https://www.prothomalony.com/

18202

opinion

অভিমত

পুতুলের পতনে ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:২৭

সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগকে আমি কোনো সাধারণ চাকরি ছাড়ার ঘটনা হিসেবে দেখি না। আমার কাছে এটি একটি ক্ষমতাবান পরিবারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা। যে পরিবার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে দেশ পরিচালনা করেছে, সেই পরিবারের একজন সদস্য আজ আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অসততার অভিযোগ এবং অন্যান্য অভিযোগের তদন্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের খবর প্রকাশের পর এই পদত্যাগের ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার তাকে এই পদের জন্য প্রার্থী করেছিল। পরে তিনি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখানেই প্রথম বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে কীভাবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে গেলেন। তার নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা ছিল। তার যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। জমি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়েও তদন্তের কথা জানা যায়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তিনি বেতনবিহীন প্রশাসনিক ছুটিতেও ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তার পদত্যাগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। কিন্তু একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাকে ঘিরে যখন একাধিক অভিযোগ তদন্তের পর্যায়ে যায়, তখন তার নিয়োগ, যোগ্যতা এবং দায়িত্ব পালনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ পুতুল যে পরিবারের সন্তান, সেই পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাদেশের গত দেড় দশকের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার মা শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার ভাই সজীব ওয়াজেদ জয় ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন। তার খালা শেখ রেহানা ছিলেন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বলয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই পরিবারের আরেক সদস্য টিউলিপ সিদ্দিককেও বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রিত্বের পদ তাকে ছাড়তে হয়েছে।

তাই আমার কাছে প্রশ্নটি শুধু সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। প্রশ্নটি আরও বড়। একটি পরিবার কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এমন একটি বিস্তৃত বলয় তৈরি করেছিল, যেখানে পরিবারের একাধিক সদস্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে উঠে এসেছিলেন। এই প্রভাবের বিস্তার কতটা ছিল, সেটিও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মতের ওপর দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে নিয়ে আসার অভিযোগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং দুর্নীতির নানা অভিযোগ মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছিল। এসব ক্ষোভ অনেক দিন ধরে সমাজের ভেতরে জমছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন সেই জমে থাকা অসন্তোষকে বিস্ফোরণের মুখে নিয়ে যায়।

শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে তা শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সর্বাত্মক গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আমার দৃষ্টিতে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। কোটা সংস্কারের দাবি ছিল তার তাৎক্ষণিক উপলক্ষ। কিন্তু এর পেছনে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, দুঃশাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানুষের অধিকার সংকুচিত হওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। যে রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবার ও ক্ষমতার বলয়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম হয়েছে। ইতোমধ্যে আদালত থেকে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়ে গেছে। আরও মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় হয়ে নেই। সেগুলো আদালত ও তদন্তের নথিতেও আলোচিত হচ্ছে।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত ও মামলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও শেখ হাসিনা, জয় এবং টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগে অনুসন্ধানের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে এসব অভিযোগের ধারাবাহিকতা শেখ হাসিনার পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।

শেখ রেহানার বিরুদ্ধেও সরকারি জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় অভিযোগ ওঠে এবং আদালত তাকে কারাদণ্ড দেয়। একই মামলায় শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিকও দণ্ডিত হন। ফলে শেখ হাসিনার পরিবারকে ঘিরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার প্রভাবের প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়। এসব বিষয় মামলা, তদন্ত এবং আদালতের কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে।

এখানে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অবস্থানটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন একটি পরিবারের সদস্য, যার একাধিক সদস্যকে ঘিরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। তার মা রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। তার ভাই ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবশালী উপদেষ্টা। তার খালা শেখ রেহানা ছিলেন ক্ষমতাসীন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার খালাতো বোন টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। আর পুতুল নিজে আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের তদন্তের মুখে পড়েছেন।

এই ধারাবাহিকতা দেখলে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ক্ষমতা কি শুধু রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি পরিবারের সদস্যদের সামাজিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরিতেও তার প্রভাব পড়েছিল। একটি পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় যখন রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত হয়, তখন সেই পরিবারের সদস্যদের আন্তর্জাতিক উত্থান নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ সেখানে শুধু ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রশ্ন থাকে না। থাকে রাজনৈতিক পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় প্রভাব এবং পারিবারিক পরিচয়ের প্রশ্নও।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর একটি হলো পরিবারকে রাষ্ট্রের সঙ্গে একাকার করে ফেলা। দীর্ঘদিনের শাসনে শেখ হাসিনার পরিবারকে ঘিরে যে প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল, সেটি শুধু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, প্রশাসন, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও সেই প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যখন একটি রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাব রাষ্ট্রের নানা স্তরে বিস্তৃত হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র আর পরিবারকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে যায়। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় জবাবদিহির সংকট।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ঘটনাটি সেই কারণেই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা হিসেবে তার ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে আলোচনা হতে পারত। তার কাজ, অর্জন এবং দক্ষতা নিয়েই হয়তো আলোচনার কেন্দ্র তৈরি হতে পারত। কিন্তু যখন তার নিয়োগ, যোগ্যতা এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ও তদন্তের বিষয় সামনে আসে, তখন তার পারিবারিক পরিচয়ও আলোচনায় আসবে। কারণ এই পরিচয় তিনি নিজে তৈরি করেননি ঠিকই, কিন্তু তার আন্তর্জাতিক উত্থানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে এই পরিচয় অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।

আর এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যঙ্গটি লুকিয়ে আছে। যে পরিবার বাংলাদেশকে উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছে, সেই পরিবারের সদস্যদের ঘিরেই আজ দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সুবিধা এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে এত প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ যখন চাকরি, ভোটাধিকার এবং ন্যায্য অধিকারের জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছে, তখন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা পরিবারকে ঘিরে সম্পদ, পদ এবং প্রভাবের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে। এই বৈপরীত্যই মানুষের ক্ষোভকে আরও গভীর করেছে।

আমি তাই সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগকে শুধু একজন ব্যক্তির পদত্যাগ হিসেবে দেখি না। এটি আমার কাছে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উত্তরাধিকারের ওপর পড়া আরেকটি ছায়া। একসময় যে পরিবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করত, আজ সেই পরিবারের সদস্যদের নিয়েই জনগণ নতুন করে হিসাব চাইছে। এই হিসাব প্রতিহিংসার হিসাব হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির হিসাব।

শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি হওয়া অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক পরিচয়। কিন্তু ঐতিহাসিক পরিচয় কোনো ব্যক্তিকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে না। বরং পরিচয় যত বড়, মানুষের প্রত্যাশাও তত বড়। বঙ্গবন্ধুর নাতনি হওয়ার মর্যাদা যদি থাকে, তাহলে তার কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা থাকবে আরও বেশি স্বচ্ছতা, আরও বেশি সততা এবং আরও বেশি জবাবদিহি।

বাংলাদেশের মানুষ এখন আর শুধু জানতে চায় না কে কার সন্তান, কে কার নাতনি কিংবা কে কোন পরিবারের সদস্য। মানুষ এখন জানতে চায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে? রাষ্ট্রীয় সুযোগ কারা পেয়েছে? সম্পদের হিসাব কোথায়? ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি কোথায়? এই প্রশ্নগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সেই প্রশ্নই মনে করিয়ে দিয়েছে। রাজপথে মানুষের ক্ষোভের পেছনে শুধু একটি চাকরির কোটা ছিল না। সেখানে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা বঞ্চনা, ক্ষোভ ও দুঃশাসনের অভিজ্ঞতা। সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণে একটি সরকারপতন হয়েছে। এখন ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় খুলেছে। সেই অধ্যায়ে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, ক্ষমতার জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতাবান পরিবারগুলোকেও এখন তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে। কে কোন পদ পেয়েছেন, কীভাবে পেয়েছেন, কোন প্রভাব কাজ করেছে, রাষ্ট্রীয় সুযোগ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সম্পদের উৎস কী ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটের নাম নয়। গণতন্ত্রের অর্থ হলো ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি থাকা।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সেই হিসাবের বাইরে নন। তিনি শেখ হাসিনার মেয়ে। তিনি সজীব ওয়াজেদ জয়ের বোন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি। এই পরিচয় তার ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তার আন্তর্জাতিক পদ এবং সেই পদ থেকে পদত্যাগও এখন তার নিজের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের আলোচনার অংশ হয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত পুতুলের পদত্যাগকে আমি একটি চাকরির সমাপ্তি হিসেবে দেখি না। এটি ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতা যখন থাকে, তখন পরিচয় অনেক দরজা খুলে দেয়। রাজনৈতিক প্রভাব অনেক পথ সহজ করে দিতে পারে। পারিবারিক অবস্থান অনেক সুযোগকে হাতের নাগালে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রশ্ন।

কে কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল। কোন যোগ্যতায় পৌঁছেছিল। কার প্রভাব কাজ করেছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না। আর শেষ পর্যন্ত, সবকিছুর হিসাব কোথায়।

ক্ষমতা একদিন বদলায়। রাজনৈতিক সময়ও বদলায়। কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে যায়। সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো পারিবারিক পরিচয় দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চেয়ে বড় হলো রাষ্ট্র। পরিচয়ের চেয়ে বড় হলো দায়িত্ব। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো জবাবদিহি।

পুতুলের পদত্যাগ তাই শুধু একটি পদত্যাগ নয়। এটি একটি পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপর পড়া আরেকটি ছায়া। এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসেরও একটি প্রতীকী অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ শব্দটি হলো জবাবদিহি।

ক্ষমতা থাকলে পরিচয় অনেক দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। আর মানুষের কাছে থাকে প্রশ্ন। সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই হয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন