https://www.prothomalony.com/

18200

opinion

অভিমত

প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, সম্পদ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:২৪

জনসংখ্যাঅধ্যুষিত অন্যতম দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এ দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৭০-এর ওপর। একসময় কনিষ্ঠের প্রতি বড়দের এই ছিল আশীর্বাদ। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে বাড়ছে প্রায় তিনজন। প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে প্রায় ১১ জন, প্রতিদিন ২ লাখ ৮০ হাজার জন। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ৭০ বছরের বেশি প্রবীণ নাগরিক। আগামী দিনে যে ঘটনাটি গোটা বিশ্বে সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে এগিয়ে আসছে, তা হলো প্রবীণদের সংখ্যাবৃদ্ধি। পৃথিবীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ নারী-পুরুষ পৌঁছে যাচ্ছেন আশির কোঠায়। এমন চললে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে দাদা-দাদিদের সংখ্যা নাতি-নাতনিদের সংখ্যার দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

তৃতীয় বিশ্বের কথা বাদ দিলে উন্নত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রগতি এবং পুষ্টি, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে প্রচুর অর্থ লগ্নি করার ফলে প্রত্যাশিত আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্বে ৬০ কোটি প্রবীণ নাগরিকের (সিনিয়র সিটিজেন) জীবন ও স্বাস্থ্যের পরিচর্যা নিয়ে নীতি-নির্ধারকেরা ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করেছেন। ১৯৫০ সালে সারা বিশ্বে প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যা ছিল ২০ কোটি। আগামী ২০২৫ সালে তা দাঁড়াবে ১২০ কোটিতে। আগামী দুই দশকের মধ্যে আমেরিকায় প্রতি চারজনের একজন এবং জাপানে মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হবে ষাটোর্ধ্ব বা প্রবীণ নাগরিক। ইতালিতে এখন মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশই ৬০ বছরের ওপর। অন্যদিকে ১৫ বছর বয়সীদের সংখ্যা পৃথিবীতে ১৪ শতাংশ। ২০৩০ সালে ইতালিতে চাকুরিরতদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে পেনশনভোগীদের বা প্রবীণ যুবকদের উপস্থিতি। কাজের লোক পাওয়াটাই তখন মুশকিল হবে। ২০২৫ সালে ইতালি ও জাপানে প্রবীণ নাগরিকের হার হবে বিশ্বে সর্বাধিক, ৩৩ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান প্রবীণ নাগরিকদের চাপে আমাদের দেশেও বয়স্কদের কপাল বদলে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সময় প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ মাত্র। বর্তমানে তা হয়েছে ৬০ লাখের মতো। ২৫ বছর পরে তা বেড়ে দাঁড়াবে কোটিতে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কখন এবং কেন বুড়ো হই? বয়স বাড়ে, তাই সবাইকে একদিন বুড়ো হতে হয়। বয়স যত বাড়ে, আমরা তত বুড়ো হই। বুড়ো হতে আমরা কেউ চাই না। কারণ বুড়ো হলে কর্মক্ষমতা এবং দেহের সৌন্দর্য কমে যায়। এ ছাড়া পরিবার ও সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের শরীরে বুড়ো হওয়ার প্রথম লক্ষণ ৩৫-৪৫ বছর বয়স থেকেই শুরু হয়ে যায়। আসলে বয়স যখন বাড়তে থাকে, তখন আমাদের দেহে কোলাজেন নামের এক তন্তুজাতীয় পদার্থ তৈরি করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। কোলাজেন দেহত্বক, পেশি, হাড় প্রভৃতির মধ্যে থেকে আমাদের শরীরকে মজবুত রাখতে সাহায্য করে। বয়স বেশি হলে ওই কোলাজেন তন্তু তৈরি কমে যায়। ফলে বার্ধক্য আসে এবং শরীর নরম ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহকোষের বিভাজন ক্ষমতা কমে যায়, তখন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ফলে যকৃৎ, বৃক্ক ইত্যাদির ওজন ও কার্যক্ষমতা কমতে শুরু হয়। অধিক বয়স হলে মস্তিষ্কেও স্নায়ুকোষ ও দেহকোষ সংখ্যা কমতে শুরু করে, ফলে স্মৃতি লোপ, বুদ্ধি হ্রাস ও চিন্তাশক্তি কমে যায়।

বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে গতিশীল সমাজে প্রবীণরা পাল্লা দিতে পারছেন না। তাই জাতিসংঘ ১৯৯৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৯৯ সালের ৩ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদেরও কিছু দেওয়ার আছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য করা যাবে না। তাদের দিতে হবে সমান স্বাধীনতা, মর্যাদা, পরিচর্যা, অংশগ্রহণ এবং আত্মতৃপ্তির সুযোগ।

শুনলে অবাক হবেন যে আমেরিকাতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে ‘রিটায়ারমেন্ট’ শব্দটা তুলে দেওয়া হোক। কারণ, প্রতিদিন উচ্চারণে দাদু, বুড়ো, অবসরপ্রাপ্তদের এগুলো মনে করিয়ে দেয় জরা, দুর্বলতা ও মৃত্যুর অনুষঙ্গ। তাই সেখানে ষাটোর্ধ্ব বয়সের লোকদের বলা হয় ‘প্রবীণ যুবক’।

প্রাচীন সমাজে যৌথ পরিবার ছিল। কিন্তু এখন সেই যৌথ পরিবার ভেঙে হচ্ছে একক পরিবারের যুগ। সন্তানের দায়িত্ব হবে মা-বাবার প্রতি পূর্ণ মর্যাদায় সেবা করা ও সাহায্যের হাত প্রসারিত করা। কারণ তারাও একদিন সন্তানের জন্য আত্মত্যাগ, সেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু ছেলেরা যদি মানুষ না হয় কিংবা পুত্রবধূ যদি বাংলাদেশি নারীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ না হন, তবেই সমস্যা। বর্তমানে হিরের টুকরোর মতো হাইটেক ছেলেরা মা-বাবার খবর রাখে না। ওরা দেশে-বিদেশে উচ্চপদে চাকরি করে, মোটা বেতন পায়, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে। এটাই হচ্ছে বর্তমান যুগের শিক্ষার মূল্যবোধ।

আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো বয়স্কদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য বলে মনে করে। জরা, স্থবিরতা, বার্ধক্য প্রতিরোধের গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যাতে মানুষের বুড়িয়ে যাওয়ার রহস্য বের করা যায়। প্রবীণদের সচল রাখতে চিকিৎসাশাস্ত্রে সংযোজিত হয়েছে নতুন শাখা, যার নাম ‘জেরিয়াট্রিক্স’। বয়সের সমস্যার সমাজতাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত দিকগুলো দেখার জন্য ইদানীং জেরন্টোলজিকে আশ্রয় করার কথা ভাবতে হচ্ছে। জেরন্টোলজিস্টরা বলেছেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়, এই ধারণাটা ভুল। জেরন্টোলজি ও নিউরো সায়েন্সের গবেষণা থেকে জানা যায় যে মানসিক সক্রিয়তা মস্তিষ্ক সতেজ রাখে, ফলে বেঁচে থাকার সময় বাড়ে। একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশি সমাজে বুড়ো মানুষদের গুরুত্ব ছিল। পরিবারের সবাই তাদের কথা শুনত। সংসারে, সমাজে সকলে তাদের সম্মান করত, মর্যাদা দিত। বর্তমানে জীবন-জীবিকার প্রতিযোগিতা এবং উন্নততর রুজির টানে ভিটেমাটি ছেড়ে আজকাল দেশে-বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা যৌথ পরিবারকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির আধুনিক বাতাবরণে বয়স্করা আর কর্তা নন। তাদের অস্তিত্বটুকু বজায় রাখার জন্য নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে নিজেরই সন্তান-সন্ততির কাছে। উপার্জন না থাকলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছেলের পরিবারে তিনি বোঝা।

বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা যা আছে, তার মধ্যে ৪৫ শতাংশ মহিলা এবং তার অর্ধেকই আবার বিধবা। এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ৯০ শতাংশেরই না আছে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্র্যাচুইটি। কারণ তারা অর্থনীতির অসংগঠিত ক্ষেত্রের বাসিন্দা। এদের ৫০ শতাংশ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এদের অবস্থাটা অত্যন্ত করুণ ও শোচনীয়। সরকারি সহায়তা অবলম্বন ছাড়া তাদের বেঁচে থাকার পথ নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, প্রবীণদের বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অবজ্ঞা করা চলবে না; তাদের প্রতি পরিবারের বা রাষ্ট্রের বীভৎস আচরণ ও নিষ্ঠুর অত্যাচার করা চলবে না। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অন্যান্য সুবিধাসহ পেনেশনের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও আবাসন সমস্যা সমাধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা সমাজের বোঝা নন, এরা সমাজ ও দেশের সম্পদ।


লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট। সহসভাপতি, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, সিলেট।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন