https://www.prothomalony.com/
18137
bangladesh
ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; উষ্ণমণ্ডলীয় ও বৃষ্টিবহুল বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ রোগের বিস্তার রয়েছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জোরদারে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী বিশেষ জাতীয় অভিযান শুরু হয়েছে। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে এ উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
পৃথিবীজুড়েই মশা একটি ক্ষুদ্র অথচ ভয়ংকর প্রাণী। প্রতিবছর মশাবাহিত বিভিন্ন রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি সত্ত্বেও মশার বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গুর বৈশ্বিক বিস্তার নিয়ে সতর্ক করেছে। বিশ্বের উষ্ণ ও বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশেও প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বর্ষার আগে ও বর্ষাকালে এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তার ঘটে। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবারও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। একই সঙ্গে ঋতুচক্রে পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
১৯৯০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও ২০০০ সালের দিকে ব্যাপকভাবে ডেঙ্গুর রোগী শনাক্ত হতে শুরু করে। ২০১৮ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ১৪৮ জনে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এডিস মশার বিস্তার ঘটছে। ইউরোপের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলেও এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের বাহক। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসব অঞ্চলে আগে মশার উপস্থিতি খুব একটা দেখা যেত না, সেসব এলাকাও মশার প্রজননের উপযোগী হয়ে উঠছে।
গবেষণায় ভবিষ্যতে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মশাবাহিত রোগের বিস্তারও বাড়তে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নাগরিকদেরও নিতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, বাগান, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি কিংবা অন্য যেসব স্থানে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
পাড়া-মহল্লা ও গ্রামাঞ্চলেও যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে কিংবা ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে, সেসব স্থান পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে এসব কাজ করলে এডিস মশার প্রজননস্থল অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সেমিনার, কর্মশালা এবং জনসমাগম হয় এমন বিভিন্ন স্থানে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদিচ্ছা ও সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়া মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই এখন থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, প্রত্যেক নাগরিকের। ঘরের ভেতর ও বাইরে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ বন্ধ করতে পারলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।
লেখক:
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
পাবনা, বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন