https://www.prothomalony.com/

18196

north-america

উত্তর আমেরিকা

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ‘মিডিয়া যুদ্ধ’: সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকো নিষিদ্ধ, সামনে আরও কারা?

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৪৫

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শুক্রবার সন্ধ্যায় যা ঘোষণা করলেন, তা আসলে নতুন কিছু নয়—পুরনো এক যুদ্ধেরই নতুন অধ্যায়। হোয়াইট হাউস থেকে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত তিনি জানালেন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অভিযোগের ভাষাও পুরনো—এই তিন সংবাদমাধ্যম তাঁর ও তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে ক্রমাগত “কল্পকাহিনি ও মিথ্যা” প্রচার করছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসনকে কাভার করার সময় সংবাদমাধ্যমের মনগড়া তথ্য প্রচার করা উচিত নয়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশটিই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরও কিছু “ভুয়া সংবাদমাধ্যম” শিগগিরই একই তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। নাম বলেননি। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরে নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের নামও উচ্চারণ করেছেন।

অর্থাৎ, এটি শুধু তিনটি সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়।এর পরিধি আরও বড় হতে পারে—এমন একটি বার্তাও তিনি দিয়েছেন।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। তাহলে এই নিষেধাজ্ঞা তার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

ট্রাম্পের উত্তর ছিল সরল। তিনি এসব সংবাদমাধ্যমের “ভুয়া খবর” প্রচারে ক্লান্ত। গত দুই বছরের সংবাদ কাভারেজকে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রিপাবলিকান পার্টি ও তাঁর প্রশাসনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

একই কথোপকথনে তিনি আবার স্বাধীন ও সৎ সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

এখানেই প্রশ্নটি একটু জটিল হয়ে যায়। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কি শুধু তখনই স্বাধীন, যখন তার প্রতিবেদন ক্ষমতাসীনদের পছন্দ হয়?

শুক্রবার রাত পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার বাস্তব রূপ নিয়েও কিছুটা বিভ্রান্তি ছিল। ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, সিদ্ধান্তটি “তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর”। কিন্তু হোয়াইট হাউসের ভেতরেই তখন এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা ছিল না। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সিএনএনের সাংবাদিকেরা হোয়াইট হাউসের চত্বরে কাজ করছিলেন।

কিন্তু শনিবার সকালে দৃশ্যপট বদলে যায়। হোয়াইট হাউস সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করে। এমএস নাও জানায়, তাদের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসের চত্বরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সিএনএন ও পলিটিকোও নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ, শুক্রবারের ঘোষণা শনিবার এসে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াও এসেছে দুই দিক থেকে—রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম।

সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও এর বিরোধিতা করেছে। হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা সমিতির বক্তব্যও স্পষ্ট—সংবিধান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দেয়। কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়া তার প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়ার স্বয়ংক্রিয় কারণ হতে পারে না।

অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি এবং বর্তমানে আরকানসাসের গভর্নর সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ট্রাম্পকে প্রশ্ন করার সুযোগ সাংবাদিকদের রয়েছে এবং অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় তিনি সাংবাদিকদের কাছে বেশি সহজলভ্য।

পলিটিকোকে নিয়ে ট্রাম্পের পুরনো অভিযোগও আবার সামনে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, জো বাইডেনের আমলে ফেডারেল সরকার পলিটিকোকে প্রায় আট মিলিয়ন ডলার দিয়ে “বাঁচিয়ে রেখেছিল”। সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৪ অর্থবছরে বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থা পলিটিকোকে আট মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ ছিল পলিটিকো প্রো, ই অ্যান্ড ই নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদ ও তথ্যসেবার সাবস্ক্রিপশন এবং সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য সরকারি ক্রয়। এটি কোনো অনুদান বা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি ছিল না।

ইউএসএআইডির ক্ষেত্রে ২০২৩ ও ২০২৪ অর্থবছরে পলিটিকোকে দেওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ডলার। অর্থাৎ, আট মিলিয়ন ডলারের সংখ্যাটি সরকারি নথিতে আছে। কিন্তু সেই অর্থকে “পলিটিকোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারি অর্থ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলে তথ্যের অর্থ বদলে যায়। সংখ্যাটি সত্য হতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

এই লড়াই এখন আদালত পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সিএনএনের সাংবাদিক জিম আকোস্তার প্রেস পাস বাতিল করা হয়েছিল এক উত্তপ্ত সংবাদ সম্মেলনের পর। আদালতের হস্তক্ষেপের পর তাঁর প্রেস অ্যাক্সেস পুনর্বহাল করতে হয়েছিল। শুক্রবার ট্রাম্প নিজেই সেই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আকোস্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এবারও আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে মামলা হলে তার ফল কী হবে, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়। আদালতের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, হোয়াইট হাউস সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।

এর পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে ঘিরে আরেকটি আইনি লড়াইও চলছে। “মেক্সিকো উপসাগর”-এর বদলে “আমেরিকা উপসাগর” নাম ব্যবহার না করার কারণে এপিকে হোয়াইট হাউসের কিছু সীমিত অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। নিম্ন আদালত প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও পরে আপিল আদালতের বিভক্ত বেঞ্চ সেই আদেশের কিছু অংশ স্থগিত করে। মামলাটি এখনো শেষ হয়নি।

নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের নামও যখন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তখন এই লড়াই যে শুধু সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোতে থেমে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

মার্কিন রাজনীতিতে ক্ষমতা ও সংবাদমাধ্যমের সংঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রেসিডেন্টরা সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করেছেন, কখনো নির্দিষ্ট সাংবাদিক বা সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাতেও জড়িয়েছেন।
আমেরিকার মতো দেশেও সাংবাদিকতার সীমারেখা কতোটুকু? - এ প্রশ্নের উত্তর শুধু হোয়াইট হাউস নয়, শেষ পর্যন্ত আদালত, সংবিধান এবং আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দিতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন