https://www.prothomalony.com/

18173

bangladesh

বাংলাদেশ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ: বিশ্বনেতাদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশা

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:১৪

নিউইয়র্কে আবারও বসছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সমাবেশ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আগামী কয়েক দিনে একই ছাদের নিচে মিলিত হবেন বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, উদ্বাস্তু সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উন্নয়ন ঘাটতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে এবারের অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব রাজনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সাধারণ পরিষদের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, এই অধিবেশনের সভাপতি একজন বাংলাদেশি—পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তাঁর সভাপতিত্বে অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য ফলপ্রসূ জাতিসংঘ’।

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। ফলে এবারের নিউইয়র্ক সফর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর নয়; নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার সুযোগ।

প্রথম প্রত্যাশা—বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্বের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। একটি নতুন সরকার যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে যায়, তখন বক্তৃতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কী করতে চায়, কীভাবে করতে চায় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাছে তার প্রত্যাশা কী—এই তিনটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন।

বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশন জানিয়েছে, দেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে এবং এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে আসছে।

এবার প্রয়োজন শুধু মানবিক সহায়তার আবেদন নয়। প্রয়োজন সংকটটির রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা। মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহি—এসব প্রশ্নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশ আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানও রয়েছে।

দ্বিতীয় বড় প্রত্যাশা অর্থনীতি নিয়ে। বাংলাদেশের নির্ধারিত এলডিসি উত্তরণের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। কিন্তু বাংলাদেশ চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তিন বছরের প্রস্তুতি সময় বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন করেছে। এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয় নয়। এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে রপ্তানি সুবিধা, শুল্ক, ওষুধশিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জড়িত। তাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বলতে হবে—উত্তরণ যেন শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ না হয়। এটি যেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।

তৃতীয় বিষয় জলবায়ু। বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অথচ জলবায়ু সংকট তৈরিতে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে নগণ্য। এবারের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে জলবায়ু ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে বৈঠক এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে বিশেষ বৈঠক রয়েছে।

বাংলাদেশের উচিত এখানে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশের বক্তব্য না রেখে অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন নিয়ে বাস্তবভিত্তিক দাবি তুলে ধরা। নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

চতুর্থ প্রত্যাশা—জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সংঘাত প্রতিরোধ, বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রটি নতুন করে তুলে ধরা দরকার। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ডিজিটাল অর্থনীতি—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব। শুধু ঋণ বা সহায়তা নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তি, বাজার এবং বিনিয়োগের সুযোগ।

এবারের অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো জাতিসংঘ নিজেই সংস্কারের প্রশ্নের মুখোমুখি। সাধারণ পরিষদের সভাপতির ছয়টি অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগও বটে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থার সংকটের সময়ে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রভাব থাকবে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার মধ্যেও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে না; বরং বাড়ে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশের প্রত্যাশা তাই কেবল একটি ভালো বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রত্যাশা হওয়া উচিত—রোহিঙ্গা সংকটে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, এলডিসি উত্তরণে বাস্তবসম্মত সহায়তা, জলবায়ু অর্থায়নে অগ্রগতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন অংশীদারিত্ব এবং বাংলাদেশের শান্তি ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা শেষ হয় কয়েক মিনিটে। কিন্তু একটি দেশের কূটনীতি সফল হয় পরবর্তী মাস ও বছরগুলোতে। তাই নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ কী বলল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে—বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কী আলোচনা হলো, কী প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল এবং দেশে ফিরে সেই কূটনৈতিক অর্জন কতটা বাস্তব কাজে রূপ দেওয়া গেল।এবার বাংলাদেশের সামনে সেই পরীক্ষাই।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন