপদেশে উকবা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর প্রাক্কালে বলেন, তোমরা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছাড়া হাদিস গ্রহণ করো না, আবা পরিধান করলেও ঋণ করো না, এবং কুরআন থেকে হৃদয় বিচ্যুতকারী কবিতা লেখায় সময় নষ্ট করো না (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির: ৭৩৭)।
সুধারণা পোষণের উপদেশে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহ পুত্রকে বলেন, মুসলিমের কথা ভালো অর্থে ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে খারাপ অর্থে নিও না (আবু নুআইম, হিলয়াতুল আউলিয়া: ৫/২৭৮)। সব বিষয়ে সৎ নিয়ত রাখার উপদেশে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ পুত্রকে বলেন, সর্বদা কল্যাণের নিয়ত করবে, যতক্ষণ কল্যাণের নিয়ত করবে ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যেই থাকবে (ইবনুল জাওযি, মানাকিবুল ইমাম আহমদ)। যুলুম থেকে সতর্ক করে খালেদ ইবনে বারমাক বন্দী অবস্থায় পুত্রকে বলেন, রাতের অন্ধকারে কোনো মজলুমের দোয়ায় আমরা গাফেল ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ গাফেল ছিলেন না (খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ: ১৪/১৩৬)।
সন্তানদের প্রতি সালাফদের এই উপদেশাবলি নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং ছিল এক মহান দায়িত্ববোধ ও আখিরাতমুখী দূরদৃষ্টির প্রতিফলন। তারা সন্তানকে কেবল দুনিয়ায় সফল নয়, বরং আল্লাহভীরু, আমানতদার ও দ্বীনের খেদমতে নিবেদিত মুমিন হিসেবে গড়তে সচেষ্ট ছিলেন। আজকের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে সালাফদের এই পারিবারিক নীতিমালা থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমীন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন