https://www.prothomalony.com/

18210

opinion

অভিমত

নীরব উচ্চ রক্তচাপ: ভালো আছি বললেই কি সত্যিই ভালো আছি?

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:০৮

সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া, বিকেলে সন্তানদের পড়াশোনা, রাতে মোবাইল দেখে ঘুম—আমাদের জীবন যেন সব সময়ই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই বলেন, “আমার তো কোনো সমস্যা নেই, প্রেসার কেন মাপব?” কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো—এটি অনেক সময় কোনো ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে যেতে পারে।
তাই একে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩০–৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। তাঁদের প্রায় ৪৪ শতাংশই জানতেন না যে তাঁদের এই সমস্যা আছে। 

রক্তচাপ আসলে কী?

হৃদ্‌পিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করে, তখন রক্তনালির দেয়ালে যে চাপ পড়ে, সেটিই রক্তচাপ। রিপোর্টে দুটি সংখ্যা থাকে। প্রথমটি সিস্টোলিক—হৃদ্‌পিণ্ড সংকুচিত হওয়ার সময়ের চাপ। দ্বিতীয়টি ডায়াস্টোলিক—হৃদ্‌পিণ্ড বিশ্রামে থাকার সময়ের চাপ। যেমন, ১২০/৮০। এখানে ১২০ হলো ওপরের সংখ্যা, ৮০ নিচের সংখ্যা।

সংজ্ঞা ও চিকিৎসার লক্ষ্য দেশ, বয়স, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে বারবার রক্তচাপ বেশি এলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নির্দেশিকায় ধারাবাহিকভাবে ১৩০/৮০ বা তার বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুই ভিন্ন দিনে ১৪০/৯০ বা তার বেশি পাওয়া গেলে উচ্চ রক্তচাপের কথা বলে।

লক্ষণ না থাকলেও কেন চিন্তার কারণ?

উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে রক্তনালিকে শক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে হৃদ্‌পিণ্ডকে বেশি শক্তি দিয়ে কাজ করতে হয়। বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে এর প্রভাব পড়তে পারে—

* হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরে
* মস্তিষ্কে স্ট্রোক এবং স্মৃতিশক্তি বা চিন্তাশক্তির অবনতিতে
* কিডনি ক্ষতি ও কিডনি বিকলে
* চোখের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তিতে
* গর্ভাবস্থার জটিলতায়

অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি সংখ্যার সমস্যা নয়; এটি হৃদ্‌পিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখ—সব কটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার বিষয়।

কারা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন?

বয়স বাড়লে ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু এখন এটি শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। শহুরে জীবন, কম হাঁটা, অতিরিক্ত লবণ, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ ও ওজন বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা যাচ্ছে।

ঝুঁকি বেশি হতে পারে যাঁদের—

* পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক বা হৃদ্‌রোগের ইতিহাস আছে
* ওজন বেশি বা পেটের মেদ বেশি
* ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে
* ধূমপান বা তামাক ব্যবহার করেন
* নিয়মিত অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার খান
* শারীরিক পরিশ্রম কম এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকেন
* দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অনিদ্রায় ভোগেন

চিকিৎসকদের জন্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে। প্রেসক্রিপশন দেওয়ার পাশাপাশি রোগী রক্তচাপ কীভাবে মাপছেন, ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছেন কি না, ব্যথার কিছু ওষুধ বা অন্য কোনো ওষুধ রক্তচাপ বাড়াচ্ছে কি না—এসব বাস্তব বিষয়ও জানতে হবে।

ঘরে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম

অনেকে একবার তাড়াহুড়ো করে প্রেসার মেপে ভীত হয়ে যান, আবার কেউ একটি স্বাভাবিক রিডিং দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যান। দুটিই ঠিক নয়। একটি রিডিং হলো একটি মুহূর্তের ছবি; কয়েক দিনের নথি হলো আসল গল্প।

ঘরে মাপতে চাইলে—

১. সম্ভব হলে বাহুর ওপর লাগানো স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহার করুন; কবজি বা আঙুলের যন্ত্র তুলনামূলক কম নির্ভরযোগ্য।
২. মাপার ৩০ মিনিট আগে চা-কফি, ধূমপান ও ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
৩. প্রস্রাবের চাপ থাকলে আগে সেরে নিন।
৪. পিঠ ঠেস দিয়ে বসুন, পা মেঝেতে রাখুন, পা ক্রস করবেন না।
৫. পাঁচ মিনিট শান্ত হয়ে বসে থাকুন; কথা বলা বা ফোন দেখা বন্ধ রাখুন।
৬. বাহু টেবিলে হৃদ্‌পিণ্ডের সমতলে রাখুন; কাপড়ের ওপর কাফ লাগাবেন না।
৭. এক মিনিট বিরতিতে দুবার মাপুন এবং দুটিই লিখে রাখুন।

প্রতিদিন একই সময়ে কয়েক দিন মাপা ও সেই রেকর্ড চিকিৎসককে দেখানো খুব উপকারী। যন্ত্রটির কাফের মাপও বাহুর সঙ্গে মানানসই হওয়া জরুরি।

নিয়ন্ত্রণের পাঁচ বাস্তব পদক্ষেপ

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ মানেই শুধু ওষুধ নয়। ওষুধ প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু জীবনযাপনের পরিবর্তনও সমান প্রয়োজনীয়।

লবণ কমান। টেবিলে আলাদা লবণ, অতিরিক্ত আচার, চিপস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, সস ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসে লবণ বেশি থাকে। স্বাদ বাড়াতে লেবু, ধনে পাতা, মরিচ, আদা বা অন্যান্য মসলা ব্যবহার করা যায়।

প্রতিদিন হাঁটুন। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম—দ্রুত হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানো—উপকারী। শুরু করুন প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট দিয়ে।

ওজন কমান। খুব দ্রুত নয়, ধীরে ও টেকসইভাবে ওজন কমানোর পরিকল্পনা করুন। পেটের মেদ কমানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুম ও মানসিক চাপকে গুরুত্ব দিন। নিয়মিত ঘুম, স্ক্রিন থেকে বিরতি, গভীর শ্বাস নেওয়া, হাঁটা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো প্রেসার নিয়ন্ত্রণের সহায়ক হতে পারে।

ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না। প্রেসার স্বাভাবিক আসছে বলেই ওষুধ বন্ধ নয়—অনেক সময় ওষুধ খাওয়ার কারণেই সেটি স্বাভাবিক থাকে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

কখন জরুরি সাহায্য প্রয়োজন?

যদি রক্তচাপ ১৮০/১২০-এর বেশি আসে, এক মিনিট পরে আবার মাপুন। একই রকম বেশি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা-পরামর্শ নিন। আর সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হওয়া, হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা থাকলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

শেষ কথা হলো, উচ্চ রক্তচাপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো সচেতনতা। শরীর সব সময় বিপদের ঘণ্টা বাজায় না। তাই ভালো লাগছে কি না, শুধু সেটি নয়—নিজের রক্তচাপের সংখ্যাটিও জানুন। আজ একটি সঠিক মাপ, আগামী দিনের একটি স্ট্রোক বা কিডনি জটিলতা ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন